বেড়েছে ভোটের হার সঙ্গে সহিংসতাও

সংঘর্ষ-ভাঙচুর, গোলাগুলি, মৃত্যু, কেন্দ্র দখল, এজেন্ট বের করে দেওয়া, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং প্রিসাইডিং অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষাবলম্বনের অভিযোগ তুলে প্রার্থীর ভোট বর্জনসহ নানা সহিংসতার মধ্যেও চলমান পৌর নির্বাচনে ভোটদানের গড়হার বেড়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হয়ে সর্বশেষ গত শনিবার পর্যন্ত তিন দফায় অনুষ্ঠিত মোট ১৪৫ পৌরসভার নির্বাচনে গড় ভোটের হার ৬৫.৮ শতাংশ। এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ১১০, বিএনপির ৯ এবং ২৫ জন স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া বিরোধী দল জাতীয় পার্টির এবং জাসদের একজন করে মেয়র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। তবে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার নির্বাচন কমিশনের এ হিসাবকে মনগড়া বলে উল্লেখ করেছেন।

প্রথম দফায় ২৩ পৌরসভায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ( ইভিএম) মাধ্যমে ভোটগ্রহণে গড়ে ৬৫.০৬ শতাংশ ভোট পড়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৬০ পৌরসভায় ইভিএম ও ব্যালটে ভোট পড়েছে ৬১.৯২ শতাংশ। তৃতীয় ধাপে ব্যালটে ৬২ পৌরসভায় ভোট পড়েছে ৭০ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জনসংযোগ শাখা থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। তবে বেশিরভাগ পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীসহ অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী ‘কারচুপি’ ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করেছেন।

এদিকে তিন ধাপের পৌর নির্বাচনে ভোটের গড়হার বাড়লেও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে ভোটের হার মাত্র সাড়ে ২২ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৌর ভোটের সঙ্গে অন্য কোনো ভোটের তুলনা করলে চলবে না। পৌর ভোটের পরিসর ছোট। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা বেশি। যার জন্য অন্য ইলেকশনের সঙ্গে এর তুলনা করা ঠিক হবে না।’

চসিক ভোটের গড়হার কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘সকাল বেলা ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই বেশকিছু ককটেল বিস্ফোরণ হয়। তারপর স্বাভাবিকভাবে ভোটের হার কমবে।’

পৌর নির্বাচনে ভোটের গড়হার বাড়ার পাশাপাশি সহিংসতা বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে ইলেকশনের সময় অন্যান্য সহিংসতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ভোটের সময় ব্যক্তিগত সমস্যার সুযোগ কাজে লাগায় অনেকে।’

তবে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার নির্বাচন কমিশনের উল্লেখ করা ভোটের হিসাবকে মনগড়া বলে দাবি করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এগুলো কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। এগুলো বিশ্বাস করার নয়। ইভিএম ভয়াবহ যন্ত্র। যে দল ইচ্ছা, সেই দলকে জিতিয়ে দেওয়া সম্ভব ইভিএমের মাধ্যমে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে! এটা আদৌও সম্ভব? নির্বাচন কমিশন মনগড়া হিসাব দিয়েছে।’

করোনা মহামারীর মধ্যে স্থানীয় সরকারের দলীয় প্রতীকের এ নির্বাচনে প্রথম ধাপে ২৩ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থীদের মধ্যে ১৮, বিএনপির ধানের শীষের ২ এবং ৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছেন। পটুয়াখালীর কুয়াটাকায় সর্বোচ্চ ৮৫.৩১ শতাংশ ভোট পড়েছে এ নির্বাচনে। আর সবচেয়ে কম চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ৪০.৮৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই ২৩ পৌরসভায় এবার ভোটার ছিলেন ৬ লাখ ১২ হাজার ৫৭০ জন। এর মধ্যে মেয়র পদে বৈধ ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৭৭৯টি।

দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে ৬০ পৌরসভার মধ্যে ৪২টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। আরও চার পৌরসভায় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এছাড়া বিএনপির ৪, জাতীয় পার্টির ১, জাসদের ১ ও ৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছেন। এ ধাপে ২০ লাখ ৯১ হাজার ৬৮১ ভোটের মধ্যে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৬ ভোট পড়েছে। সে হিসাবে ভোটের হার হচ্ছে ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ। এ ধাপের নির্বাচনে ব্যালটে সর্বোচ্চ ৮৫ দশমিক ০৪ শতাংশ ভোট পড়েছে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ পৌরসভায়। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে পড়েছে সর্বনিম্ন ৫৬ দশমিক ৪০ শতাংশ ভোট। আর ইভিএমে সর্বোচ্চ ৮৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে রাজশাহীর কাকনহাট পৌরসভায়। সর্বনিম্ন ৩৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ ভোট পড়েছে সাভার পৌরসভায়। দ্বিতীয় ধাপে ২৯টি পৌরসভায় ভোটগ্রহণ হয় ইভিএমে আর ৩১ পৌরসভায় ব্যালট পেপারে ভোট নেওয়া হয়।

গত শনিবার অনুষ্ঠিত তৃতীয় ধাপের পৌর নির্বাচনে ১৯ লাখ ৮ হাজার ৬১৫ ভোটারের মধ্যে মেয়র পদে ভোট দিয়েছেন ১৩ লাখ ৪৪ হাজার ১৬ জন। সে হিসাবে ভোটের হার ৭০.৪২ শতাংশ। সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে নওগাঁর ধামইরহাটে ৯২.১৪ শতাংশ। সর্বনিম্ন ভোট পড়েছে ৪১.৮৭ শতাংশ মৌলভীবাজারে। ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, তৃতীয় ধাপে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীসহ মেয়র পদে আওয়ামী লীগের ৪৬, বিএনপির ৩ ও স্বতন্ত্র ১৪ জন বিজয়ী হন।