‘বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার’ বা দ্বিমুখী আচরণ বৈকল্য একটি গুরুতর মানসিক রোগ। ‘বাই’ শব্দের অর্থ ‘দুই’ আর ‘পোলার’ হলো মাথা বা দিক। এই রোগের দুটি দিক থাকে। একদিকে থাকে ‘ডিপ্রেশন বা বিষন্নতা’, অপরদিকে থাকে ‘ম্যানিক কন্ডিশন’। একদিকে যেমন বিষন্নতা কাজ করে, আরেকদিকে কাজ করে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস। শুনতে খুব সমস্যাদায়ক মনে না হলেও বিষয়টি খুবই গুরুতর। এর একদিকে অতিরিক্ত আনন্দ অনুভূত হয়, অন্যদিকে বিষাদে মন ছেয়ে যায়। একদিকে ব্যক্তি প্রচণ্ড বিষন্নতায় ভোগে, বেশির ভাগ সময়ই মন খারাপ থাকে। অন্যদিকে ম্যানিক কন্ডিশনের কারণে ব্যক্তি নিজেকে অনেক বড় মনে করতে থাকে, অতি আনন্দ অনুভব করে, প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস অনুভব করে। এ ছাড়া সব কিছুতেই অতিরিক্ত অস্থিরতা কাজ করে। তবে দুটি দিক থাকলেও রোগ একটিই।
উপসর্গ : এই রোগের বিষন্নতার লক্ষণ হিসেবে প্রকাশ পায় অনেক দিন ধরে মন খারাপ থাকা, কোনো কাজে আগ্রহ না পাওয়া, আনন্দের অনুভূতি কমে যাওয়া, ঘুম কমে যাওয়া বা বেশি ঘুমানো, ঘুম ভেঙে মনে হওয়া- আরেকটি খারাপ দিন শুরু হলো, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, কাজে মনোযোগের অভাব, অহেতুক কোনো কাজের জন্য অনুতপ্ত বোধ করা, ভালোবাসা বা যৌনতার অনুভূতি কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হওয়া, খাবার ইচ্ছা কমে যাওয়া বা খুব বেশি খেতে ইচ্ছে করা, শারীরিক কোনো কারণ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে মাথাব্যথা থাকা ইত্যাদি।
অন্যদিকে, ব্যক্তি অস্বাভাবিক আনন্দ অনুভব করে। তখন তার মধ্যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ভাব কাজ করে। দ্রুত এবং অতিরিক্ত কথা বলে। ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। নিজেকে অনেক শক্তিশালী মনে করে, অস্থির থাকে। ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। কেউ কেউ অতিরিক্ত যৌন চাহিদা অনুভব করে। অবাস্তব পরিকল্পনা করে। অতিরিক্ত টাকা-পয়সা খরচ করে বা কেনাকাটা করতে চায়। সমাজের বিভিন্ন নিয়মকানুন পরিবর্তনে নিজেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত মনে করে। বিচার করার ক্ষমতা ঠিকমতো থাকে না। কাজের ফলাফল কী হবে তা না ভেবেই বিভিন্ন কাজ করার প্রবণতা দেখা যায়।
কারণ : কিছু জেনেটিক্যাল (জিনগত) ও বায়োলজিক্যাল (জৈবিক) পরিবর্তনের কারণে এই রোগ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ছাড়া অস্বাভাবিক মস্তিষ্কের গঠনের কারণে এ রোগ হতে পারে। নিউরোট্রান্সমিটারের পরিবর্তনের কারণেও অনেক ক্ষেত্রে এটি হতে পারে। আবার জেনেটিক ও বায়োলজিক্যাল কারণের পাশাপাশি পরিবেশের বিভিন্ন কারণেও এই রোগ হয়।
চিকিৎসা : বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডারে ম্যানিক এবং বিষণœতা দুটো বিষয়ের একসঙ্গে চিকিৎসা করা হয়। এ ক্ষেত্রে কয়েক ধরনের ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। মেজাজ স্বাভাবিক রাখার জন্য মুড স্ট্যাবিলাইজার জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়। বিষণœতা অথবা ম্যানিক পর্যায়, কোনোদিকই যেন রোগীকে পেয়ে না বসে, মনকে মাঝখানে ধরে রাখতে এই ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিষন্নতায় আক্রান্ত মনকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনার জন্য অ্যান্টিডিপ্রেশনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি ম্যানিক পর্যায়ের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ রোগীকে সেবন করতে দেওয়া হয়। অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধগুলো ম্যানিয়া থেকে নামিয়ে বিষন্নতার পর্যায়ে নিয়ে আসে। তখন মুড স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করা হয়। মুড স্ট্যাবিলাইজার জাতীয় ওষুধ তিন থেকে পাঁচ বছর খেতে হয়।
তথ্যসূত্র : ভেরি অয়েল মাইন্ড