মক্কার সাধারণ এক ক্রীতদাস ছিলেন বিলাল ইবনে রাবাহ। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দাওয়াতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবিদের কাতারে নিজের নাম লেখান। বলা যায়, পৃথিবীর ইতিহাসে বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের সূত্রপাত হয়েছিল তাকে ঘিরেই। তার বাবা ছিলেন আরব ক্রীতদাস। মা ছিলেন ইথিওপিয়ান রাজকুমারী। সেকালের নিয়ম মতো কোনো এক দুর্ভাগ্যের বেড়াজালে আটকে তিনি ক্রীতদাসীতে পরিণত হন।
নবী মুহাম্মদের আনীত ধর্মে বিশ্বাস স্থাপনের কারণে বিলালের ওপর নেমে আসে দুর্বিষহ নির্যাতন। বিলালের মনিব তার ওপর নির্মম অত্যাচার করতে শুরু করে। তাকে মক্কার পথেপ্রান্তরে, উত্তপ্ত মরুভূমিতে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হতো। ঠাট্টা-বিদ্রুপ করার জন্য অত্যুৎসাহী জনতার কাছে ছুড়ে দেওয়া হতো। জ¦লন্ত অঙ্গারসম মরুভূমিতে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হতো। বুকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো বিশাল পাথর। এভাবে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে ইসলাম ত্যাগের আদেশ দিত নিষ্ঠুর মনিব। কিন্তু বিলাল বিন্দুমাত্রও বিশ্বাস হারান নি। তার ইমানের মাত্রা আরও বেড়ে গেল। মৃত্যুমুখে পতিত হয়েও তিনি ‘আল্লাহ এক’ ‘আল্লাহ এক’ বলে নির্যাতন সয়ে যান।
ইসলামের প্রতি বিলালের অটুট বিশ্বাস ও নজিরবিহীন ত্যাগ দেখে নবী মুহাম্মদ (সা.) আবুবকরের মাধ্যমে নিষ্ঠুর মনিবের কাছ থেকে বেশ চড়ামূল্যে তাকে কিনে নেন। এরপর রাসুলের পরামর্শে আবুবকর তাকে দাসত্বের কবল থেকে মুক্ত করে দেন।
দাসত্বের শেকল থেকে মুক্ত হওয়ার পর বিলাল প্রাথমিক মুসলিম সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাতারে শামিল হলেন এবং নবীজির সঙ্গে মক্কায় দাওয়াতের কাজ চালিয়ে গেলেন। মদিনায় হিজরতের পর, আজানের প্রত্যাদেশ এলে নবী মুহাম্মদ (সা.) তাকেই মসজিদে নববিতে আজান দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করেন। এভাবে তিনি ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিনের মর্যাদা লাভ করেন।
বিলাল কৃষ্ণাঙ্গ ছিলেন। তার গায়ের রঙের কারণে বিষয়টি অনেকের কাছে বেমানান ঠেকল। একজন কালো মানুষের জন্য এমন সম্মানজনক দায়িত্ব মানায় না! একবার কোনো এক ঘটনার জেরে এক সাহাবি মুখ ফসকে বিলালের বিরুদ্ধে বিষোদগার করলেন। ‘এই, কৃষ্ণাঙ্গের ছেলে’ বলে সম্বোধন করে তাকে অপমানিত করলেন। এ ঘটনায় নবীজি খুব বেশি অসন্তুষ্ট হলেন। সেই সাহাবিকে ডেকে বললেন, ‘তুমি তার মায়ের নামে গালি দিয়েছ? তোমার মধ্যে দেখি এখনো কিছুটা জাহেলি যুগের স্বভাব রয়ে গেছে।’
এভাবেই বর্ণবৈষম্যের বিষবৃক্ষের শেকড় উপড়ে ফেলতে নবী মুহাম্মদ মনোযোগী হন। যে সমাজে ব্যক্তির বংশপরিচয় তার নীতি-নৈতিকতা ও সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি ভাবা হয়, সেই সমাজকে তিনি অন্ধকার-রাজ্য হিসেবে আখ্যায়িত করেন। নবী মুহাম্মদের সেই বর্ণবাদ-বিরোধিতা সপ্তম শতাব্দীর প্রভাবশালী আরব বর্ণবাদকে প্রচন্ড ঝাঁকুনি দেয়। ইসলামের প্রভাব যতই বেড়েছে, বর্ণবৈষম্যের কুসংস্কার পেছনে ঠেলে সাদা-কালোর পার্থক্য না করে মুসলমানরা একই শামিয়ানা তলে আশ্রয় নিয়েছেন।
তর্কসাপেক্ষে, নবী মুহাম্মদই ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি, যিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, বর্ণ বা বংশগুণে কেউ কারও ঊর্ধ্বে নয়। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে আরাফাতের ময়দানে দেওয়া বিখ্যাত বিদায় হজের ভাষণটি আজও ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছে। সেই ভাষণে নবী মুহাম্মদ (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বর্ণবাদের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘সমগ্র মানবজাতি আদম এবং হাওয়ার সন্তান। অনারবের ওপর আরবের কোনো প্রাধান্য নেই। তেমনি আরবের ওপর অনারবেরও কোনো প্রাধান্য নেই। শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের বা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো প্রাধান্য নেই। প্রাধান্য কেবল তাকওয়া, পুণ্য ও ভালো কাজের ভিত্তিতেই হবে।’
আজও নবী মুহাম্মদের সেই শিক্ষা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মানবজাতিকে আলো বিতরণ করছে। যুগে যুগে মানুষ বর্ণপ্রথার মূলোৎপাটনে এবং সমতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আসছে। মুসলিম নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মালিক আল-শাহবাজের কথাই ধরা যাক, ম্যালকম এক্স নামেই যিনি অধিক পরিচিত। গত পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যাপক সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।
মক্কায় হজ পালন শেষে তিনি সেই বিখ্যাত পত্রটি লেখেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘এখানে সারা বিশ্ব থেকে আগত লক্ষাধিক হাজি অংশ নিয়েছিলেন। কারও নীল চোখ, সোনালি চুল; কেউ আবার আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ। কিন্তু আমরা সবাই একই ধর্মানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের প্রকৃত অর্থ এখানেই ফুটে উঠেছে। অথচ আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা আমাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিল যে, সাদা-কালোর এরকম বৈচিত্র্যপূর্ণ মিলনের অস্তিত্ব পৃথিবীর বুকে অসম্ভব!’
তিনি আরও বলেছেন, নিজেদের বর্ণের বাইরে গিয়ে, অন্যদের সঙ্গে মিশে এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ ভ্রাতৃত্বের চর্চা ইতিপূর্বে তিনি কখনো দেখেননি। ম্যালকম মনে করেন, হজ বর্ণবাদের ঘৃণ্য দেয়াল ভেঙে দেয় এবং বর্ণ-সমতার পথ দেখায়।
তাছাড়া নবী মুহাম্মদের বর্ণবাদবিরোধী শিক্ষা সাধারণ বর্ণসমতার চিন্তাধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণ অবর্ণবাদীরা বর্ণবাদের কুসংস্কারগুলো নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলে না, সোচ্চারভাবে মত প্রকাশ করে না। সমাজ থেকে বর্ণবাদের অভিশাপ মুছে দিতেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। পক্ষান্তরে, নবী মুহাম্মদ কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে চতুর্দিকে ছড়িয়ে থাকা ভেতরে-বাইরের সব ধরনের বর্ণবাদের দেয়াল ভেঙে ফেলেন। তিনি বর্ণবাদকে সমাজের মারাত্মক উপসর্গ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যার মূল কারণ মানুষের অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্বের মনোভাব।
আজকের পৃথিবী খুবই বৈচিত্র্যপূর্ণ ও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই নবী মুহাম্মদের শিক্ষা অনুসরণ করা আমাদের জন্য অপরিহার্য। আমি নিজেও একজন অমুসলিম, কিন্তু আমি স্বীকার করতে বাধ্য, নবী মুহাম্মদের বর্ণবাদবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমি অনুপ্রাণিত হই। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, একজন মানুষ তার গোত্র-পরিচয়ে অন্য কারও থেকে আলাদা নয়, বরং উন্নত চরিত্র ও ভালো আচরণের মাধ্যমে একে অন্যের চেয়ে পৃথক ও স্বতন্ত্র বিবেচিত হয়।
লেখক : বিখ্যাত আইরিশ-আমেরিকান স্কলার এবং টেক্সাসের রাইস ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক।
‘অ্যাবাউট ইসলাম’ থেকে অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ মিশকাত