মোট ২১ জনকে এ বছর মর্যাদাপূর্ণ একুশে পদক দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে বিনোদন জগতের ছয়জন পাচ্ছেন এই রাষ্ট্রীয় পদক। এ বছর সংগীতে একুশে পদক পাচ্ছেন পাপিয়া সারোয়ার, অভিনয়ে রাইসুল ইসলাম আসাদ ও সুজাতা আজিম, নাটকে আহমেদ ইকবাল হায়দার, চলচ্চিত্রে সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী ও আবৃত্তিতে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে তাদের কথা শুনেছেন মাসিদ রণ
অভিনয়জীবনের ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে
সুজাতা আজিম অভিনেত্রী, প্রযোজক ও নির্দেশক
একুশে পদকপ্রাপ্তির অনুভূতি কেমন সেটা আসলে জিজ্ঞেস করার দরকার হয় না। নিঃসন্দেহে যে কারও জন্য এটা গৌরবের, সম্মানের ও আনন্দের। জীবনের অধিকাংশ সময় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাটিয়ে দিয়েছি। সেই
কৃতকর্মের স্বীকৃতি দিচ্ছে রাষ্ট্রএটা জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। আমি ভাগ্যবান যে, জীবদ্দশায় এ ধরনের বড় পুরস্কারের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারছি। গত বছর রাষ্ট্র আমাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা দিয়েছে। এই দুই পুরস্কার আমার অভিনয় জীবনের ষোলকলা পূর্ণ করে দিচ্ছে। তবে একুশে পদকের তালিকায় আমার নাম দেখার পর সবচেয়ে প্রথমে মনে পড়েছে বায়ান্নর ভাষাশহীদদের কথা। তারা যদি সেদিন জীবনবাজি না ধরতেন, তাহলে আজ আমরা এই পুরস্কার তো দূরের কথা, বাংলায় কথা পর্যন্ত বলতে পারতাম না। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনই পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহস ও শক্তি জুগিয়েছিল আমাদের। সুতরাং বাঙালি হিসেবে এই পুরস্কারের চেয়ে বড়কিছু আর হতে পারে না।
পুরস্কার সবসময়ই ভালো লাগার
রাইসুল ইসলাম আসাদ নাট্যব্যক্তিত্ব
পুরস্কার সবসময়ই ভালো লাগার বিষয়। এর বাইরেও ভালো লাগার একটি কারণ আছে। দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। এরপর অভিনয় নিয়ে কাজ করে চলেছি। এমন একটা সময় রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেলাম, যখন মুক্তিযুদ্ধের শক্তির সরকার দেশ পরিচালনা করছে। আর চলতি বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের উদযাপনও চলছে। এটাও খুব সুন্দর একটি দিক।
একমুঠো আনন্দের বার্তা
পাপিয়া সারোয়ার রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও শিক্ষক
যেকোনো পুরস্কারই আমাদের কাজের স্বীকৃতি। তবে সেই পুরস্কার যখন হয় যে রাষ্ট্রের মানুষের জন্য এতদিনের পরিশ্রম, চর্চা ও সাধনা সেই রাষ্ট্রের পক্ষে, সেটার মাধুর্য আলাদা। এমন একসময় এই পুরস্কার পেয়েছি যখন আমার পুরো পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। কদিন আগেই আমার বোনের জামাই করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। সেই শোকের মধ্যে এই পুরস্কারের আনন্দ একমুঠো আনন্দের বার্তা। এটা সত্যি যে, এর আগেও কয়েকবার একুশে পদক পাব বলে শুনেও পাইনি। সেজন্য কিছুটা কষ্ট তো ছিলই। তারপরও এবার পেয়েছি, জীবদ্দশায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য আমাকে যোগ্য মনে করা হয়েছে, সেটিও কম কিছু না। আমি এই পুরস্কার উৎসর্গ করছি দেশের সকল মানুষের উদ্দেশে, যারা আজকের পাপিয়া সারোয়ার হিসেবে আমাকে তৈরি করেছেন। দর্শক-শ্রোতার সমর্থন ছাড়া কিছুই করতে পারতাম না। এছাড়া আমার বাবা-মা, পরিবার, গানের শিক্ষক ও সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। তারা সহযোগিতা না করলে হয়ত জীবন অন্য প্রবাহে প্রবাহিত হতো। এ বছর আমার গীতসুধা রবীন্দ্রসংগীত অনুশীলন কেন্দ্র ২৫-এ পা দিয়েছে। করোনার মধ্যেও অনলাইনে নিয়মিত গান শেখানোর কাজ করে যাচ্ছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থেকেও যেন রবীন্দ্রনাথের গানের ভালো শিল্পী তৈরি হয়- যারা রবীন্দ্রসংগীতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিগুলো মনে পড়ছে
সালাহউদ্দিন জাকী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
যেকোনো প্রাপ্তিই আনন্দের। তবে এবার একটু ভিন্নমাত্রা পেয়ছে একুশে পদকপ্রাপ্তিতে। সবার মন খারাপ, করোনায় কত কাছের মানুষকে হারিয়েছি। এখন যে বয়স তাতে আমরা তো স্মৃতিতেই বাস করি। এই পুরস্কার সেই স্মৃতিকে আরও তাজা করে দিল। মনে পড়ছে আমার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক গাজীউল হকের কথা। আমি সৌভাগ্যবান যে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সম্মুখসারির এই যোদ্ধাকে আমি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। সে সময় আমাদের পল্টনের বাড়িতে তিনিসহ আরও কয়েকজন ভাষাসৈনিক কয়েক রাত আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমি রাষ্ট্র কথাটা তখন ভালো করে উচ্চারণ করতে পারতাম না। বাংলা চাই, বলেই স্লোগান দিতাম। গাজীউল স্যারই একুশের প্রথম গান ‘ভুলব না একুশে ফেব্রুয়ারি’র কথা ও সুর করেছিলেন। সেই একুশে পদক পাওয়ায় বিষয়গুলো রিলেট করতে পারছি খুব ভালো করে।
পুরস্কারের জন্য কাজ করিনি
ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় আবৃত্তিশিল্পী ও প্রশিক্ষক
একুশে পদকের মতো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া অবশ্যই ভালো লাগার। কিন্তু পুরস্কারের জন্য তো কাজ করিনি। আবৃত্তি করতে ও তা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে ভালো লাগত বলেই এত বছর ধরে কাজটি করছি। যখন ভালোবাসার কাজের স্বীকৃতি পাওয়া যায় সরকারের কাছ থেকে, সেটা বড় প্রাপ্তি বলেই মনে হয়। আরও ভালো লাগছে এই বিষয়টি ভেবে যে, আবৃত্তিশিল্পে আমাকেই প্রথম একুশে পদকের জন্য যোগ্য মনে করা হয়েছে। এর ফলে যারা এখন আবৃত্তিশিল্পের সঙ্গে জড়িত, তারা একধরনের অনুপ্রেরণা পাবে। তারা ভাববে, এই কাজটিও সততার সঙ্গে করলে একটা ভালো অবস্থানে পৌঁছানো যায়। এই পুরস্কার আমি উৎসর্গ করছি বাবা-মা, স্ত্রী-কন্যা ও ভাই-বোনদের। যারা সব সময় আমার কাজকে সমর্থন করেছেন। তাদের প্রশ্রয় আমাকে সকাল থেকে রাত অবধি দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে ক্লাস, কর্মশালা করানোর শক্তি জুগিয়েছে। এত মানুষকে শেখাতে পেরেছি। তারা এখন শুধু দেশে নয়, বিশে^র এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমার ছাত্র নেই। তারা সেখানেও আবৃত্তিশিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছে।