টাঙ্গাইলে আদিবাসীকে নির্যাতন

আসামিরা অধরা, বাড়িছাড়া নির্যাতিতা

টাঙ্গাইলে চোর সন্দেহে বর্মন সম্প্রদায়ের এক আদিবাসী নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় মামলার তিনদিন পরও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। এ পরিস্থিতিতে উৎকণ্ঠা আর ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন নির্যাতনের শিকার ঘাটাইলের মালিরচালা গ্রামের নারায়ণ বর্মনের স্ত্রী সন্ধ্যা রানী (৩৫)। আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় নিরাপত্তার অভাবে বাড়িও ফিরতে পারেননি তিনি।

এদিকে চুরির অপবাদে আদিবাসী নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের প্রতিবাদ এবং মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় আদিবাসীরা। গতকাল বুধবার দুপুরে ঘাটাইল উপজেলা পরিষদের সামনে বাংলাদেশ কোচ আদিবাসী ইউনিয়নের আয়োজনে এ কর্মসূচি পালিত হয়।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আদিবাসী কোচ ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক রতন চন্দ্র কোচ, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলিক মৃ, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সহ-সভাপতি শ্রী চন্দন কোচ, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির জন জেত্রা, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের টাঙ্গাইল জেলা কমিটির আহ্বায়ক ফাতেমা বিথী, সার্ক মানবাধিকার-এর টাঙ্গাইল জেলার সভাপতি অনিক রহমান বুলবুল প্রমুখ।

বক্তারা সন্ধ্যা রানীর ওপর নির্যাতনকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তি নিশ্চিত এবং তার পরিবারের নিরাপত্তা দেওয়ার দাবি জানান। আসামিদের গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন বক্তারা। তা না হলে থানা ঘেরাও ও রাজপথ অবরোধসহ পরে লাগাতার কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ইউএনও বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার মধ্য দিয়ে গতকালের কর্মসূচি সমাপ্ত ঘোষণা করেন আদিবাসীরা।

মহানন্দ চন্দ্র বর্মন বলেন, ‘সন্ধ্যা রানী মামলা করার তিনদিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। ফলে নিরাপত্তার অভাবে বাড়িও ফিরতে পারেননি।’

স্থানীয় সাগরদিঘী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হেকমত সিকদার বলেন, ‘সন্ধ্যা রানীকে উদ্ধার করে মহানন্দ চন্দ্র বর্মনের বাড়িতে রাখা হয়েছে, যাতে ওই নারী নিরাপদে থাকেন। যারা এই নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশকে আমরা সহায়তা করছি এবং সেই সঙ্গে দোষীদের শাস্তি দাবি করছি।’

আসামিদের গ্রেপ্তার করতে না পারার কারণ জানতে চাইলে সন্ধ্যা রানীকে নির্যাতনের ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঘাটাইলের সাগরদিঘী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। তাদের ধরতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আশা করছি দ্রুতই ধরা পড়বে।’

আদিবাসী সন্ধ্যা রানীকে গত ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করে তারই প্রতিবেশী মনিরুল ও তার সহযোগীরা। এ সময় তার পাশেই বড় ছেলে পলাশের কোলে থাকা ছয় মাসের আরেক শিশুসন্তান মায়ের একটু দুধ খাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করতে থাকে। কিন্তু ওই শিশুটির কান্নায়ও নির্যাতনকারীদের মন একটুও গলেনি। পরদিন রাতে সন্ধা রানী বাদী হয়ে ৫ জনকে আসামি করে থানায় একটি মামলা করেন।

সন্ধ্যা রানী বলেন, তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। আসামিদের সন্তানদের সঙ্গে তার ছোট ছেলে পলাশ (৮) খেলা করত এবং ঘুড়ি উড়াত। ঘটনার ১৫ দিন আগে পলাশ মামলার এক নম্বর আসামি মনিরুল ইসলাম ভূইয়ার বাড়ি থেকে ঘুড়ি বানানোর জন্য পত্রিকা নিয়ে আসে এবং তার সন্তানদের সঙ্গে ঘুড়ি উড়ায়। হঠাৎ মনিরুলের বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার ও টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান কাগজপত্র চুরি যায়। পরে ৩ জানুয়ারি পলাশকে তারা ধরে নিয়ে মারধর করেন এবং মালামাল চুরি করে তার মায়ের কাছে জমা দিয়েছে- এ ধরনের কথা শিখিয়ে দেন। তা না হলে তার মাকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। ভয়ে পলাশ স্বীকারোক্তি দেয়। এরপর ৯ জানুয়ারি মামলার চার নম্বর ও পাঁচ নম্বর আসামি সন্ধা রানীর বাড়িতে ঢুকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন। তাকে বাড়ি থেকে ধরে এনে করিম ভূইয়ার আকাশমনি গাছের বাগানে রশি দিয়ে বেঁধে আটকে রাখেন এবং মামলায় উল্লিখিত ৫ আসামি মিলে এলোপাতাড়ি লাঠি দিয়ে মারধর করেন। পরে প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।

মামলা করার পর আসামিরা তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিচ্ছেন বলেও জানান সন্ধা রানী। মামলার আসামিরা হলেন- মনিরুল ইসলাম ভূইয়া (৮০), তার দুই ছেলে মোস্তফা ভূইয়া (৪৫) ও সজীব ভূইয়া (৪০), মনিরুলের দুই মেয়ে মোছা. খুকি (৩৭) ও সুমি আক্তার (৩২)।