রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা ‘রাজউক’-এর কর্মকা-ের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে সংস্থাটির বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ নিয়ে। রাজধানীর নগরায়ণ পরিকল্পনা, নীতিমালা তৈরি এবং সে অনুযায়ী বিষয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করাই রাজউকের মূল কাজ। কিন্তু বিগত দেড়-দুই দশকে বেশ কিছু আবাসন প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে অনিয়ম, জালিয়াতি এবং সেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জমি অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত আদিনিবাসীদের যথাযথভাবে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া নিয়ে বারবার আলোচনায় এসেছে রাজউক। সম্প্রতি একই ব্যক্তির নিজের বা পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক প্লটের মালিকানা নিয়ে আবারও তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজউকে। এমতাবস্থায় অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে এমন একাধিক প্লটের মালিকানা বাতিল করে সেসব প্লট পুনরায় বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নিতে চাচ্ছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘জোড়া প্লট না ছাড়লে ফৌজদারি মামলা!’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে রাজউকের সাম্প্রতিক এই উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজউকের প্লট বরাদ্দ পেতে হলে কয়েকটি শর্ত মানতে হয়। এরমধ্যে অন্যতম স্বামী/স্ত্রী বা পোষ্য কেউ এর আগে রাজউকের প্লট বা ফ্ল্যাট পাননি এমন ব্যক্তিরাই কেবল প্লটের বরাদ্দ পাবেন। কিন্তু অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি বরাদ্দ নীতিমালার এই শর্ত লংঘন করে স্বামী এবং স্ত্রী দুজন মিলে একাধিক প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজউক এমআইসএস (যেখানে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়) শাখার দুর্বলতার কারণে ইতিমধ্যে এভাবে বিপুলসংখ্যক প্লট বরাদ্দে অনিয়ম হয়েছে। এবার সংস্থাটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম বোর্ড সভা করে জোড়া প্লটের বিষয়ে শক্ত অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানে প্লট বাতিল, জমা দেওয়া সমুদয় অর্থ বাজেয়াপ্ত ও প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে এমন বেশ কিছু প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে এবং যাদের একাধিক প্লট আছে তাদের একটি রেখে বাকিটা কর্তৃপক্ষের বরাবরে সমর্পণ করতে বলা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে সেটা না করলে প্লটের জন্য জমা দেওয়া অর্থ বাজেয়াপ্তসহ প্লটও বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
রাজউকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরিচালক জানিয়েছেন, বেআইনিভাবে নেওয়া প্লট/ফ্ল্যাটগুলো বাতিল করা গেলে কর্তৃপক্ষের হাতে কমপক্ষে ৭০০-৮০০ প্লট আসবে। এগুলো একসঙ্গে না এলেও শক্ত তদারকির মাধ্যমে বের করে আনা সম্ভব। প্লট বরাদ্দের নথিপত্র থেকে জানা গেছে, তথ্য গোপন করে কিংবা অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধভাবে একাধিক প্লট গ্রহীতাদের মধ্যে রাজউকের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, চাকরিজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজউকের বিরুদ্ধে নানারকম অনিয়ম ও দুর্নীতির যে অভিযোগ রয়েছে, অনিয়মের মাধ্যমে একই ব্যক্তিকে একাধিক প্লট বরাদ্দ দেওয়া তারই প্রমাণ। অবশ্য একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, একই ব্যক্তির নিজের বা পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক প্লট বরাদ্দের চেয়ে মাত্রাগতভাবে আরও বড় বড় অনিয়ম রাজউক করে আসছে। সম্প্রতি ‘গোল্ডেন মনির’ নামে এক ব্যবসায়ীর একাই রাজউকের দুই শতাধিক প্লট থাকার বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশের পর টনক নড়ে সরকারের। এর পরপরই রাজউক প্লটের হিসাব চেয়ে পাঠায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। পিএমও’র নির্দেশনার পর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প, উত্তরা-তৃতীয় পর্ব আবাসিক প্রকল্প, ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পসহ বারিধারা, গুলশান, বনানী ও অন্যান্য এলাকার মোট প্লট, বরাদ্দকৃত ও খালি প্লটের সংখ্যা, ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বরাদ্দকৃত প্লটের সংখ্যাসহ বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠায় রাজউক কর্তৃপক্ষ। প্লট বরাদ্দে অনিয়মের পাশাপাশি আবাসন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথভাবে ক্ষতিপূরণ না দেওয়াও রাজউকের বিরুদ্ধে একটা বড় অভিযোগ। অন্যদিকে এমন ক্ষতিগ্রস্তরা প্রকল্প এলাকায় বাড়িঘরসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করে রাখায় দুই দশকের বেশি সময় পার হলেও পূর্বাচল প্রকল্প শেষ করতে পারেনি রাজউক।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করে রাউজকের আবাসন প্রকল্প ও প্লট বরাদ্দের মধ্য দিয়ে ওইসব এলাকার আদিনিবাসীরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সংশ্লিষ্টদের। কারণ সাধারণ মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি দখল করে শহর বানানো এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই বরাদ্দ পান বিত্তশালী এবং ক্ষমতাবানরা। প্রকৃত আদিনিবাসীরা ক্ষতিপূরণের টাকা এবং প্লটের বরাদ্দের জন্য বছরের পর বছর ঘুরেও কোনো সুরাহা পান না। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে প্রভাবশালীরা নানা পন্থায় একাধিক প্লটের মালিক থেকে দুই শতাধিক প্লটেরও মালিক বনে যাচ্ছেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপের পর এখন অনিয়মের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত প্লট বাতিল করা অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু যে কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও অদক্ষতার কারণে এসব অবৈধ বরাদ্দ হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। নইলে আগামীতেও এমন অনিয়মের আশঙ্কা থেকেই যাবে।