আবারও সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রসঙ্গ।
প্রাতঃস্মরণীয় আলী সাহেব তখন দুই-চারখানি বইয়ের প্রণেতা। প্রায় জুড়িহীন ‘দেশে বিদেশে’র লেখক হিসেবে বিপুল সংবর্ধিত ও পরিচিত। ওই বইয়ের প্রকাশক নিউ এজ, কলকাতা। এরপরে তার বেশির ভাগ বইয়ের প্রকাশক মিত্র ও ঘোষ। সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনাবলিও মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড প্রকাশিত। এখন পর্যন্ত সেটিই মান্য সংস্করণ। ওই প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক সবিতেন্দ্রনাথ রায়, তার প্রকাশক আত্মজীবনী ‘কলেজ স্ট্রীটে সত্তর বছরে’ লিখেছেন মুজতবা আলী সম্পর্কে এ কথা। একটি নতুন বইয়ের পান্ডুলিপি সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের হাতে দেওয়ার পরে, ওই বিস্ময়কর সুন্দর হস্তাক্ষরের দিকে তাকিয়ে তিনি আলী সাহেব তথা তাদের সৈয়দদার কাছে জানতে চেয়েছেন বানান নিয়ে, ‘বানানের ব্যাপারে কী করব?’
সৈয়দ মুজতবা আলীর জবাবের আগে দু-কথা বলে নিই। তার পা-ুলিপি বিস্ময়কর এই জন্য, লোকটি যতই অগোছালো তকমাধারী ‘দেশে-বিদেশে’ পরিব্রাজক চালে মুসাফির হোন, তার হাতের লেখা ছিল অসাধারণ সুন্দর। পান্ডুলিপি তার বাউন্ডুলে ভাতের হাঁড়ি চুলোয় না দেওয়া চরিত্রের একেবারেই উলটো। একটু রাবীন্দ্রিক, কিন্তু গোটা গোটা, অক্ষরের দারুণ ছাঁচ খেলত টানের শেষতক! অস্থিরতার বিন্দুমাত্র ছাপ সেখানে নেই। হাতে নিলে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে হতো। অন্যত্র কোথাও পড়েছি, তিনি লিখতেন সবুজ কালিতে, সরু নিবের ঝরনাকলমে রুলটানা কাগজে। অমন দৃষ্টিনন্দন পান্ডুলিপিতে বানান ও বাক্যের অসংগতি থাকত না। বরং কখনো কখনো লেখার ভেতরেই কোনো কোনো বানানের ঠিকুজি কুলজি জানান দিয়ে দিতেন। যেমন, জওহরলাল বানানটি বাংলায় ঠিক নয়; কিংবা, আমির-ওমরাহ একসঙ্গে লেখা ব্যাকরণগতভাবে ভুল। কেন ঠিক নয়, কেন ভুল সে ব্যাখ্যাও থাকত একবারে বৈয়াকরণিকের ভাষ্যে, কিন্তু ভঙ্গিটি মজলিসি। যাকে বলে ওই শব্দের গুষ্টি উদ্ধার। অত বড় তালেবর না মশহুর তুলনামূলক ভাষাজ্ঞানীর পক্ষে তা খুব স্বাভাবিক। আর অমন সরেস সৃজনী ও পা-িত্য বাংলা ভাষায় প্রায় দোসরহীন। ফলে সেই মুনশির কাছ থেকে হস্তগত পান্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের ঝুলে-পড়া নজরের সঙ্গে মুখ থেকে ওই কথা তো বেরিয়ে পড়তে পারে।
সৈয়দ মুজতবা আলীর সোজাসাপটা জবাব, “ভানু (সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের ডাকনাম), তোমাদের হাউজে কি ‘চলন্তিকা’ নেই?”
বুঝুন অবস্থা। সৈয়দ মুজতবা আলীর পান্ডুলিপিতে বানান ভুল প্রায় থাকেই না। তবু প্রকাশনা সংস্থা থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে পান্ডুলিপিতে যে বানান রীতি আছে, বইটি কি সেভাবেই মুদ্রিত হবে। এর উত্তরে সৈয়দ মুজতবা জানাচ্ছেন, ‘চলন্তিকা’ই মান্য।
এ কথাগুলো এই জন্য লেখা, আমাদের এখানে বইপত্র হাতে নিলে কোনোপ্রকার বানানের রীতিটিতির বালাই প্রায় দেখাই যায় না। প্রায় প্রতিজন লেখকের নিজস্ব বানান রীতি আছে, যদিও সেই রীতি কোনো অভিধান অনুমোদিত হোক কি নাই-বা হোক। কেউ কেউ আরও এক কাঠি সরেস। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কিংবা পত্রিকাকে বলে দেন, তার এই বানান রীতি অনুযায়ী লেখাটি ছাপতে হবে। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বানান রীতি এখন বাংলা একাডেমি অনুযায়ী, কিন্তু দেশের কোনো কাগজই সে রীতি মানে না। তাহলে একটি বালক-বালিকা পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বানান রীতিতে এক ধরনের আর খবরের কাগজ পড়ার সময়ে ভিন্ন ধরনের বানান রীতি পড়ছে। ওদিকে অক্ষর ও বর্ণ নিয়েও তো নির্দেশ আছে। সেখানে বলা হয়েছে যুক্তাক্ষর স্বচ্ছ হবে। ফলে পাঠ্যপুস্তক বোর্ড লিখছে, ‘ঙগ’; কিন্তু পত্রিকা লিখছে, ‘ঙ্গ’। এমনকি বিভিন্ন বর্ণব্যবস্থাপনায় অনেকেই ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি এভাবে ‘বঙগবনধু’ এই স্বচ্ছরূপে লেখা হতে পারে, তা জানেনও না। এ নিয়ে তর্কে শামিলও হতে দেখেছি। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বইপত্রে সেভাবেই লিখিত হচ্ছে। একজন প্রাথমিকের শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ে স্বচ্ছরূপে বানানটি দেখছে ‘বঙগবনধু’, দৈনিক সংবাদপত্রে দেখছে ‘বঙ্গবন্ধু’। ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটিও স্বচ্ছরূপে ‘মুকিতযুদধ’ এভাবে লিখিত হয়। দুইভাবে লিখিত হওয়ায় বালক-শিক্ষার্থীর চোখ ও মগজের ওপরে অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়ে। আপাতত এদিক থেকে ফেরার উপায়ও নেই। কিন্তু প্রায় প্রত্যেক লেখকের নিজের নিজের বানান, এখান থেকে ফেরার উপায় কী?
সেই জন্যই সৈয়দ মুজতবা আলীর বরাতে ‘চলন্তিকা’ অভিধানের প্রসঙ্গ। সৈয়দ মুজতবা আলী অনেকগুলো ভাষা খুব ভালো জানতেন। কতগুলো? বারো-চোদ্দটা? হবে। আমাদের এখন কটা হলে চলে? থাক্। তবে বাংলা আর সংস্কৃত এ দুটো জানতেন যে তা নিয়ে তো কোনো সংশয় নেই। আর, বাংলা ভাষায় উত্তর ভারতীয় আর ফারসি-আরবি ভাষার শব্দের আনাগোনা, অপভ্রংশতাও প্রচুর। সে সব শব্দেরও বুৎপত্তি জানতেন। জানতেন, এই জন্য যে, ফারসি আরবি আর উর্দু-হিন্দিও তার ভালোই জানা ছিল, যাকে বলে লিখিতে পড়িতে ও বলিতে পারা, তিন দিকেই আল্ ওস্তাদ। কিন্তু বাংলা ভাষার বানান নিয়ে তিনি কোনো ধরনের ওস্তাদি করেননি। সেই বিষয়টি তিনি প্রখ্যাত অভিধানকার রাজশেখর বসুর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, সেই অভিধানটাকেই মান্য করছেন। তার বানানের বিরোধিতা করে পত্রিকায় একটি কলামও লেখেননি যে, শ্রীযুক্ত রাজশেখর বসু মহাশয় রসায়নবিদ্যায় পারদর্শী মানুষ। তিনি বড় বিজ্ঞানী হইতে পারেন, বাংলা ভাষার বানান সম্পর্কে তাহার কোনো ধরনের ধারণাই নেই, ধারণা কিছুমাত্র যদি থাকিয়া থাকে, তা আছে আমার মতো শান্তিনিকেতনের ইংরাজির ছাত্তরের। একি সৈয়দ মুজতবার বড়ত্ব না আত্মআবিষ্কার! যেন বানান সম্পর্কে কথা বলার ক্ষমতা অভিধানকারের।
সে কাজে অভিধানকার দীর্ঘদিন লেগে থাকেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে একটি শব্দের নির্দিষ্ট বানানে পৌঁছান। বানানও পরিবর্তনশীল যদি তা ওই ভাষার ব্যাকরণ অনুমোদন করে। কিংবা কোনো জাতির জিহ্বার কারণেও বদলায়। অভিধানে সে ব্যাখ্যাও থাকে।
হঠাৎ একদিন টেলিভিশনে দেখেছিলাম, একজন বিশিষ্ট অভিনেত্রী একজন প্রখ্যাত অভিনেত্রীকে বলছেন, হ্রস্ব ‘ই’-কার দিয়ে লিখুন, এখন তো বাংলা একাডেমি সব বানান হ্রস্ব করে দিয়েছে। প্রবীণ অভিনেত্রী সাহিত্যের ছাত্রী, তিনি কিছু বললেন না, অনায়াসে মেনে নিলেন। অর্থাৎ, কোনো পক্ষেরই বাংলা ভাষা তো ভালো কোনো ভাষার গতি প্রকৃতি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। ওদিকে আমি ভাবলাম স্থাপত্যজ্ঞানসম্পন্ন এত বড় নায়িকা যখন আইনপ্রণেতা নায়িকাকে এই জ্ঞান দিতে পারেন তো বাংলা একাডেমি অভিধান খুলে দেখি ঘটনা সত্য কি না। দেখলাম, ‘নারী’ আর ‘অভিনেত্রী’ বানান দুটো বাংলা একাডেমির সব অভিধানে দীর্ঘ ‘ঈ’-কার। ওই বানান দুটো দেখার কারণ, তারা নারী ও অভিনেত্রী। আজকাল অভিনেত্রী শব্দটা অচল বলে দেখলাম, অভিনয়শিল্পী। সেখানে ‘শিল্পী’ শব্দটিও দীর্ঘ ‘ঈ’-কার। তারা জানেন না, এসব আলটপকা কথা অজ্ঞানতারই উলটো পিঠ। প্রচার মাধ্যমে এসব বললে দর্শকশ্রোতা সহজে মেনে নেয়। এদিকে লেখকরা কেউ কেউ প্রকাশ করেন জেদ ও বিজ্ঞের মূর্খতা। সেটা খারাপ। আর, জনপ্রিয়রা যখন বলেন সেটা অজ্ঞতার প্রচারক। আর, এর বাইরে প্রকাশক মহোদয়রা যা করেন বই সম্পাদনা নিয়ে সে বিষয়ে আর কথা না তোলাই ভালো। তবে সে কথা পেটে রাখা কাজের কথা নয়!
৮ জানুয়ারি ২০২১। সিলেট।
লেখক কথাসাহিত্যিক
prasantamridha@gmail.com