অ্যাটাচমেন্ট হলো শিশুর সঙ্গে বাবা-মায়ের নিবিড় আবেগীয় বন্ধন। জন্মের পর থেকে শিশু ও যতœকারীর মধ্যে এই বন্ধন তৈরি হয়। সারা জীবন এর প্রভাব থাকে। একটি শিশুর সঙ্গে তার বাবা-মায়ের অ্যাটাচমেন্ট ভালো হলে শিশুর জীবনের শুরুটা ভালো হয়। পরবর্তী সময়ে জীবনে শিশুটি মানসিক চাপ ও নেতিবাক অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কীভাবে শিশুর সঙ্গে আবেগীয় সম্পর্ক তৈরি করবেন সে বিষয়ে জানালেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট তানজির আহমেদ তুষার
বাবা মায়ের সঙ্গে এ্যাটাচমেন্ট থাকলে সেই শিশু সামাজিক যোগাযোগে পারদর্শী হয়ে উঠতে পারে। অন্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আবিষ্কার করতে পারে। জীবনের মূল্য অনুধাবন করতে পারে এবং অন্যের প্রতি সহমর্মী হয়ে অন্যকে সহযোগিতা করতে পারে।
শিশুকে অনেক ভালোবাসি তার মানেই যে শিশুর সঙ্গে আমার এ্যাটাচমেন্ট নামের বিশেষ বন্ধনটি আছে তা বলা যায় না। শিশুকে জন্ম দিয়েছি বলেই তার সঙ্গে আমার এ্যাটাচমেন্ট আছে এই ধারণাও ভুল। এটি শুধু শিশুর সঙ্গে থাকা বা যত্ন করা নয় বরং এই বিশেষ বন্ধনটি তৈরি হয় শিশুর প্রতি যতœশীল হওয়ার পাশাপাশি তার সঙ্গে অবাচনিক আবেগীয় যোগাযোগের মাধ্যমে। আসুন দেখে নিই শিশুর সঙ্গে এ্যাটাচমেন্ট তৈরি করার কিছু কৌশল
দুগ্ধপান
শিশুকে সঠিক নিয়মে মাতৃদুগ্ধ পান করালে মায়ের সঙ্গে শিশুর এ্যাটাচমেন্টের সূত্রপাত হয়। তাই প্রথম থেকেই শিশুকে সঠিক নিয়মে দুগ্ধপান করানো প্রয়োজন।
উপস্থিতি
শিশুর প্রয়োজনে সব সময় শিশুর পাশে থাকুন। শিশু যেন নিজেকে কখনোই নিজেকে একা না দেখতে পায়। কারণ শিশুর মধ্যে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ার উদ্বেগ থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে সে নিজেকে একা পেলে যত্নকারীর ওপর আস্থা হারায়। তাই নিরাপদ আবেগীয় বন্ধন তৈরির জন্য শিশুর সঙ্গে সব সময় উপস্থিত থাকুন।
অবাচনিক যোগাযোগ
শিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। কথার সঙ্গে সংগতি রেখে মুখভঙ্গির ব্যবহার বেশি করে করুন। কারণ শিশু কথার অর্থ না বুঝলেও আপনার মুখভঙ্গির মাধ্যমে আপনার আবেগ অনুমান করতে পারে। ফলে তার সঙ্গে আপনার আবেগীয় সম্পর্কটি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একইভাবে শিশুর অবাচনিক বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রকাশ করা কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করুন।
স্পর্শ ও আদর
শিশুর প্রতি আন্তরিক থাকুন এবং তাকে স্পর্শ করে আদর করুন। স্পর্শ শিশুর সঙ্গে এ্যাটাচমেন্ট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশুকে যতœ নেওয়ার সময়ও যথেষ্ট পরিমাণে স্পর্শ করুন। মায়ের ত্বকের সঙ্গে নবজাতক শিশুর ত্বকের সরাসরি স্পর্শ মা-শিশুর মধ্যে এট্যাচমেন্ট তৈরি করে।
যত্নশীলতা
শিশুরা নিজের প্রয়োজনগুলো সব সময় প্রকাশ করতে পারে না। তাই তাদের কান্না, অবাচনিক সংকেত ও অবস্থা দেখে তার প্রয়োজনগুলো বোঝার চেষ্টা করুন ও প্রয়োজনগুলো পূরণের চেষ্টা করুন।
খেলা
শিশুর জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মা-বাবার প্রতি প্রতিক্রিয়া করে। এসময় থেকে শিশুর সঙ্গে বয়স অনুযায়ী খেলুন। যেমন : হাত-পা নেড়ে দেওয়া থেকে শুরু করে চার-হাত পা এক জায়গায় ধরে শব্দ করে ছেড়ে দেওয়ার মতো অনেক খেলা প্রচলিত রয়েছে। পেশাগত জীবনের গুরুগাম্ভীর্য্য ত্যাগ করে শিশুর সঙ্গে হাসি মুখে খেলুন ও মজা করুন।
পর্যবেক্ষণ
শিশুর প্রতি মনোযোগী হোন। শিশুকে জানা ও বোঝার চেষ্টা করুন। তার বিকাশমূলক মাইলফলকগুলো ঠিকমতো হচ্ছে কি না তা খেয়াল করুন। শিশুর নতুন নতুন আচরণ ও অবাচনিক সংকেতের মাধ্যমে শিশুর মন ও আবেগের প্রতি সংবেদনশীল থাকুন। ফলে আপনি শিশুকে ও শিশু আপনাকে ভালো বুঝতে পারবে।