মুক্তির লড়াইয়ের প্রেরণা আসাদের শার্ট

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে চীনের একজন ঐতিহাসিক সুমা চিয়েন, তাকে লেখা এক পত্রের উত্তরে লিখেছিলেন ‘যদিও সব মৃত্যুই সমান শোকাবহ, তবু তার মধ্যে কোনোটি হয় থাই পর্বতের চেয়ে ভারী অথবা পাখির পালকের চেয়ে হালকা।’ এই উক্তিটি চীনের প্রয়াত কমিউনিস্ট রাষ্ট্রনায়ক মাও সে তুং উদ্ধৃত করেছিলেন একজন চীনা লালফৌজের সৈনিকের স্মরণসভায় প্রদত্ত তার ভাষণে। তিনি বলেছিলেন, ‘জনগণের জন্য যারা প্রাণ দেয় তাদের মৃত্যু থাই পর্বতের চেয়েও ভারী, কিন্তু ফ্যাসিস্ট কিংবা অত্যাচারীর পক্ষ নিয়ে যারা কাজ করে এবং শোষক ও উৎপীড়কের জন্য যারা প্রাণ দেয়, তাদের মৃত্যু পাখির পালকের চেয়েও হালকা।’ আজ থেকে বাহান্ন বছর আগে ঠিক এই দিনে এদেশেরই এক সূর্যসন্তান তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক মোহাম্মদ আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে এরকমই থাই পাহাড়ের চেয়ে ভারী আত্মোৎসর্গ করে দিয়েছিলেন নিজেকে। তার শহীদী আত্মদান এতটাই ভারী হয়েছিল যে তার পথ ধরে চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল এই স্বৈরশাসকের দীর্ঘদিনের সাজানো মসনদ। তিনি আর কেউ নন, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মহান শহীদ আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।

১৯৬৮ সালের শেষ দিক থেকেই এই অভ্যুত্থানের প্রস্তুতিপর্ব চলছিল। পাকিস্তানের প্রতিটি অঞ্চলের প্রতিটি ভাষাভাষী জাতির জনগণ প্রধানত আইয়ুবশাহীর অবসানের লক্ষ্য নিয়ে এই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছিল। এটা সত্য যে, সংগ্রামের গতি-প্রকৃতি, নেতৃত্ব, আকাক্সক্ষা প্রভৃতি বহুদিক থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সংগ্রামের মধ্যে তারতম্য ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তখন সামরিক স্বৈরাচারী আইয়ুব-শাসনের বিরুদ্ধে তৎকালীন সারা পাকিস্তানে গণঅভ্যুত্থানের একই সাধারণ পটভূমি গড়ে উঠেছিল। ১৯৬৮ সালের ১৩ অক্টোবর করাচির ছাত্র বিক্ষোভের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং ৩০ ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনার বিরুদ্ধে সংঘটিত ছাত্রদের প্রতিবাদের জের ধরে ১৬ অক্টোবর থেকে করাচির সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে দেওয়া হয়। ১৩ নভেম্বর লাহোরে বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।  একইদিনে ন্যাপ সভাপতি ওয়ালী খান ও পিপলস পার্টির নেতা ভুট্টোকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধীরে ধীরে আন্দোলন সারা পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে ৬ ডিসেম্বর পল্টনে জনসভা শেষে মওলানা ভাসানী গভর্নর ভবন ঘেরাও করেন।  বর্তমানে যেটা বঙ্গভবন, তখন সেটাই ছিল গভর্নর মোনায়েম খানের সরকারি বাসভবন। ঘেরাও শেষে তিনি পরদিন হরতালের ডাক দেন। হরতাল অভূতপূর্ব সফল হয়েছিল। জনতা-পুলিশ সংঘর্ষ চলেছিল। তার পরদিন ৮ ডিসেম্বর আবারও হরতাল। মওলানা ভাসানী এবার হুমকি দিলেন ‘শেখ মুজিবকে মুক্তি না দিলে বাস্তিল দুর্গের মতো ক্যান্টনমেন্ট ভেঙে মুজিবকে মুক্ত করব।’ একই সঙ্গে তিনি গ্রামাঞ্চলে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হাট হরতালের ডাক দিয়েছিলেন। ২৯ ডিসেম্বর বিভিন্ন জায়গায় হাট হরতাল হয়েছিল। নড়াইলে এবং নরসিংদীর মনোহরদী থানার হাতিরদিয়া বাজারে পুলিশ গুলি করে মানুষ হত্যা করেছিল। প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক হায়দার আকবর খান রনো লিখেছেন, ‘ছাত্রনেতা আসাদ একই সঙ্গে কৃষক আন্দোলনও করতেন। হাতিরদিয়া বাজারে হাট হরতাল করতে গিয়ে তিনি পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হয়েছিলেন। মাথা ফেটে গিয়েছিল। আসাদ আহতাবস্থায় মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধেই কিছুটা সাইকেলে করে, পরে ট্রেনে করে ঢাকায় পৌঁছান হাতিরদিয়ার গুলির খবর দিতে।’

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে দুই ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ ও এনএসএফ-এর একাংশ নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং ১৪ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা সারা দেশে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছিল। এই কর্মসূচিকে ব্যাপক প্রচারে নেওয়ার জন্য ১৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাবেশ এবং ১৮, ১৯ ও ২০ তারিখে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করা হয়েছিল। ১৮ তারিখ পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছিল। ১৯ তারিখ গুলি করেছিল পুলিশ। পরদিন ২০ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যে মিছিলটি বের হয়েছিল, তার প্রথম সারিতে ছিলেন আসাদুজ্জামান আসাদ। চানখাঁরপুল মোড় থেকে পুলিশের জিপ থেকে আসাদকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি ছোড়ে। সঙ্গে সঙ্গে আসাদের রক্তমাখা প্রাণহীন দেহ রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। আসাদের মৃত্যুতে সারা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়ল। আওয়াজ উঠল ‘আসাদের মন্ত্র-জনগণতন্ত্র’। 

শহীদ আসাদ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের নেতা এবং পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)’র প্রার্থী সদস্য। (পরে তাকে মরণোত্তর সদস্যপদ প্রদান করা হয়)। কিন্তু তিনি শহীদ হওয়ার পরে কোনো রাজনৈতিক দল বা গ্রুপের সদস্য হিসেবে তার পরিচিতি সীমাবদ্ধ হয়ে ওঠেনি। তিনি সমগ্র জনগণের সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তখনকার ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রবেশের মুখে নির্মিত ‘আইয়ুব গেট’ ও ‘আইয়ুব এভিনিউ’-এর নাম বদলে ‘আসাদ গেট’ ও ‘আসাদ এভিনিউ’ রাখা হয়। স্বৈরশাসকের দর্পচূর্ণ হয়ে এখনো স্বাধীন বাংলাদেশে টিকে আছে জনগণের সংগ্রামে আত্মবলিদানকারী শহীদের স্মারক।

প্রকৃতঅর্থেই, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এমন সব বৈশিষ্ট্য নিয়ে সংঘটিত হয়েছিল যাতে একদিকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সমগ্র পাকিস্তানের জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করেছিল, অন্যদিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপক সাধারণ মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল। এরই মাঝে তারা খুঁজেছিল জীবন-জীবিকার এক সুন্দর ভবিষ্যৎ। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও তৎকালীন পাকিস্তানে বসবাসকারী প্রায় সমগ্র বাঙালি এমন প্রতিবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে যে, শত অত্যাচার-নির্যাতন ও দুঃশাসনকে উপেক্ষা করে তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে আঘাত হানতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে সমগ্র পাকিস্তানের জনসাধারণের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আন্দোলন এবং পাকিস্তানের উভয় অংশের শ্রমজীবী মানুষের শোষণ মুক্তির সংগ্রাম সমন্বিত হয়েছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানে তা বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানের দিকে মোড় নিয়েছিল। সেই জন্যই ১৯৬৯ সালের পহেলা মে তৎকালীন মস্কোপন্থি কমিউনিস্ট পার্টির গোপন একটি ঘরোয়া সমাবেশে কমরেড মণি সিংহ উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, “২৪ জানুয়ারির মহান গণঅভ্যুত্থান হলো ‘আগামী বিপ্লবের ড্রেস রিহার্সেল’।” ১৯৪৮ সাল থেকেই যে বিদ্রোহের বীজ পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে প্রোথিত হয়েছিল, ’৫২, ’৫৪, ’৬২, ’৬৬ এবং ’৬৯-এর মধ্য দিয়ে তা বিস্তৃত হয়েছিল, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে তা জনরায়ে প্রতিফলিত হয়েছিল এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর শহীদ আসাদ ছিলেন মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত এই ধারাবাহিক সংগ্রামের একটি আলোক নিশান এবং ২০ জানুয়ারি তার শহীদ হওয়ার সময় তার পরিহিত রক্তভেজা শার্ট হয়ে উঠেছিল এই সংগ্রামেরই একটি অনন্য প্রতীক। যে জন্যই কবি শামসুর রাহমান যথার্থই তার কবিতার মধ্য দিয়ে ব্যক্ত করেছিলেন,‘ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শেভিত/মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট/শহরের প্রধান সড়কে/কারখানার চিমনি-চূড়োয়/গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে/উড়ছে, উড়ছে অবিরাম/আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,/চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়। /আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা/সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখ- বস্ত্র মানবিক;/আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’

এখনো শহীদ আসাদের শার্ট তাই শোষণ-বঞ্চনা, বৈষম্য এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে সংগ্রামের নির্দেশনা জাগায়। শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সার যেমন তার কবিতায় লিখেছিলেন ‘আসাদেরা হাজারো টর্নেডো’; প্রকৃতই মানবমুক্তির সংগ্রামে আসাদরা শোষণের বিরুদ্ধে হাজারো টর্নেডোর মতোই আঘাতের পর আঘাত হেনে যায়। তাই শহীদ আসাদ মুক্তির লড়াইয়ের প্রাণের পতাকা হিসেবেই এখনো পতপত করেই উড়ে চলেছে।

লেখক : সাংবাদিক
anindyaarif1981@gmail.com