রাখিবন্ধন

২৯ জানুয়ারি গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। পরদিন ভোরে হাঁটতে বেড়ানোর সময় রাস্তার পাশের দোকান খুলতে শুরু করেছে। এক দোকানের সামনে চোখ পড়লে দেখি বেঞ্চে বসা আছে আমার বোন। পাশের গ্রামে বাস করা বোনের সামনে ভারী চটের ব্যাগ পড়ে আছে। বিস্মিত হয়ে বলি, ‘এই সাত সকালে ভারী ব্যাগ নিয়ে এত দূরের পথ পায়ে হেঁটে কেমন করে এলি? বোন বলল, ‘তুমি বাড়ি এসেছ শুনে সন্ধ্যাতেই আসতে চেয়েছিলাম।  তোমার ভাগিনারা আসতে দেয়নি। সকালে এসে বাজারঘাটে ট্রলার না পাওয়ার কারণে খেয়া পার হয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম।’

বোন বয়সে বড় হলেও শৈশব থেকে তাকে তুই-তোকারি সম্বোধন করি।  ভাই গণ্যমান্যি হওয়া শুরু করতেই বোন ‘তুই’ সম্বোধন করতে সংকোচ বোধ করেন। কোনো এক সময় ‘তুই’ থেকে ‘তুমি’ সম্বোধন শুরু হয়ে যায়।  বোনের ব্যাগটি বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করে তাকে নিয়ে যাই নাস্তার দোকানে। একপ্রকার জোর করেই নাস্তা করাই। বাড়ি এসে চটের ব্যাগ খুলে দেখি ৫ কেজির মতো আওলা চাল, কেজি খানেক মুড়ি ও কয়েক রকমের শাক। আমি বললাম, ‘উত্তরের ঠাণ্ডা বাতাস, শৈত্যপ্রবাহের কনকনে শীত, কষ্ট করে এত কিছু নিয়ে আসার কী দরকার ছিল?’ ‘দরকার ছিল।  শীতকাল যায় যায়। পৌষের পিঠাপুলি ভাইকে না খাইয়ে বোন খায় কী করে! তোমার ভাগিনার ক্ষেতের মটর শাক, মটরক্ষেতে লকলকে লাড়াবাড়া (পাঁচমিশালি) শাক। এসব শাক কি কিনতে পাওয়া যায়? খড়ির আগুন, মাটির চুলা, হাতে ভাজা আমন ধানের মুড়ি তোমার খুব পছন্দ, তাই নিয়ে এলাম।’ উত্তর বোনের।

সকাল ১০টার দিকে আমরা ট্রলারঘাটে গেলাম। ট্রলার না ছাড়া পর্যন্ত বোনও দাঁড়িয়ে ছিল নদীর ঘাটে। নারায়ণগঞ্জের বাসায় প্রবেশ করি দুপুর ১২টার দিকে। তিনটার মধ্যে উপস্থিত থাকতে হবে মহাখালীর অফিসে।  তাড়াতাড়ি গোসল করে লাঞ্চ করতে বসে দেখি গরম ভাতের সঙ্গে মটর শাক, রুই মাছের ঝাল ফ্রাই, টমেটোর টকডাল। মটর শাকের ঘ্রাণ পেয়েছিলাম রান্না (ভাজা) কালেই। গরম ভাতে গরম মটর শাক। শুধু ঘ্রাণই নয় মটর শাক স্বাদেও অসাধারণ। মন গেল না সামনের রুই ও টকডালে।  শাক দিয়েই শেষ করি ভোজনপর্ব। ঢাকা যাওয়ার পথে মুখের মাস্ক ঠিক করতে গিয়ে ডান হাত চলে যায় নাকের কাছে। নাকের ভেতর দিয়ে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে মটর শাকের ফ্লেভার। জিহ্বায় তখনো যেন লেগে রয়েছে শাকের স্বাদ। বছর তিনেক আগে গাঁ থেকে এই বোনই পাঠিয়েছিল মটর ও কলাই শাক। আমার কাছে গাঁয়ের খাঁটি মটর শাকের স্বাদ ও ঘ্রাণের কাছে ফখরুদ্দীনের কাচ্চি ও হাজির পোলাও তুচ্ছ। 

গ্রাম থেকে পাঠানো মটর শাকের স্বাদ ও ঘ্রাণে মুগ্ধ হয়ে রাস্তায় ফেরিওয়ালার ভ্যানগাড়ি দেখলেই মটর শাক খুঁজতাম। কিনেও নিয়েছিলাম কয়েকবার। রান্না করেন একই তাপ ও তেল-মসলা দিয়ে। কিন্তু হায়! স্বাদ-ঘ্রাণ একটুও গাঁয়ের শাকের মতো নয়। বুঝতে পারি, বিক্রির জন্য উৎপাদিত ফরমালিনযুক্ত শাক আর গাঁয়ের কৃষকের জমিতে উৎপাদিত শাকের স্বাদ ও ঘ্রাণ এক নয়। মনে মনে ঠিক করি, বাসায় ফিরে শাকের জন্য বোনকে একটা ধন্যবাদ দেব। ধন্যবাদ দিয়ে আরও শাক পাঠিয়ে দিতে বলব। সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাসায় ঢুকে পোশাক-পরিচ্ছদ পরিবর্তন করে বসার সঙ্গেই পলিথিনের ব্যাগভর্তি শাক নিয়ে হাজির হয় আমার শিক্ষানবিশ আইনজীবী।  খুলে দেখি, মটর ও কলাই শাক। অর্থাৎ, ‘মেঘ না চাইতেই জল’। আমার ফোন দেওয়ার আগেই কাক্সিক্ষত শাক পৌঁছিয়ে দিয়েছে বোন। আমার অস্বাভাবিক শাকপ্রীতির কথা বোন জানতে পারাতেই এই আয়োজন।  জানার সঙ্গেই শাক পাঠানোর জন্য লোক খুঁজতে শুরু করে। খুঁজে পায় শিক্ষানবিশ সাইফুলকে। আর পায় কে! মেয়ে-নাতি নিয়ে শুরু করে শাক তোলা।

ভাই-বোনের অচ্ছেদ্য সম্পর্ক ভূমিষ্ঠের আগে একই ঔরস ও অভিন্ন নাড়ির সম্পর্ক থেকেই। নাড়ির টান আরও দৃঢ় করার জন্য সনাতন ধর্মে রয়েছে রাখিবন্ধন। রাখি অর্থ রক্ষা করা। রাখিবন্ধনের আভিধানিক অর্থ, রক্ষাকবজ।  ভাইকে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার কামনায় বোন ভাইয়ের ডান হাতের মণিবন্ধে পবিত্র সুতা দিয়ে ভালোবাসা ও স্নেহের বন্ধনে বেঁধে রাখেন।  হিন্দু পুরাণে কথিত আছে, ‘শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমায় হতদরিদ্র নারীর বেশে বালির কাছে আশ্রয় চান লক্ষ্মী। বালি নিজের প্রাসাদের দরজা খুলে দেন তার জন্য। খুশি হয়ে লক্ষ্মী, বালিকে ভাই হিসেবে মেনে রাখি পরিয়েছিলেন যাতে সে উপহার স্বরূপ বিষ্ণুকে স্বর্গে তার কাছে ফিরে যেতে বলে।’ সেই ধারাবাহিকতায় রাখি সামাজিক উৎসবে রূপান্তরিত হয়। শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব উদযাপিত হয়। এই উৎসব ভাই ও বোনের মধ্যে প্রীতিবন্ধনের উৎসব। বৈষম্যের বৃত্তে নারীকে শৃঙ্খলিত করার লক্ষ্যেই হিন্দু সমাজে রাখিবন্ধনের গুরুত্ব বেড়েছে। হিন্দু আইনে নারীকে ন্যূনতম সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হয়নি। বাবা বা স্বামীর সম্পত্তিতে মেয়েদের কোনো অধিকার নেই। মেয়েকে বিয়ের সময় যে উপহার (স্ত্রীধন) দেওয়া হয় সেটিই মেয়ের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়। বিয়ের পরপর পিত্রালয়ের সঙ্গে মেয়েদের সম্পর্কের সব সূত্র প্রায় ছিন্ন হয়ে যায়। সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া থেকে রক্ষার জন্য উদ্ভব হয় পবিত্র সুতার মাধ্যমে রাখিবন্ধনের প্রচলন। রাখি ভাইয়ের প্রতি বোনের মঙ্গল কামনা ও বোনের প্রতি ভাইয়ের বন্ধন রক্ষার শপথের প্রতীক। শ্রুত আছে, ‘চিতোরের বিধবা রানী কর্ণবতী মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সাহায্য প্রার্থনা করে একটি রাখি পাঠিয়েছিলেন। এর পর থেকে এই উৎসবের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।’ এক সময় দুই বঙ্গকে ভাইবোন গণ্য করার মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গ রদের লক্ষ্যে পথে নেমেছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব স্তরের মানুষ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করতে রাখিকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

ইসলামে পরিবার থেকে মেয়েদের সম্পর্ক ছিন্নের সুযোগ নেই, তাই রাখিবন্ধনের খুব একটা প্রয়োজনও নেই। পবিত্র কোরআনুল কারিমে সুরাতুন-নেসায় মেয়েদের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তারপরেও হাজার হাজার বছর ধরে ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থানের ফলে সামাজিক রীতিনীতি ও সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটে। সনাতনী বিয়ের উপহার (স্ত্রীধন) রীতি মুসলিম বিয়েতে যৌতুক (স্বামীধন) নামে অনুপ্রবেশ শুরু করে। মুসলিম সমাজে উপঢৌকন বা যৌতুক প্রথা বাধ্যবাধকতাসহ মহামারী আকার ধারণ করলে, ‘যৌতুক নিরোধ আইন উড়ৎিু চৎড়যরনরঃরড়হ অপঃ, ১৯৮০’ করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। স্বামীধনের কুয়াশাসহ ‘লোভ’ নামক ভয়ংকর রিপুর বশে কোরআনের নির্ধারিত বোনের অংশই অনেক ভাইয়ের কাছে কাল হয়ে পড়েছে। বিষাক্ত ফরমালিন যে কারণে খাদ্যের প্রকৃত স্বাদ ও ঘ্রাণকে ধ্বংস করে সে কারণে সম্পত্তির লোভও ভাইবোনের প্রকৃত বন্ধন ও সম্পর্ককে ধ্বংস করতে শুরু করে।

আমার ডায়েরিতে যে কয়টা দেওয়ানি মামলা আছে এর অধিকাংশই সম্পত্তির ভাগ-বণ্টন সংক্রান্ত। ভাই বোনদের না জানিয়ে লিখে নিয়েছে বাবার সম্পত্তি কিংবা বোন ভাইয়ের অজান্তে লিখে নিচ্ছে মায়ের অংশ।  শক্তি ও বুদ্ধির জোরে ভাই ঠকাচ্ছে বোনকে। ঠক ও বঞ্চনার কারণেই মামলা-মোকদ্দমাসহ ভাইবোনের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিরোধ দেওয়ানি দায় থেকে গড়াচ্ছে ফৌজদারি অপরাধের দিকে, হচ্ছে খুনখারাবিও। বণ্টনসহ মোকদ্দমা অবসানের আগেই অবসান হয় কারও কারও জীবন। পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পদ ফরমালিনের মতোই সম্পর্ক রক্ষার পরিবর্তে সম্পর্ক বিনষ্ট করছে। তাই আমাদের সবার আওড়ানো দরকার : ভাইবোনের রাখিবন্ধন ছিল অমলিন/সম্পত্তি ফরমালিনরূপে করে বিমলিন।

লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক

adv.zainulabedin@gmail.com