সুবর্ণজয়ন্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মুক্তিযুদ্ধের বছরেই ঢাকার অদূরে সাভারে প্রতিষ্ঠিত হয় সবুজে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ৪টি বিভাগ, ২৩ জন শিক্ষক ও ১৫০ শিক্ষার্থী নিয়ে ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে এই বিশ্ববিদ্যালয়। তবে মুক্তিযুদ্ধের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয় ১৯৭২ সালে। বর্তমানে ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৪টি বিভাগ ও ৩টি ইনস্টিটিউট মিলিয়ে ১৬ হাজার শিক্ষার্থী ও ৭০০ জন শিক্ষক রয়েছেন এখানে। প্রায় ৭০০ একর জমিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ই দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় বলে এখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক অনেক ঘনিষ্ঠ। শিক্ষার্থীরাও পরস্পরের কাছের। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনপুষ্ট ছাত্র সংগঠনগুলোর সহিংস তৎপরতার বাইরে শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সম্পর্ক সৌহার্দ্যপূর্ণ।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বর্তমানে রাজনীতি, প্রশাসন, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, ব্যবসাসহ নানা ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে বেশ সুনামের সঙ্গে ভূমিকা রাখছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশকে উপহার দিয়েছে দেশসেরা অনেক সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, শিক্ষক, নির্মাতা, লেখক, নাট্যকর্মী ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতার পরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রায় সবকটি ছাত্র আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অংশগ্রহণ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যৌননিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন ও আন্দোলনকারীদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রে যৌননিপীড়ন বিরোধী সেল ও নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা দেয়। শুধু ধর্ষণ ও যৌননিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন নয়, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে পুরো নব্বই দশক জুড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছিল নেতৃত্বের আসনে। অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অনেক বিষয়ে এগিয়ে ছিল। নব্বই দশকের শুরুতে ছাত্রীদের সন্ধ্যার আগে হলে ফেরার বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে প্রথম আন্দোলন শুরু হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগরে। সান্ধ্যআইন বিরোধী সে আন্দোলন পরে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও প্রভাবিত করে। সে সময় ক্যাম্পাসে যৌননিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সে ধারাবাহিকতাতেই নব্বই দশকের শেষে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। যে সময় ধর্ষণ কথাটা প্রায় অনুচ্চারিত ছিল সে সময় মিছিলের স্লোগানে ধর্ষণের বিচার চাওয়ার ঘটনা পুরনো মূল্যবোধকে বড় একটা ধাক্কা দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের দুই মুখ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও জাহানারা ইমামের নামে হলের নামকরণ করার দাবিতেও জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা সাফল্য এনেছিল। শিক্ষার্থীদের দাবি ও আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অডিটরিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে পথিকৃৎ চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের নামে। নব্বই দশকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির চক্রের রাজনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে। ফলে গত দুতিন দশকজুড়ে জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রশিবিরের কর্মকান্ড নিষিদ্ধ থেকেছে। এ আন্দোলনগুলো একদিকে যেমন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিশেষ সচেতনতায় গড়ে তুলেছে, তেমনি শিক্ষার পরিবেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলেছে।

আন্দোলন-সংগ্রামে দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করলেও শিক্ষা কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যতটুকু এগোনোর কথা ছিল তা থেকে অনেক দূরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও গবেষণার প্রতি আগ্রহী করতে ব্যর্থতা এর একটি। এখনো উপস্থিতি ও নম্বরের ভয় দেখিয়ে কিছু বাংলা চোথা মুখস্থ করে পাস করার সনাতনী পদ্ধতি এখানে রয়ে গেছে। গবেষণা খাতে আগ্রহ ও বাজেট কোনোটাই নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহিষ্ণু রাজনৈতিক মনোভাব, শিক্ষক নিয়োগে অতিমাত্রায় রাজনৈতিক বিবেচনা, শিক্ষক রাজনীতির কালো অভিশাপে জাহাঙ্গীরনগর হয়ে উঠেছে গ্রামের সালিশ বাজার। নিয়োগ নিয়ে, পদ-পদবির দাবি নিয়ে শিক্ষকরা হাতাহাতিতে লিপ্ত হন। গবেষণা বা ক্লাসের চেয়ে প্রশাসনিক পদ-পদবির অর্জনকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা বেশি আকর্ষণীয় ভাবেন। তরুণ শিক্ষকদের কাছে ডক্টরেট গবেষণার চেয়ে প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্য হয়ে ওয়াকিটকি হাতে নেওয়া যেন বেশি গৌরবের। কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবেন, ডিন বা প্রক্টর হবেন এই নিয়ে শিক্ষকদের বিরোধ ও মারামারিতে মাসের পর মাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস পরীক্ষা হয় না। জাহাঙ্গীরনগরের সংস্কৃতিচর্চা ও বিশেষ করে মঞ্চনাটকের প্রশংসা দেশব্যাপী। একসময় হল পর্যায়েও নাট্য উৎসব হতো। এখন হল হয়ে গেছে র‌্যাগিংয়ের আস্তানা। এখন কোনোরকমে যে সংস্কৃতিচর্চা টিকে আছে তাতে অর্থায়ন করতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যত গড়িমসি।

বিশ্ববিদ্যালয় পাস করার পরও অনেক শিক্ষার্থী হতাশায় ভোগেন। কারণ যে চোথা মুখস্থ সার্টিফিকেট তার হাতে রয়েছে তা তার ক্যারিয়ারে কোনো অবদান রাখতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি হয়ে পড়েছে একটি পরিত্যক্ত ভবন। বিসিএসের প্রস্তুতি-কেন্দ্রিক পড়া ছাড়া আর কোনো কাজে আসে না এই ভবন। সারা বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি লাইব্রেরি, ই-লাইব্রেরি ও অনলাইন জার্নালে এক্সেস দিয়ে শিক্ষার্থীদের গবেষণার দ্বার উন্মোচন করছে। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটটাই এখনো পড়ে আছে মান্ধাতার আমলে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিমত করার পরিসর নষ্ট করা ফেলা হলে, অতিমাত্রায় রাজনীতিকীকরণ হলে বিশ্ববিদ্যালয় তার সঠিক পথ হারায়। সবুজে ঘেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো অর্জনও ঢেকে যাচ্ছে বিষাক্ত শিক্ষক রাজনীতির জাঁতাকলে। উপাচার্য বা প্রশাসনের শিক্ষকদের অনুগত না হলে যেন শিক্ষক হওয়া যায় না। প্রায় সব শিক্ষকই নিয়োগ হচ্ছেন রাজনৈতিক বিবেচনায়। এছাড়া পছন্দের শিক্ষার্থীকে শিক্ষক বানাতে মাস্টার্সের রেজাল্ট ম্যানুপুলেট করার অভিযোগ অহরহ।  ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেওয়ার সাহস বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেই। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাস করেন সম্পর্কের যোজন যোজন মাইল দূরে। শুধু ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনকে ‘হাতে রেখে’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের দায়িত্ব শেষ করতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন পরিস্থিতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক উপাচার্য শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেন, জাতীয়তাবাদী শিক্ষকের প্রটোকলে বের হওয়াকে ‘গণঅভ্যুত্থান’ মনে করেন।

অথচ যে স্বাধীনতা আমাদের, যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের, সে চেতনা গণঅভ্যুত্থান বলতে শিখিয়েছে অন্যকিছু। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাক্কালে। ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক। যারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, তারাও প্রত্যাশা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাজনীতির সব ডাল ভেঙে যাক। মাদক, র‌্যাগিং থেকে মুক্তি পাক শিক্ষার্থীরা।

বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ‘দ্বিতীয় জন্মের আঁতুরঘর’। জাহাঙ্গীরনগর ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকি। জাহাঙ্গীরনগরে ঝড় এলে আমাদের মননের সব ডালপালা ভেঙে পড়ে। আমরা প্রত্যাশায় থাকি বেশি বেশি সুখবরের শিরোনাম হোক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জাতিকে পথ দেখাক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের সমান বয়সী এই বিশ্ববিদ্যালয় হোক বাংলাদেশের একটি গর্বের প্রতিষ্ঠান। শিক্ষায়, গবেষণায়, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধে এই প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠুক অনুকরণীয়।

লেখক : শিক্ষার্থী, ৪৪তম আবর্তন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahadatju44@gmail.com