তামিম-মুশফিকদের টিপসেই সেঞ্চুরি মিরাজের

প্যাডল সুইপে বল স্কোয়ার লেগে পাঠিয়ে সিঙ্গেলের জন্য দৌড় দিতেই সেঞ্চুরির উদযাপন শুরু করেন মিরাজ মুষ্টিবদ্ধ হাত শূন্যে ঘুসি মেরে। অপর প্রান্তে পৌঁছে উদযাপনটা আরও ভালো করে করবেন তা হলো না। সঙ্গীর ডাকে দ্বিতীয় রানের জন্য ছুটতে হলো আবার। তাতে ভালোই হয়েছে। ফিরতি রান নিয়ে ফিরে এসেছিলেন ড্রেসিংরুমের দিকে। শূন্য গ্যালারিতে দর্শকের দিকে ব্যাট তুলে অভিনন্দনের জবাব তো দিতে পারবেন না, তাই সতীর্থ ও দলের বাকিরাই ভরসা। সেদিকে ফিরে যাওয়ায় এবার ভালোভাবেই উদযাপন করলেন। এরপর মাঝ উইকেটে এসে সেজদায় সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার তো বটেই, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এই প্রথম সেঞ্চুরির স্বাদ পেলেন মিরাজ (১০৩)। তার উদযাপন তো দীর্ঘ হবেই।

দলের প্রয়োজনের সময়ই সেঞ্চুরি করলেন এই অলরাউন্ডার। মিরাজের ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়ে এমনিতে কোনো সন্দেহ কখনই ছিল না। সেই ২০১৩ সালে মিরপুরে চার দিনের যুব টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১০৫ করেছিলেন প্রথম ইনিংসেই। এরপর আরও তিনটি যুব টেস্ট ও ৫৬টি যুব ওয়ানডে খেলেছেন। কিন্তু সেঞ্চুরি করতে পারেননি। এরপর এলেন বড় পর্যায়ে। ফার্স্ট ক্লাস খেললেন ৪০ ম্যাচ। এখানেই সেঞ্চুরির সবচেয়ে বড় জায়গা। কিন্তু মিরাজ পেলেন না। লিস্ট এ (এক দিনের) ম্যাচ খেলেন ৯৩টি আর ৭৫টি টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি নেই। এরপর ২০১৬ থেকে ২২ টেস্ট, ৪৪ ওয়ানডে এবং ১৩ টি-টোয়েন্টিতেও শতরান অধরা তার। প্রায় ৯ বছর পর আবার সেঞ্চুরির স্বাদ। 

অফস্পিনারের পাশাপাশি জাত ব্যাটসম্যান তিনি। যুব দলে থাকতে তার ব্যাটিং পজিশন ছিল টপঅর্ডারে। ২০১৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দেওয়া মিরাজ মাত্র ৫ ইনিংসে ব্যাট করে করেছিলেন ২৪২ রান। কিন্তু জাতীয় দলে তার পজিশন ৮ নম্বরে। এই পজিশনে নেমে বরাবরই কিছু রান করে যান তিনি। তবে গতকাল ছাড়িয়ে গেলেন নিজেকেই। এই সেঞ্চুরি দিয়ে সামনে জাত অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, ‘আমার নিজের জন্য অনেক বড় একটা পাওয়া। আমি নিজে খুব একটা আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না। কিন্তু এখন আমার মধ্যে বিশ্বাস জন্মেছে যে যদি আমি ব্যাটিং নিয়ে আরও পরিশ্রম করি, কাজ করি, তাহলে অবশ্যই ভালো অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব। আমার কথা হলো যেহেতু আমার সুযোগ আছে তাহলে কেন আমি সেই সুযোগ কাজে লাগাব না।’

গত কয়েক দিন ধরে ব্যাটিং নিয়ে খুব কাজ করেছেন মিরাজ। তামিম-মুশফিকের কাছ থেকে টিপস নিয়েছেন। গতকাল উইকেটে যাওয়ার পর সাকিবের টিপস নিয়েছেন। এই টিপসগুলো সেঞ্চুরি পেতে সাহায্য করেছে তাকে, ‘তামিম ভাই আমাকে টিপস দিয়েছিলেন। আবার মুশফিক ভাই নিজে আমাকে নিয়ে ব্যাটিং অনুশীলনে আসতেন। তখন বিভিন্নভাবে তারা আমাকে ব্যাটিংয়ের বিভিন্ন দিক উন্নতিতে টিপস দিয়েছেন। তামিম ভাই বলেছিলেন জোরে শরীরের দিকে আসা বল সোজা ব্যাটে খেলতে। আজ আমি সেই কাজগুলো করেছি গ্যাব্রিয়েল-রোচের বিপক্ষে। আর উইকেটে আসার সময় সাকিব ভাই বলেছেন আত্মবিশ্বাসী শট খেলতে। বাড়তি শট যেন না নেই। এ রকমভাবে সিনিয়ররা যখন টিপস দেন তখন আমাদের মতো জুনিয়রদের ভালো খেলা সহজ হয়ে যায়।’

২০১৩-র যুব সেই টেস্টে খেলেছিলেন মোস্তাফিজ। গতকাল নার্ভাস নাইটনটিজের সময় সঙ্গীও তিনি। উইকেটে এসে মিরাজের সেঞ্চুরির জন্য উদ্বেগের কথা বলেন মোস্তাফিজ। উল্টো ফিজকে অভয় দিয়ে মিরাজ বলেন ‘দোস্ত, এটা আমার বা তোর টেনশনের বিষয় না। আমার কপালে আল্লাহ যদি সেঞ্চুরি রাখে সেটা হবে। চিন্তা না করে তুই তোর স্বাভাবিক খেলা খেল, আমি আমার স্বাভাবিক খেলা খেলি।’ সেই স্বাভাবিক খেলা দিয়েই সেঞ্চুরি পেয়েছেন। এবার কি নিজেকে ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবে দেখতে চান মিরাজ? তার চিন্তা অবশ্য ভিন্ন ‘দেখেন, আমি ওভাবে ভাবছি না, কারণ যদি ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবে খেলি তাহলে দলে থাকতে পারব না। অফস্পিন অলরাউন্ডার হিসেবে দলে সুযোগ পাব। বোলিংটা আমার অস্ত্র আর ব্যাটিং আমাকে ভালো হতে সাহায্য করে।’

বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে ৮ নম্বরে নেমে মিরাজের আগে মাত্র তিন ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করেছিলেন। ২০০৪ সালে এই পজিশনে শতরান করেছিলেন খালেদ মাসুদ, ২০১০ সালে মাহমুদউল্লাহ ও ২০১৩ সালে সোহাগ গাজী। ২০১৭ সালে ভারতের বিপক্ষে হায়দরাবাদে প্রথম হাফসেঞ্চুরি পাওয়া মিরাজ গত ১২ ইনিংসে রান পাচ্ছিলেন না, সর্বোচ্চ ছিল ৩৮। ওয়ানডেতে ভালো করে দলে নিজের জায়গা যেমন পাকা করলেন টেস্টেও সেঞ্চুরিতে নিজের ব্যাটিং-সত্তা মেলে ধরলেন।