রেলের ই-টিকিটে অনিয়ম-লোকসান!

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রেলওয়ে কখনো লাভের মুখ দেখেনি। রেল কর্তৃপক্ষের অজুহাত ছিল বিনিয়োগের অভাব ও লোকবল স্বল্পতার। এই পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে কয়েক দফায় রেলে ব্যাপক বিনিয়োগ করে। গত এক দশকে রেল খাতে সরকার ৬৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, রেলের ইঞ্জিন-কোচ ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ ও বেতন-ভাতার পেছনে এই বিপুল অর্থ খরচ করা হয়েছে। এর বাইরে রেল কর্তৃপক্ষ যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে দুই দফা ভাড়াও বাড়িয়েছে। কিন্তু বিপুল বিনিয়োগের পরও রেলের গতি কমছে। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেলে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। এসব বিবেচনায় নিলে এটা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে, যথাযথ পরিকল্পনার অভাব এবং পরিচালনায় অনিয়ম ও দুর্নীতিই রেলের লোকসানের নেপথ্য কারণ। এ প্রসঙ্গে রেলের অনলাইন বা ই-টিকিট বিক্রিতে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একটি বেসরকারি কোম্পানির একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটে লোকসানি রেলের আরও লোকসানের যে চিত্র উঠে এসেছে সেটা বিশেষভাবে আমলে নেওয়া যেতে পারে।

সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘রেল টিকিটে সিএনএসের একচেটিয়া রাজত্ব’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনে রেলের টিকিট বিক্রিতে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমস লিমিটেড (সিএনএস) এর বিরুদ্ধে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অভিযোগ উঠে আসে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেই বিশেষ গোষ্ঠীর সহায়তায় দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে নিচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে মেয়াদান্তে বাড়ছে চুক্তিমূল্যও। এভাবে টানা ১৪ বছর ধরে রেলের টিকিট বিক্রি করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও গত মার্চেই রেলের সঙ্গে তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তখন উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সহজ লিমিটেডকে টিকিট বিক্রির জন্য মনোনীত করেছিল রেল কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু দরপত্রে সহজের চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বেশি দরদাতা হয়েও উচ্চ আদালতে মামলা করে চুক্তি কার্যক্রম স্থগিত করে রেখেছে সিএনএস।

২০০৭ সালে টিকিট বিক্রির জন্য সিএনএসের সঙ্গে ৯ কোটি ৯১ লাখ টাকায় ৬০ মাসের (পাঁচ বছর) চুক্তি করে রেল কর্তৃপক্ষ। তবে ট্রেনের সংখ্যা, কোচ, আসন এবং স্টপেজ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে মেয়াদ শেষে চুক্তির মূল্য দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৮ লাখ টাকা। মেয়াদ শেষে রেলের নতুন দরপত্র আহ্বান ছাড়াই ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নিয়ে চুক্তির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়। এরপর ২০১৪ সালে দরপত্র আহ্বান করা হলে আবারও ৩১ কোটি ৩২ লাখ টাকা মূল্যে পাঁচ বছরের জন্য কাজ পায় সিএনএস। ওই চুক্তিতেও নানা কারণ দেখিয়ে চুক্তিমূল্য ৩৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৪১ কোটি ৯০ লাখ টাকা করা হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে চুক্তির মেয়াদ ফুরানোর নির্দিষ্ট সময়ের আগে দরপত্র আহ্বান ও নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির কার্যক্রম শেষ করতে পারেনি রেলওয়ে। এভাবে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে টিকিট বিক্রির সর্বশেষ অনুমোদনও গত বছরের মার্চেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এরপর রেলওয়ে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যেমন চুক্তি করেনি, তেমনি সিএনএসের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদও বাড়ায়নি। তবুও চুক্তি ছাড়াই এখনো টিকিট বিক্রি করছে সিএনএস।

এদিকে, গত বছর ই-টিকিট বিক্রির উন্মুক্ত দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কাজ পায়নি সহজ লিমিটেড। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী চুক্তি হলে টিকিটপ্রতি সহজকে রেলের কমিশন দিতে হতো মাত্র ২৫ পয়সা। সিএনএস আগের চুক্তিতে কমিশন নিত ২ টাকা ৯৯ পয়সা। সে হিসাবে সহজের চেয়ে সিএনএসকে ২ টাকা ৭৪ পয়সা বেশি দিতে হচ্ছে। রেলে মাসে গড়ে টিকিট বিক্রি হয় ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার। নতুন চুক্তি না হওয়ায় রেলওয়ের কাছ থেকে মাসে গড়ে ৯১ লাখ ৩২ হাজার ৪২০ টাকা বেশি নিচ্ছে সিএনএস। অথচ নতুন দরপত্রেও টিকিটপ্রতি তারা প্রস্তাব করেছিল ১ টাকা ২২ পয়সা।

এসব ঘটনাপ্রবাহ খেয়াল করলে সংশয়ের কোনো অবকাশ থাকে না যে, কোনো একটি স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতার কারণেই নানারকম অনিয়ম ঘটিয়ে রেলের লোকসান সত্ত্বেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটিকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে টানা ১৪ বছর ধরে একচেটিয়াভাবে টিকিট বিক্রির কাজ দিয়ে রাখা হয়েছে। সর্বশেষ দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে ‘আবেদনকারীকে অবশ্যই বছরে ৫০ লাখ টিকিট বিক্রির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে’ বলে শর্ত হয়তো এই কারণেই জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। আর সহজ লিমিটেড সর্বনিম্ন দরপত্র দাতা হয়েও একত্রে এই অভিজ্ঞতার সনদ জমা দিতে না পারায় সিএনএস-এর করা রিটের মাধ্যমে রেলের নতুন চুক্তির প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। ই-টিকিট বিক্রিতে একটি প্রতিষ্ঠানের এই একচেটিয়া আধিপত্য বিষয়ে অবশ্যই একটি বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত এবং অবিলম্বে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে স্বচ্ছ চুক্তির প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।