দ্রব্যমূল্য এবং প্রান্তিক জনগণ

দু’বছর পর আবার শরিফউদ্দৌলার সঙ্গে দেখা হলো ঢাকায়। রাজশাহীর বাঘাতে পরিচয়। এই তরুণদের একটি সংগঠন আছে। ওরা প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে কাজ করে। একটি স্থানীয় এনজিও গড়ে তুলেছে তারা। সে-সময় আমাদের জানিয়েছিল দেশে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের খেটে খাওয়া মানুষ এখন অনেকটা ভালো আছে। তাদের জীবনমানের বড় রকমের পরিবর্তন না হলেও অধিকাংশেরই খাওয়া-পড়ার চিন্তা করতে হচ্ছে না এখন। শুনে খুব ভালো লাগল। দু’বছর পর প্রান্তিক মানুষদের কথা জিজ্ঞেস করায় দেখলাম শরিফউদ্দৌলার মুখ ভার। জানাল এই নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর করোনাকালে দুবেলা খাবারে টান পড়ছে। কর্মসংস্থান কমে গেছে। আপৎকালীন সরকারি সহযোগিতা এলেও স্থানীয় রাজনৈতিক টাউটদের কারণে সুষম বণ্টন হয় না। আর কয়েকমাস ধরে অনিয়ন্ত্রিত বাজারের বিরূপ প্রভাব পড়ছে গরিব মানুষের ওপর। সম্প্রতি একজন হতাশ ভ্যানচালকের জবানি তুলে ধরল এই উদ্যমী তরুণ। বলল, ঢাকার তুলনায় গ্রামাঞ্চলে ভ্যানগাড়ির ভাড়া কম। ষাটোর্ধ্ব চালকের পক্ষে সারা বেলা কাজ করা সম্ভবও নয়। তার আয় গড়ে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিনশ টাকা। আবার প্রতিদিন ভ্যান চালাতেও পারে না। পাঁচ জনের সংসার। চালের দাম চড়তে চড়তে ৫০ পেরিয়ে যাচ্ছে। তিন কেজি চাল কিনলে আর কত টাকা থাকে? এই টাকা দিয়ে কি তেল, নুন, পেঁয়াজ কিনব, না ভর্তা করার জন্য আলু কিনব। ডাল কেনা আর গোস্ত কেনা তো এখন একই কথা। ওসব তো ছেড়েই দিয়েছি। শাক পাতা কুড়িয়ে এনে তাই সেদ্ধ করে খেতে হয়। এর ভেতর থেকেই দু হাজার টাকা বাসাভাড়া জোগাড় করতে হয় তাকে।

পেঁয়াজের আকাশচুম্বী দামের সময় পেঁয়াজ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। অগতির গতি হিসেবে ছিল আলু। একেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। আমাদের রাজনীতির নায়ক আর রাষ্ট্রের নায়করা প্রান্তিক মানুষদের ভাষা পড়েন কি না জানি না। তবে নানা কথা দিয়ে সবাইকে আবিষ্ট করার চেষ্টা করলেও কঠিন বাস্তবকে অস্বীকার করার জো নেই। এ সত্য সব পক্ষেরই বোঝা উচিত। দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় ঊর্ধ্বগতিতে এখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। বণিক বুদ্ধি সরকারের সব পদক্ষেপকে নিষ্ফল করে দিচ্ছে। এই একটি জায়গায় সরকার সত্যিই অসহায়। যত যুক্তিই থাকুক দেশবাসীকে রক্ষার দায়িত্ব কিন্তু সরকারেরই। যত যুক্তিতেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটুক এর উত্তাপ থেকে দেশবাসীকে বাঁচাতে পদক্ষেপ নিতে হয় সরকারকেই। সরকার পারে কঠোরভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে। পারে ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে। ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যদিয়ে মানুষের মধ্যে একটি সহনীয় অবস্থা তৈরি করতে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের মুখপাত্ররা কেমন যেন মুখ বন্ধের নীতি পালন করছেন। দেখে মনে হয় দেশের বিধায়কদের বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয় না অথবা তারা এতটাই অসহায় যে চোখে ঠুলি পরা আর কানে তুলো দেওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই। বাজারের হালহকিকত নিয়ে প্রায় সব টিভি চ্যানেলই সচিত্র রিপোর্ট করছে। এখন তো মূল্যবৃদ্ধি ঘটে পায়ে পায়ে নয় লাফিয়ে লাফিয়ে। এদেশের বাজারে চালের দাম চার-পাঁচ টাকাও কেজিতে বেড়ে যায়। শুধু চাল কেন ডাল, তেল, চিনি, আদা, রসুন সব কিছুরই মূল্যবৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমুখী।

বাজার করতে আসা নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্ত ক্রেতার বক্তব্য টিভি রিপোর্টে উঠে আসে। নিম্নবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত বাজারে দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে পরাস্ত সৈনিকের মতো খাবি খাচ্ছেন। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত জানালেন অসহনীয় মূল্যবৃদ্ধি হলেও আয় বাড়ছে না। তাই প্রতিদিনই জমানো টাকায় হাত পড়ছে। ফলে ভবিষ্যতের কথা ভেবে এরা হতাশ। মধ্যবিত্ত পরিবারের আওতায় থাকা আমার এক ভাইয়ের কথা জানি। একটি নামি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ভালো বেতন পেতেন। গত এপ্রিল থেকে সব কাজ বন্ধ থাকায় বেতন বন্ধ হয়ে আছে। প্রতিষ্ঠানটির কাজে এখনো গতি আসেনি। ফলে আট মাস ধরে বেতন বন্ধ। জমানো টাকা এখন শেষ হওয়ার পথে। খোঁজ নিলেই দেখা যাবে এমন অনেক পরিবার আছে দেশে। যারা প্রকাশ্যে নিজেদের দুর্দশার কথা বলতে পারেন না। বাজার তাদের জন্য একটি ভয়ংকর জায়গা হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত বেকাররা বসে আছে। চাকরির বাজারের ঝাপ খুলছে না।

খাদ্যদ্রব্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদারকি ও নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব

থাকলেও মন্ত্রণালয়গুলো সাফল্য দেখাতে পারছে না। সরকার কি ভেবেছিল ব্যবসায়ীদের মন্ত্রী এমপি বানিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনুকূল্য পাবে! কিন্তু বণিক স্বার্থ যে সবসময় লভ্যাংশের দিকে থাকে তা ভুললে চলবে কেন! এদেশে সব সরকারের ওপরই ব্যবসায়ীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত থাকে। কারণ পার্টি চাঁদা আর ক্ষমতাবানদের খাই মেটানোর প্রধান ভা-ার তো ব্যবসায়ীদের কোষাগার। যেহেতু বণিক চিন্তা মুনাফার দিকেই থাকে। তাই তারা সব ‘দান’ সুদে-আসলে আদায় করে নেন রাষ্ট্রের কাছ থেকেই। আমাদের দেশের রাজনৈতিক সরকারগুলোর সুবিধা এই যে, তাদের সঙ্গে একটি আপসরফা থাকে ব্যবসায়ীদের। বাজারটা সামাল দিয়ে সরকারকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি থাকে ব্যবসায়ীদের। এতে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সংকট কমে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংকট বাড়ে। অসাধু বণিকদের প্রত্যক্ষ দয়ার বিনিময়ে বণিকস্বার্থ রক্ষার জন্য হাজারটা ভিন্ন দরজা খুলে দেয় রাজনৈতিক সরকার। এসব কারণে অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সৎ ব্যবসায়ী বড় ব্যবধানে পিছিয়ে যায়। না হলে চাল আমদানির পরও দাম না কমে বেড়ে যায়, তেলের জোগান থাকার পরও পাইকারি বাজারে শূন্যতা সৃষ্টি হয়। কোনো নিয়মনীতি না মেনেই প্রতিদিন লফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ে। অথচ এসব প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ জড়িতদের এই করোনাকালেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এসব যে সাধারণের চোখে সরকারের দুর্বলতা হিসেবে ধরা পরে তা কি নীতিনির্ধারকরা ভেবে দেখেছেন? সংকটে সরকার যৌক্তিক ব্যবস্থা নিলেও তার থেকে কোনো সুফল ঘরে তুলতে পারছে না। অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে নাকাল হচ্ছে। অন্তঃসারশূন্যতা বিরাজ করলে সেখানে সাফল্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। তেরো শতকের শুরুতে বখতিয়ার খলজির নদীয়া আক্রমণের কথা শুনে লক্ষণ সেন যথার্থ যোগ্যতা নিয়েই তেলিয়াগর্হির গিরিপথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু সেনযুগের নিপীড়িত বাঙালি দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতেই একই ধর্মের শাসকগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ায়নি। সে কারণে নদীয়া ও লখনৌতিতে সেন শাসনের ভিত গুঁড়িয়ে যায়। বিএনপির দুঃশাসনে বিক্ষুব্ধ মানুষ কি এক সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে স্বাগত জানায়নি? কোনো পক্ষকেই ভুললে চলবে না যে ইতিহাসের আবর্তন চলতেই থাকে।

ব্যবসায়ীরা বিগত দশকগুলোয় ক্ষমতার রাজনীতি দর্শনে বুঝে গেছেন এমপি-জননেতা হওয়ার মধ্যে একটি লাভজনক বাণিজ্য আছে। আমলাদের উপলব্ধিও একই। তাই আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই সরকারের সময়েই আমলা ও ব্যবসায়ীদের এমপি হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। ‘গণতন্ত্রকামী’ দলগুলো পার্টি ফান্ড বলিষ্ঠ করতে অনেকটা খোলামেলাভাবেই মনোনয়ন বাণিজ্যে মেতে ওঠে। এমনি করে জাতীয় সংসদ একটি বাণিজ্যিক অবয়ব পেয়ে যায়। এ কারণে ক্রমাগত সংসদ বর্জনকারী বণিক মানসিকতার এমপিরা নিঃসঙ্কোচে ভাতা, বাসস্থান ঠিক রেখে ব্যক্তিগত কর্মে ও ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছেন নিকট অতীতের দিনগুলোতে।

বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অসাধু বণিক জোট আর বাস-ট্রাক চালক জোটকে একই রকম শক্তিমান বলে মনে হয়। এই উভয় জোটের সামনেই বড় অসহায় আমাদের সরকারগুলো। কোনো ড্রাইভার অন্যায় করলে, নিজের অদক্ষতায় জীবনহানি ঘটালেও তাকে কিছু বলা যাবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তার করলেই কাকের মতো তারা দলবদ্ধ হয়ে যায়। হাইওয়ে বন্ধ করে দেয়। অসহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে। ফলে এক পর্যায়ে আপস করতে হয় সরকারকে। ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনলে বিপাকে পড়ে সরকার। দুর্জনরা বলেন, ব্যবসায়ীরা তাদের সাফল্যে নাকি রাজনৈতিক গুরুদের মেধার সহযোগিতাও পান। ব্যাখ্যা যেভাবেই করি না কেন এ সত্য মানতে হবে যে ক্ষুধার্থ অসহায় মানুষ কোনো কাব্যকথা বোঝে না। ইংরেজ ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়েনবি বহুকাল আগেই একটি থিওরি প্রকাশ করেছিলেন। ইতিহাসবিদরা যাকে বলেন ‘থিওরি অব চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড রেসপন্স’। এই তত্ত্বের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে মানব সভ্যতা। প্রতিকূল পরিবেশকে মোকাবিলা করেই মানুষসহ প্রাণিকুল টিকে থাকে। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানুষকে ঘুরে দাঁড়াতেই হয়। জীবনের দায়েই নিজেকে যোগ্য করে তোলে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন তাদের এই অমোঘ সত্যটি মনে রাখতেই হবে। বাজারের যে অবস্থা তাতে সুবিধাভোগী ছোট্ট অংশটি বাদ দিলে সব বিত্তের মানুষই যার যার অবস্থানে থেকে মানসিকভাবে সংকটাপন্নদের দলভুক্ত হচ্ছেন। তাহলে কি এরা কৃশকায় হতে হতে নিঃশেষ হয়ে যাবেন? এমন পরাজয়ের কথা তো ইতিহাসে সহজলভ্য নয়। সেই কোনকালে বরফ যুগের ম্যামথ পরাজিত হয়েছিল। উষ্ণ পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি। তাই হারিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে। ডাইনোসররাও হারিয়ে গেছে বিরূপ পরিবেশের মোকাবিলা না করতে পেরে। আর বাদবাকি জীবজগৎ প্রতিবাদ করেছে। ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শেষ শক্তিতে শিরদাঁড়া সোজা করেছে। এই প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষও শেষ শক্তি দিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার শপথ পাঠ করবে। এটিই তো আসলে টয়েনবির ‘থিওরি অব চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড রেসপন্স’। প্রান্তিক মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর আগে সরকার আর রাজনীতিকদের ইতিবাচক বৃত্তে ঘুরে দাঁড়ানো দরকার। আমরা চাইব না কোনো পক্ষই ম্যামথের ভাগ্য বরণ করুক।

লেখক অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawazju@yahoo.com