গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত সম্মুখসারির কর্মী বিবেচনায় ১০ হাজার টিকা চেয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনসে কর্মরতদের জন্য অগ্রাধিকার ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একটি চিঠি পাঠিয়েছে বেচিকক। তাছাড়া পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের টিকা প্রয়োগের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতিমধ্যে গতকাল পুুলিশের মতিঝিল ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট দিদারুল আলম কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন। টিকা সংক্রান্ত বিষয়ে গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর ও বেবিচকে অনির্ধারিত একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে পুলিশের কারা আগে টিকা পাবেন তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, টিকা শুধু বেবিচকের জন্য চাওয়া হয়নি। গোটা দেশের এভিয়েশন খাতে কর্মরত সরকারি-বেসরকারি কর্মীদের জন্যই একযোগে টিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন থেকেই আবেদন করা হয়েছে। কারণ গোটা পৃথিবী যখন করোনা মহামারীতে ঘরবন্দি তখনো সব ধরনের ভয়ভীতি উপেক্ষা করেই বিমানবন্দরে সেবা নিশ্চিত করছে তারা। তাদের অবদান টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। অনেক কর্মী করোনায় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। তাই টিকার গণপ্রয়োগ কর্মসূচিতে এভিয়েশন খাতের এই ১২ হাজার কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। আশা করি আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকা ব্যবহার করতে পারব।
এদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরে ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানান, দেশে করোনার টিকা আসায় আমরা আশাবাদী হয়ে উঠছি। করোনার সেবা ও দেশের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে ৮৩ সহকর্মীকে হারিয়েছি। অন্তত ২০ হাজার সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। টিকা প্রয়োগের কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর আজ (গতকাল) পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একটি বৈঠক করেছেন। তিনি বলেন, বৈঠকে কারা আগে টিকা নেবেন তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বেশিরভাগ কর্মকর্তা একমত হয়েছেন- মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যরা সবার আগে টিকা নেবেন। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা টিকা নেবেন। বিষয়টি আইজিপিকে অবহিত করা হয়েছে। পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা টিকা নিতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের টিকার বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ শীর্ষ মহলের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। তাছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেও পুলিশের টিকার বিষয়টি বলা হয়েছে। আশা করি দ্রুত পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা টিকা নিতে পারবেন।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাদের জানিয়েছেন, এভিয়েশন খাতের কর্মীদের সম্মুখ সারির বিবেচনায় প্রাধিকার দেওয়া হবে। শুরুর দিকেই তাদের টিকা নিশ্চিত করা হবে। কারণ দেশে টিকার সংকট হবে না। দুদিন আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ১২ হাজার টিকা চেয়ে আমরা চিঠি পাঠিয়েছি। আশা করি দ্রুত সময়ে টিকা পাওয়া যাবে।
বেবিচকের সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, বেবিচকের নিজস্ব কর্মী রয়েছে প্রায় চার হাজার। তাদের সহযোগী হিসেবে বিমানবন্দরে নিয়োজিত রয়েছে আনসার, এভসেক, এপিবিএন ও অন্যান্য সংস্থার আরও প্রায় দুই হাজার। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস বাংলা, নভো ও রিজেন্টের আরও প্রায় ৬ হাজার কর্মী বিমানবন্দরে কর্মরত। তাদের সবাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সবগুলো বিমানবন্দরে কর্মরত। পালাক্রমে তিন শিফটে ডিউটি করেন। বিশ্বব্যাপী এভিয়েশন খাতের মতোই তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার অগ্রাধিকার কর্মী হিসেবে বিবেচিত। করোনা মহামারীতে এসব জনবলকে সার্বক্ষণিক ডিউটি করতে দেখা গেছে। চীনের উহানে করোনা শুরু হওয়ার পর গত মার্চে যখন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে এ রোগকে মহামারী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয় তখন থেকেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক দেশগুলোতে শুরু হয় লকডাডউন। বাংলাদেশেও ২৫ মার্চ থেকে ঘোষণা করা হয় লকডাউন। ঢাকাসহ গোটা দেশের শহরগুলো জনমানবশূন্য ও ভুতুড়ে হয়ে পড়ে। এমন ভয়ংকর ও কঠিন সময়েও কিন্তু বিমানবন্দর এক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি। এপ্রিল থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে একে একে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেলেও বিশেষ ব্যবস্থায় চার্টার্ড ও স্পেশাল ফ্লাইট চলাচল করেছে বিশ্বব্যাপী। এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান বলেন, শুধু তিন মাস সিডিউল ফ্লাইট চলাচল স্থগিত ছিল। কিন্তু স্পেশাল ও চার্টার্ড ফ্লাইট চলেছে প্রতিদিনই। আন্তর্জাতিক নিয়মমাফিক আকাশপথ কখনোই বন্ধ করা যায় না। সে সুযোগও নেই। কার্গো ওষুধসহ জরুরি পণ্য দেশ থেকে দেশান্তরে পাঠানোর প্রয়োজনেই বিমানবন্দর অপারেশনাল রাখতে হয়েছে। এতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজে আসতে বাধ্য হয়েছেন এভিয়েশন খাতের কর্মীরা। এভিয়েশন বলতে শুধু বেবিচকের নিজস্ব জনবল নয়। বিমান নভো ইইউএস বাংলা রিজেন্টসহ অন্যান্য এয়ারলাইনসের সমস্ত কর্মী যারা বিমানবন্দরে অপারেশনাল কাজে দায়িত্ব পালন করেন তাদের বুঝানো হয়। এসব মিলিয়ে ধরলে কমপক্ষে ১২ হাজার কর্মী এখানে সক্রিয়। তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে করোনার আগে-পরে সব সময়। আপনারা জানেন করোনায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। এখনো করোনা আতঙ্ক ও ঝুঁকি রয়ে গেছে। সেজন্যই তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় নিয়ে টিকা চাওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে।
পুলিশ ও বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এভিয়েশনসহ সম্মুখসারির সব শ্রেণি ও পেশাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হবে। ভারত থেকে বিনামূল্যে উপহার হিসেবে পাওয়া প্রথম চালানের ২০ লাখ টিকা থেকেই দেওয়া হবে সম্মুখসারির সেবকদের। সে হিসেবে বেবিচকের চাহিদানুযায়ীই টিকা বরাদ্দ দেওয়া হবে।