দেশে দেশে পিকনিকের হরেক রীতি

পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব মিলে বাইরে গিয়ে খেতে পছন্দ করেন সকলেই। পিকনিক বলে প্রচলিত এই রীতি অনেক পুরনো। পিকনিক জনপ্রিয় এবং সময় কাটানোর ভালো অনুষঙ্গও বটে। কোন দেশে কেমন পিকনিক প্রচলিত তা নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

হংকং

হংকংবাসীরা সাধারণত পিকনিকের আয়োজন করে সমুদ্রপাড়ে বসে। দলবেঁধে সবাই মিলে স্থানীয় বিচে চলে আসে দিনের শুরুতেই। পিকনিক করার জন্য জায়গা বাছাই করতে এতে কিছুটা সুবিধা হয়। জায়গা বাছাই শেষে একদল মিলে স্থানীয় বাজারে চলে যায় চারকোল, গ্রিল করার কাঁটা চামচ, প্লেটসহ অন্যান্য দরকারি জিনিস কিনে আনতে। সমুদ্রপাড়ের কিছু দোকানে আবার বারবিকিউ করার বিভিন্ন খাবার যেমন-ফিশ বল, চিকেন উইংস, ভুট্টা, স্কুইড (সামুদ্রিক মাছ), ছোট নানা জাতের মাছ, মাশরুম ইত্যাদি মেলে। দোকান থেকে ফিরে সবাই মিলে কাজ শুরু করে।

গ্রিল করে, খাওয়া-দাওয়া শেষে সমুদ্রে সাঁতার কাটা, পছন্দসই খেলাধুলাও চলে। খাওয়া শেষে দলবেঁধে ঘুরতে যাওয়ার রীতিও আছে হংকংয়ে। এতে খাবারটাও দ্রুত হজম হয়ে যায়। ঘুরে আবার একই জায়গায় ফিরে এসে দ্বিতীয় দফা খাওয়ায়র প্রস্তুতিও নেয় অনেকে। তাদের ক্ষেত্রে পিকনিক মানে শুধু এক বেলা রান্না হবে এমন নয়। বেঁচে যাওয়া খাবার অথবা ক্ষুধার ওপর ভিত্তি করে ২/৩ বার বারবিকিউ করে পিকনিক করতে হংকংবাসী বেশ ভালো বাসে।

জাপান

জাপানে বসন্তের শুরু মানে প্রকৃতিতে চেরি ব্লসমের মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাওয়া। আর চেরি ব্লসম মানে জাপানে ‘হানামি’র (চেরি ব্লসমের দৃশ্যের সঙ্গে পিকনিক) শুরু। ফুল আর পিকনিক দুটোকেই জাপানিরা ভীষণ ভালোবাসে। সাকুরায় (চেরি ব্লসমের গাছ) যখন সাদা আর হালকা গোলাপি রং মেশানো ফুল ফোটে, তখন জাপানিরা ঘর ছেড়ে চলে আসে এই দৃশ্য দেখার জন্য। জাপানে ফুল দেখার এই ঐতিহ্য বেশ জনপ্রিয়। এই দৃশ্য ভালো লাগার কারণ হচ্ছে চেরি ব্লসম খুব বেশিদিন থাকে না। তাই দলে দলে মানুষ এসে বিভিন্ন পার্কে জড়ো হয় পিকনিক করে সময় কাটানোর জন্য।

বন্ধু-বান্ধব অথবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে জাপানিরা হাতে বানানো বিভিন্ন খাবার, স্ন্যাকস নিয়ে আসে। যদি কেউ খাবার না নিয়ে আসে, তবে পার্কের পাশেই ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে পছন্দমতো খাবার কিনে নেওয়া যায়।

ব্রিটেন

পিকনিকের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক মধ্যযুগ থেকে। অর্থাৎ যখন থেকে রাজপরিবারের সদস্যরা শিকার করার জন্য বাড়ির বাইরে যেতেন আর সঙ্গে করে নিতেন বিভিন্ন ধরনের খাবার তখন থেকেই এর প্রচলন। তবে এটিকে সেভাবে কেউ পিকনিকের সঙ্গে মেলাতেন না যদি না ১৮ শতকের শেষ দিকে ব্রিটেনের আইকনিক খাবার ‘স্কচ এগ’ তাতে যুক্ত হতো। ফোর্টনাম অ্যান্ড ম্যাসন নামের ডিপার্টমেন্ট স্টোর যখন থেকে ফ্রাই করা সসেজের ভেতর সেদ্ধ ডিম পুরে দিয়ে স্কচ এগ বানানো শুরু করে তখন থেকে এই খাবার ধনী ভ্রমণকারীদের তালিকায় বিলাসবহুল লাঞ্চ হিসেবে যুক্ত হয়ে যায়। কারণ একদম ঝামেলাবিহীনভাবে এই খাবার খাওয়া যেত রাস্তায়। এই খাবার প্রচলিত হওয়ার পর থেকে বক্স ভরে খাবার নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে পিকনিক করার রীতি বেশ বেড়ে যায়। প্রতি বছরের জুন মাসকে ব্রিটেনের ‘ন্যাশনাল পিকনিক উইক’ বলা হয়। ব্রিটেনবাসী বেশ আগ্রহের সঙ্গে পরিবার অথবা বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে এই পিকনিকের আয়োজন করে। আর অবশ্যই স্কচ এগ পিকনিকের খাবার তালিকায় সবার শুরুতে থাকে।

অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ায় কীভাবে পিকনিকের জন্য ছুটির দিন নির্ধারিত হলো তা নিয়ে বেশ কয়েকটি গল্প প্রচলিত আছে। সেগুলো থেকেই জানা যায়, সম্ভবত পিকনিকের প্রচলন ১৯১০ বা ১৯৪০-এর কোনো এক শতকে। অস্ট্রেলিয়ার উত্তর দিকের রাজ্যগুলো সে সময় থেকেই প্রতি বছরের আগস্ট মাসের প্রথম সোমবার পালন করে আসছে রেলওয়ে হেরিটেজ পিকনিক ডে। পাবলিক হলিডে হিসেবে পরিচিত এই দিনে রেলওয়ের কর্মীরা আনন্দঘন সময়ে ছুটি পালন করেন। অবসর সময় কাটানো, খাবার খাওয়া, টাগ-অফ-ওয়ার (দুই দলের মধ্যে দড়ি টানাটানি), বস্তা দৌড়সহ নানা ধরনের খেলাধুলা করে সময় কাটান কর্মীরা। অনেকে যোগ দেন ৭০ বছর ধরে চলে আসা ‘হার্টস রেঞ্জ রেস’ নামে ঘোড়দৌড়ে। ইস্কিতে (খাবার রাখার কুলার) ভরে নানা ধরনের খাবার ও পানীয় নিয়ে আসা হয় পিকনিক স্পটে। ডেজার্টে থাকে ট্রে ভর্তি চকলেট, ক্যারামেল স্লাইস, কুকিজ।

তুরস্ক

অটোম্যান রাজত্বের সময় থেকেই তুরস্কে পিকনিক করে সময় কাটানো বেশ পুরনো একটি রীতি। বলা হয়, সে সময় যে কোনো জনবহুল সবুজ এলাকাতেই পিকনিক করা হতো। অবশ্য এখনো দেশটিতে পিকনিক করার জন্য জায়গা খুঁজে পাওয়া খুব সহজ। কারণ তুরস্কে পিকনিক করার জন্য আলাদা মাঠই রয়েছে। তাদের পিকনিক মানে শুধু খাওয়া-দাওয়া নয়, সারা দিনের বেশ বড় পরিকল্পনা নিয়েই তারা মাঠে আসে। সঙ্গে আনে কুশন, কম্বল বা চাদর। মাঠে বিছিয়ে দিয়ে তাতে বসে খাওয়া-দাওয়া, গল্পগুজব সবই হয়। শুধু তাই নয়, হালকা ফার্নিচারও আনা হয় যেন আরাম করে বসা যায়। খাবারের মধ্যে পাউরুটি, সালাদ, মিটবলসহ নানা ধরনের খাবার আনা হয়। খেলাধুলা তো চলতেই থাকে, সঙ্গে থাকে চা পানের ব্যবস্থা। সন্ধ্যা হয়ে না আসা পর্যন্ত এভাবেই কাটে পুরো দিন। রাত হয়ে গেলেও অনেকেই সময় কাটান, তাই সঙ্গে করে আনেন বিভিন্ন ধরনের লাইট। অনেক পরিবার সঙ্গে করে আনে গ্রিল করার জিনিস। মাঠেই তৈরি করা হয় ধোঁয়া ওঠা কাবাব। ‘কুরু কোফতে’ নামে মিটবল পিকনিকের অন্যতম খাবার হিসেবে নেওয়া হয় কারণ ভ্রমণে ঠাণ্ডা অবস্থাতেও এই খাবার বেশ সহজেই খাওয়া যায়। সন্ধ্যা বা রাত হলেই তুরস্কের পিকনিক আয়োজন শেষ হয়ে যায় তা কিন্তু মোটেও নয়। বরং সারা দিনের পর রাতে তারা নতুন উদ্যমে নাচ ও গানের আয়োজন করে। প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত সবাইকে নিয়ে সময় কাটে এই পিকনিকে।

নিউজিল্যান্ড

নিউজিল্যান্ডবাসী দল বেঁধে বাইরে খেতে ভালোবাসে প্রাচীন কাল থেকে। তাদের পিকনিকের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার স্যান্ডউইচ আর পাই। ১৯ শতকের দিকে, এ স্ন্যাকসের বদলে পিকনিকে জায়গা করে নেয় ষাঁড়ের মাংস বারবিকিউ করা। সঙ্গে থাকে গর্তের ভেতর আগুন দিয়ে আলু পোড়া। দুই মিলিয়ে পিকনিকের আয়োজন বেশ জমে ওঠে। বিকালের চা এই জাতির জন্য অত্যাবশ্যক পানীয়, আর অবশ্যই সেটি পিকনিকেও। চায়ের জন্য তাদের আলাদা ব্যবস্থা করা থাকে। ‘বিল্লি’ নামে ধাতু দিয়ে বানানো ও তারযুক্ত একটি পাত্রে চা রাখা হয় যেন সহজে গরম করে নেওয়া যায়। চা গরম হলে সবার মাঝে পরিবেশন করা হয়। এক কথায়, চা পান না করা পর্যন্ত তাদের পিকনিক অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।

ফিনল্যান্ড

ফিনল্যান্ডে পিকনিকের দিন বলা যায় মে দিবস অর্থাৎ মে মাসের প্রথম দিনকে। এই দিন তারা বন্ধুবান্ধব অথবা পরিবারের সঙ্গে বেশ আনন্দ করে সময় কাটায়। মূলত ৩০ এপ্রিল থেকেই পিকনিকের আয়োজন শুরু হয়। আর মে মাসের শুরুর দিন অফিশিয়ালি পিকনিক করা হয়। অনেকে আবার আগের রাতে পরিশ্রম করায় এই দিন শুয়ে-বসেই কাটায়। তাদের পিকনিকের খাবারকে বলা হয় ‘হেরিং লাঞ্চ’। এতে থাকে আচারযুক্ত মাছ আর নানা স্বাদের লবণাক্ত খাবার।

আইসল্যান্ড

সব পিকনিকই যে ছুটির দিন হিসেবে কাটে, এ কথা আইসল্যান্ডের জন্য সত্যি নয়। তারা সাধারণত পিকনিক বলতে শুধু মজা করা আর নিজ নিজ গ্রামে সময় কাটানো বোঝে। আইসল্যান্ডে বেরি (জামের মতো রসালো ফল) সংগ্রহকারীরা পিকনিকের জন্য লাঞ্চ প্যাক করে নিয়ে যায়। পথে যেতে যেতে কোথায় বেরি পেকেছে তা সন্ধান করে আর পথিমধ্যেই পিকনিকের আয়োজনটাও করে নেয়। এমনটা হয় সাধারণত গ্রীষ্মের সময়। তাদের খাবারে থাকে প্রচুর মাংস আর চিজ। অনেকে পিকনিক করতে গিয়ে বেরি নিয়ে আসেন যেন নিজ এলাকায় বেরি চাষ করা যায় সে জন্য।

ব্রাজিল ও উরুগুয়ে

লাউ দিয়ে ‘গর্ড’ নামে এক ধরনের পাত্র বানানোর রীতি আছে ব্রাজিল ও উরুগুয়েতে। এই পাত্রে জার্বা মেট নামে গাছের পাতা থেকে এক ধরনের চা বানানো হয়। ব্রাজিল, উরুগুয়ে এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সঙ্গে একত্রিত হলে অথবা পিকনিক করতে গেলে এই চা অবশ্যই থাকে। এই চা-কে বলা হয় ‘মেট’। একজন গর্ডের ভেতর চা ঢেলে তাতে স্ট্র বসিয়ে নিজে পান করে পাশের জনকে দেয়। এভাবেই এই পাত্র একজন থেকে আরেকজনের হাতে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত গর্ডের মেট তার নিজস্ব ঘ্রাণ না হারাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত বারবার এটি ভরা হয়। বন্ধুদের সঙ্গে এটি শেয়ার করার সময় অবশ্যই একটি নিয়ম মানতে হয়। গোল হয়ে বসে কেউ যদি সেটি ভেঙে উঠে যায় অথবা গর্ডে চুমুক না দেয়, যদি চুমুক দেওয়ার আগে স্ট্র মুছে নেয় এসব বিষয়কে পিকনিকবিরোধী বলে মানা হয়।

গ্রিস

গ্রিসে ‘ক্লিন মানডে’ নামে একটি খাবারের আয়োজন বেশ পরিচিত। প্রতি বছর ইস্টার্ন গ্রিক অর্থোডক্স চার্চে ৪০ দিনের জন্য গ্রেট লিন্ট পালন করা হয়। একে বলা হয় ‘সারাকোস্তি’। এই আয়োজন শুরু হয় ইস্টার সানডে শুরু হওয়ার ৭ সপ্তাহ আগের প্রথম দিন। এই ৪০ দিন খাবারে ধর্মীয় অনেক বিধিনিষেধ থাকে। যেমন মাংস, ডিম ও দুগ্ধজাত কোনো খাবার এ সময় খাওয়া যাবে না। শুধু মাছ খাওয়া যাবে। এ সময় সামুদ্রিক খাবারের প্রতি আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়।  আলাদাভাবে যে খাবার তৈরি করা হয় তার মধ্যে থাকে চিংড়ি, ঝিনুক, অক্টোপাস, শেলফিশ, ইস্ট ছাড়া পাউরুটি। শুধু এই দিনের জন্য ‘তারামোসালাতা’ নামের পাউরুটিটি বানানো হয়। লবণাক্ত পোনা মাছের সঙ্গে অলিভ অয়েল, লেবুর রস মিশিয়ে বানানো হয় ঐতিহ্যবাহী একটি খাবার। পরিবারের সবাই মিলে পিকনিকের আয়োজন করলে তাতেও এসব খাবারই থাকে। ক্লিন মানডে শুরু হয় বসন্তের শুরুতে। আর এ সময় আকাশও থাকে বেশ ঝকঝকে। ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য এ সময় বেশ ভালো। আর গ্রিসের ঐতিহ্যের একটি অংশও এই ঘুড়ি ওড়ানো। ঐতিহ্য মেনে অনেক দোকান প্রায় ৭০ বছর ধরে ঘুড়ি বানিয়ে আসছে। প্লাস্টিকের বদলে কাঠের ঘুড়ি বানানোর রীতিও গ্রিসের পিকনিক আয়োজনে বেশ জনপ্রিয়। তবে কীভাবে এই কাঠ খোদাই করা হয় সে তথ্য এখনো গোপন। গ্রিসের জনগণ মন থেকেই ক্লিন মানডে’র সব রীতি মেনে চলেন। অবসর কাটানোর ও প্রতিদিনের রুটিন থেকে বিরতি পেলেও বাড়িতে কেউই সেভাবে থাকেন না। প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটাতে এবং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশীদার হতে সবাই ক্লিন মানডে পালন করেন। পিকনিক আর ঘুড়ি উড়িয়ে বসন্তকে স্বাগত জানায় গ্রিসবাসী।