সেরা হওয়ার পর বড় কিছুর স্বপ্ন দেখছেন রিতু

রিতু আক্তার ক্রিকেটারও হতে পারতেন। তাহলে আর গতকাল বঙ্গবন্ধু জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় হাই জাম্পে রেকর্ড গড়ে সবাইকে চমকে দেওয়া হতো না।

রিতুর উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি। গাইবান্ধায় নিজের গ্রামের বাড়িতে থাকার সময় তার ক্রিকেটে আকর্ষণ ছিল। পেস বোলিংয়ে নামও করেন। স্থানীয় পর্যায়ে খেলে উইকেটও পেয়েছেন। স্থানীয় কোচের মাধ্যমে ট্রায়াল দিয়ে ঢাকার মিরপুর বয়েজে এসে প্রথম বিভাগ ক্রিকেটও খেলেছেন। কিন্তু বেশিদিন ক্রিকেট রিতুর ভালো লাগেনি। একে পারিশ্রমিক কম। তা ছাড়া সেনাবাহিনীর চাকরিতে ক্রিকেট কাজেও লাগবে না। সব হিসাব করেই ক্রিকেট ছেড়ে অ্যাথলেটিকসে যোগ দিলেন রিতু। আসল ঘটনা হলো, একদিন ঢাকায় জুনিয়র অ্যাথলেটিকস দেখতে এসে ভালো লেগে গিয়েছিল। এরপর গাইবান্ধা জেলার হয়ে পদকও জেতেন। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি।

এক বছর ধরে রিতু আক্তার সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে কর্মরত আছেন। তাদের হয়েই এবার জাতীয় প্রতিযোগিতায় হাই জাম্পে অংশ নেন। প্রথমবার অংশ নিয়েই বাজিমাত। ১.৭০ মিটার উচ্চতা লাফিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছেন রিতু। উম্মে হাফসা রুমকির ১.৬৮ মিটারের রেকর্ড ভাঙার পর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ট্র্যাকে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘জাতীয় প্রতিযোগিতায় প্রথম স্বর্ণপদক জিতলাম। আত্মবিশ্বাস ছিল ভালো কিছু করব। সোনা জিতব। এখানে এত ভালো জাম্প করার কারণ মেহেদী স্যার (সেনাবাহিনীর কোচ)। তিনি আমাকে এই পদক জিততে অনেক সাহায্য করেছেন।’

অনুশীলনেও ভালো করেছিলেন রিতু। টানা তিন দিন রেকর্ড উচ্চতায় লাফিয়েছিলেন। তাই চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় রেকর্ড গড়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তিনি। সেরা হওয়ার পর বলেছেন, ‘আমি যখন অনুশীলন করি তখন টানা তিন দিন রেকর্ড উচ্চতায় লাফিয়েছিলাম। তখন স্যার (কোচ) বলেন, প্রতিযোগিতাতে রেকর্ড করতেই হবে। মাঠে এসে কথা রেখেছি।’ ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমার স্বপ্ন আরও বড়। এসএ গেমসে ভালো করতে চাই। আর এরপরই এশিয়ান গেমসে অংশ নিয়ে দেশের জন্য যদি কিছু করা যায় সেই চেষ্টাটা করব।’

দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন রিতু। তার বাবা হোসেন আলী সিএনজিচালক। আর মা লিপি আক্তার গৃহিণী। তিন বোনের মধ্যে রিতু মেজো। ক্রিকেট দিয়ে শুরু করে দারিদ্র্য পেরিয়ে কীভাবে অ্যাথলেটিকসে থিতু হলেন সে সম্পর্কে রিতু বলেন, ‘ক্রিকেটে ভালো করছিলাম। তবে মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। বাইরে বেশি সময় থাকতে হতো। রোদে পুড়ে খেলতে হতো। ক্লাবে থাকতে হতো। পরিবার থেকে সেভাবে সহযোগিতা পেতাম না। অনেকে বলতো মেয়েদের খেলাধুলা করে কী হবে। হাত-পা ভাঙলে বিয়ে হবে না। এইসব বাধা উপেক্ষা করে, বলতে গেলে চুরি করে খেলতাম। আর সেনাবাহিনীতে চাকরির স্বপ্ন দেখতাম। ক্রিকেট খেলে তো আর সেখানে চাকরি করতে পারব না। তাই শেষমেশ নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছি। অ্যাথলেটিকসের মাধ্যমেই আমি এখন সেনাবাহিনীর চাকুরে। এখন অবশ্য পরিবার থেকে সব ধরনের সহযোগিতা পাই। গ্রামবাসীও প্রশংসা করে বলে ওই যে আমাদের রিতু যাচ্ছে। ও এখন চাকরি করে।’

রিতুর কোচ মেহেদী হাসান ছাত্রীর সাফল্যে খুব খুশি। বিকেএসপির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর কোচ হিসেবেও কাজ করছেন অনেক দিন। দেখেই বুঝেছিলেন মেয়েটি অনেকদূর যাবে। ৪৪তম জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতার হাই জাম্পে সেরা হওয়ার পর রিতুর প্রশংসা করে কোচ মেহেদী হাসান বলেছেন, ‘রিতুর মধ্যে অনেক সম্ভাবনা আছে। ওকে ঠিকমতো পরিচর্য়া করতে পারলে দেশের জন্য কিছু একটা করতে পারবে। এমন উচ্চতার মেয়ে তো সচরাচর পাওয়া যায় না।’

যায় না বলেই তো গাইবান্ধার সবুজ শ্যামল গ্রাম থেকে প্রবল বাধাবিপত্তি পেছনে ফেলে উঠে আসা রিতুকে নিয়ে এশিয়ার মতো বড় আসরে পুরস্কার জেতার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।