দেশ ভাগের সময় ৫৫ হাজার ব্রিটিশ সৈন্য পাঞ্জাবে দাঙ্গা থামাতে পারেনি। অথচ মহাত্মা গান্ধী একা কলকাতাকে শান্ত রেখেছিলেন। তাই দেখে লর্ড মাউন্টব্যাটেন লিখেছিলেন ‘ডিয়ার গান্ধীজী, ইন বেঙ্গল আওয়ার ফোর্সেস কনসিস্ট অব ওয়ানম্যান। এত সৈন্য নিয়ে আমরা যা পারিনি, আপনি একাই তা করে দেখিয়েছেন। মে আই বি অ্যালাউড টু পে মাই ট্রিবিউট টু দ্য ওয়ানম্যান বাউন্ডারি ফোর্স।’
মাউন্টব্যাটেনের ওয়ানম্যান বাউন্ডারি ফোর্স কথাটা যদি বাংলাদেশ ক্রিকেটে কারও সম্পর্কে প্রয়োগ করতে হয় তিনি সাকিব আল হাসান। সব সময় মাঠে যিনি শৌর্যের প্রতীক। আভিজাত্যেরও।
অন্য যেকোনো দলে খেললেও সাকিব হয়ত ম্যাচ উইনারই হতেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলে তিনি তারচেয়েও বেশি কিছু। কখনো তিনি একাই গোটা একটা দল। পরিসংখ্যান দিয়ে কথাটা প্রমাণ করা যাক।
প্রমাণের জন্য ১৪টা টেস্ট বেছে নেওয়া হয়েছে, যেগুলোতে বাংলাদেশ জিতেছে। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর বাংলাদেশ প্রথম জয় পায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, ২০০৫ সালে চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে। সেই দলে সাকিবের থাকার প্রশ্ন নেই, কারণ তার আন্তর্জাতিক অভিষেক আরও এক বছর পর। টেস্ট অভিষেক সাকিবের ২০০৭ সালে চট্টগ্রামেই, নতুন গ্রাউন্ড জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে। শচিন-সৌরভের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ১৩ ওভার বল করে ২৯ রান দিয়ে উইকেটশূন্য ছিলেন তিনি। ২৭ রান করে বিক্রম সিংয়ের বলে আউট হন। দ্বিতীয় ইনিংসে বল-ব্যাটে কিছু করার সুযোগ পাননি। বৃষ্টির কারণে টেস্ট ড্র হয়েছিল। ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছিলেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা।
২০০৯ সালের জুলাইয়ে উইন্ডিজ সফর করে বাংলাদেশ। সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন মাশরাফী। সহ-অধিনায়ক করা হয় সাকিব আল হাসানকে। সেই সময় উইন্ডিজে ক্রিকেট বিদ্রোহ চলছে। ড্যারেন স্যামির নেতৃত্বে ৯ জন নতুন ক্রিকেটার নিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন ক্যারিবিয়ানরা। আর ৬.৩ ওভার বল করার পরই ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়েন মাশরাফী। নেতৃত্বভার নেন সাকিব। দুই ইনিংসে ব্যাট হাতে করেন ১৭ ও ৩০। বল হাতে নেন ৫ উইকেট। বাংলাদেশ ৪ উইকেটে জয় পায়। ম্যাচসেরা হন তামিম ইকবাল। পরের টেস্টে গ্রানাডাতে একাই হারিয়ে দেন স্বাগতিকদের। প্রথম ইনিংসে ৫৯ রানে ৩ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নেন ৭০ রানের বিনিময়ে। ব্যাট হাতে ১৬’র সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ৯৬ রানে ম্যাচ জিতিয়ে হন ম্যাচসেরা। টেস্টে ওটা ছিল তার দ্বিতীয় ম্যাচসেরার পুরস্কার। প্রথমবার ম্যাচসেরা হয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে। ২০০৮ সালে সেই টেস্টের প্রথম ইনিংসে ২৬ করার পর ৫ উইকেট নেন। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৬ করেন। উইকেট নিয়েছিলেন একটি। ক্যাচও নিয়েছিলেন একটি। সেই ম্যাচ বাংলাদেশ হারলেও সাকিব হন ম্যাচসেরা। বাংলাদেশের হেরে যাওয়া টেস্টে আরও দু’বার ম্যাচসেরা হয়েছেন সাকিব। ২০১০ সালে ৯ উইকেটে মিরপুর টেস্ট জিতেছিল ইংল্যান্ড। সেই টেস্টে ৪৯ ও ৯৬ রান করেন সাকিব। বল হাতে ৪ উইকেট নিয়ে হন ম্যাচসেরা। পরের বছর পাকিস্তানের বিপক্ষে হেরে যাওয়া ম্যাচে আবার ম্যাচসেরা সাকিব। প্রথম ইনিংসে ১৪৪ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলার পর ৮২ রানে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে আরও এক উইকেট নিয়ে হন ম্যাচসেরা।
৫৬ টেস্টে মোট ৬ বার ম্যাচসেরা হয়েছেন সাকিব। তিনটিতে দল হেরেছিল। তিনটিতে জিতেছিল। প্রথমবার সাকিব ম্যাচসেরা হয়েছিলেন গ্রানাডাতে। এরপর ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আবার ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠে তার হাতে। সেই টেস্টে ৫+৫=১০ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি প্রথম ইনিংসে ১৩৭ রান করেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ রান করে ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশের জয় তাতে আটকায়নি।
২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিরপুরের সেই বিখ্যাত জয়েও ম্যাচসেরা ছিলেন সাকিব। প্রথম ইনিংসে ৮৪ রান করার পর ৫ উইকেট নিয়েছিলেন। এরপর ৫ রান করেন। ডেভিড ওয়ার্নার যখন সেঞ্চুরি করে অস্ট্রেলিয়ার জয় প্রায় নিশ্চিত করে ফেলছিলেন তখন আবার ম্যাজিকম্যানের ভূমিকায় নামেন সাকিব। দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৫ রানের বিনিময়ে নেন ৫ উইকেট। স্টিভেন স্মিথও সেদিন তার শিকার হয়েছিলেন। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা টেস্ট জয়েও ম্যাচসেরা হন সাকিব।
১১৯ টেস্টে বাংলাদেশের জয় ১৪টিতে। তিনটিতে সাকিব খেলেননি। বাকি ১১টিতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এ রকমই একটা ম্যাচ হয়েছিল ২০১৭ সালের মার্চে মিরপুরে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই টেস্টে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। ১১৬ ও ১৫ রান করেন সাকিব। দুই ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন। কিন্তু মেহেদী হাসান মিরাজ ৬+৬=১২ উইকেট নিয়ে সব আলো কেড়ে নেন। ম্যাচসেরাও হন।
সাকিবের ক্যারিয়ারসেরা বোলিং (৭/৩৬, চট্টগ্রাম) এবং ক্যারিয়ারসেরা ব্যাটিং (২১৭, ওয়েলিংটন), দুটিই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। আক্ষেপ এই দুটি ব্যক্তিগত সাফল্য ম্যাচসেরায় রূপ পায়নি।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ টেস্ট জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। এক বছরের নিষেধাজ্ঞার কারণে সাকিব তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে। সেই অন্ধকার সময় পেছনে ফেলে আজ চট্টগ্রামে আবার টেস্ট খেলতে নামছেন সাকিব। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ১৬ টেস্ট খেলে ৭৯৭ রান করার পাশাপাশি ৬০ উইকেট নিয়েছেন সাকিব। আগের মতোই দলে তিনি ‘ওয়ানম্যান বাউন্ডারি ফোর্স’ কি-না এখন তার উত্তর পাওয়ার অপেক্ষা!