বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ড্যাপ (ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান) বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা-(২০১৬-২০৩৫) তৈরির পাট চুকিয়ে এখন তা গণশুনানিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পর্যালোচনার প্রক্রিয়ায় আছে। এখন পর্যন্ত যে ড্যাপ তৈরি করা হয়েছে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ এই ড্যাপ তৈরিতে ‘অন্তর্ভুক্তিকরণ’ বিষয়টাকে অনেক গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে, যেন নগরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ নাগরিক সুবিধা পায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে তৈরি ড্যাপ কি আসলেই নগরের মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষের নগর সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে, যেখানে এই শহরের আয়-বৈষম্য প্রকট? তাত্ত্বিকভাবে দেখতে গেলে এই প্রশ্নের মূলে রয়েছে কার্ল মার্কসের শ্রেণিতত্ত্ব এবং নগর-নৃবিজ্ঞানী ডেভিড হারবির নগর শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্ব। এই সব তত্ত্ব থেকে সংশয় প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এমন ‘অন্তর্ভুক্তিকরণ’-এর মাধ্যমে তৈরি ড্যাপ এই নগরের মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষের নগর সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে একচেটিয়া অন্তর্ভুক্তিকরণ, আয় ও ক্ষমতার বৈষম্য, এবং আমাদের পুঁজিবাদী সমাজের প্রকৃতি।
ঢাকা মহানগরে আয় বৈষম্য প্রকট। এই বৈষম্যের ফলে শহরে দুই শ্রেণির নাগরিক তৈরি হয় যা কার্ল মার্কসের শ্রেণিতত্ত্বে প্রতীয়মান একটি শ্রেণি হচ্ছে পুঁজিপতি শ্রেণি এবং অন্যটি শ্রমিক শ্রেণি। নগর-নৃবিজ্ঞানী ডেভিড হারবির মতে, পুঁজিপতি শ্রেণি শহর তৈরির কারিগর আর শ্রমিক শ্রেণি শহরের চালিকাশক্তি। এই দুই শ্রেণির খুব সাধারণ একটা উদাহরণ হচ্ছে বাড়ির মালিক এবং ভাড়াটিয়া। ঢাকা শহরে এই দুই শ্রেণির আয়ের বৈষম্য অনেক বেশি, একই সঙ্গে সামাজিক ও নগর সুবিধার বৈষম্যও অনেক বেশি। যে কারণে আমরা বিভিন্ন অঞ্চলকে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত অঞ্চল হিসেবে শনাক্ত করতে পারি। এই আয় বৈষম্য নগরে ক্ষমতা চর্চার সঙ্গেও জড়িত। আর এই ক্ষমতা অনেকাংশে নগরের উন্নয়ননীতি তৈরি, বাস্তবায়ন এবং লংঘনে প্রভাব রাখে। যেমন, উন্নয়নের দিক থেকে কিছু অঞ্চলে অনেক বেশি উন্নয়ন কাজ হয় আবার কিছু অঞ্চলে উন্নয়ন হয় না। নগর-নৃবিজ্ঞানী ডেভিড হারবির ভাষায় বলতে গেলে, ঢাকা মহানগরটা পুঁজিপতি ও ক্ষমতাসীন শ্রেণির মাধ্যমে পুঁজিপতি শ্রেণির জন্য গড়ে উঠেছে। যেখানে শ্রমজীবী মানুষের সুযোগ-সুবিধাকে অনেক ক্ষেত্রে অবজ্ঞা করা হয়েছে। শহরের মধ্যে সামরিক অঞ্চলের অবস্থান, মন্ত্রীপাড়া, যত্রতত্র শিল্পকারখানা বা রাজউকের বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের দিকে তাকালেই সেটা প্রতীয়মান।
অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন করা যেতেই পারে, এই তথ্যসমৃদ্ধ সময়ে নগর পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তিকরণ কতটা জরুরি? অন্তর্ভুক্তিকরণ জরুরি, তবে পরিকল্পনা করার জন্য যতটা না জরুরি তার থেকেও বেশি জরুরি এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা। নগরবাসী যেন এই পরিকল্পনা সম্মান ও অনুসরণ করেন। কিন্তু বর্তমান এই একপেশে অন্তর্ভুক্তিকরণ করার অর্থ হচ্ছে শুধু সাধারণ মানুষকে পরিকল্পনা অনুসরণে বাধ্য করা। একপেশে বলার কারণ হলো, এই অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রক্রিয়ায় শুধু নগরের সাধারণ মানুষ বা শ্রমজীবী শ্রেণিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কিন্তু শহর তৈরির কারিগর পুঁজিপতি শ্রেণিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ড্যাপ-এর প্রকল্প পরিচালক তার সাক্ষাৎকারে জাগোনিউজ২৪.কম-কে খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘ড্যাপ তৈরিতে আমরা এলাকাভিত্তিক সাধারণ মানুষের মতামত নিয়েছি, পাশাপাশি এতে বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া হয়েছে’। সুশীল সমাজের দু-একজন হয়তো পুঁজিপতি শ্রেণির হতে পারে কিন্তু তা পুঁজিপতি শ্রেণিকে বোঝায় না। এখন প্রশ্ন হলো কেন এই পুঁজিপতি শ্রেণিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর প্রধান কারণ হলো এই পুঁজিপতি শ্রেণি যেন পরিকল্পনাকে সম্মান ও অনুসরণ করে। এখানে সম্মান করার অর্থ হচ্ছে সাধারণ মানুষের সম-নগর অধিকারকে সম্মান করা এবং পরিকল্পনায় প্রণীত সমস্ত বিধান অনুসরণ করা। এ সম্পর্কে নগর-নৃবিজ্ঞানী ডেভিড হারবি বলেন, পুঁজিপতি শ্রেণি শহর তৈরি করে, চাহিদা-সরবরাহ ভারসাম্য ঠিক রাখে, বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে, এবং তাদের মূল লক্ষ্য থাকে মুনাফা বা লাভ। এই পুঁজিপতি শ্রেণির একটি হচ্ছে বেসরকারি ভূমি ও আবাসন প্রতিষ্ঠান। আমাদের বর্তমান নগরসরকার ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, আমাদের জনপ্রতিনিধি এবং পুঁজিপতি শ্রেণি সমাজের একই স্তরের। ফলে, তাদের সম্পর্ক অনেক দৃঢ়, তারা একে অপরের কল্যাণে কাজ করে। পাশাপাশি আমাদের সরকারি সংস্থাগুলোও এই পুঁজিপতি শ্রেণির জন্য কাজ করে যা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নাগরিকের অধিকার ক্ষুন্ন করে। এর এক চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে যখন আমরা গুলশান অঞ্চলে ‘ভিক্ষুকমুক্ত এলাকা’ সাইনবোর্ড দেখতে পাই। এই সাইনবোর্ড সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র স্তরের মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়টা যেমন এড়িয়ে যায় তেমনি তাদের ঐ অঞ্চলে প্রবেশের অধিকারেও হস্তক্ষেপ করে। তাই সংশয় হয় এই একপেশে অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে প্রণীত ড্যাপ ঢাকা মহানগরকে কিছুটা বাসযোগ্য করলেও সাধারণ মানুষের নগর চাহিদা বা অধিকার কতটা পূরণ করতে পারবে?
এখন একটু ড্যাপের দিকে তাকাই। ড্যাপ-এ ৪টি মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার প্রথমটি হলো বিনিয়োগের সর্বজনীন স্বাধীনতা। এই লক্ষ্যে বলা হয়েছে ‘কঠোর থেকে কঠোর বিধান সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাধরদেরই স্বার্থ সংরক্ষণ করে; একই সাথে তা সমাজের দুর্বল ও ক্ষমতাহীন শ্রেণির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। তাই সমতা বিধানের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ অনেক বেশি সহায়ক, অনেক বেশি ন্যায্য’। এখন প্রশ্ন হলো, একটা উন্মুক্ত পরিবেশে কে বেশি ক্ষমতাধর? পুঁজিপতি শ্রেণি নাকি সাধারণ শ্রেণি? আর সমতা বিধানের কথা বললে, বলতেই হবে বিধান তৈরির মূল লক্ষ্য থাকে সমতা তৈরি করা ও মানুষের অধিকার রক্ষা করা। এই বিধানই ক্ষমতাহীন শ্রেণির অস্ত্র যা তাদের ক্ষমতা প্রদান করার কথা। এখানে উন্মুক্ত পরিবেশ থেকেও মূল বিষয় হচ্ছে, এই কঠোর বিধানের পক্ষপাতিত্বহীন যথাযথ ব্যবহারই সমাজের দুর্বল ও ক্ষমতাহীন শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করতে পারে। ড্যাপ-এ ঢাকা মহানগরের স্বল্প ও নিম্নবিত্তের আবাসনের চাহিদা পূরণের জন্য অনানুষ্ঠানিক ব্যক্তি খাতকে যথাযথ সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, ৪ অথবা ৫ কাঠা জমিতে আবাসন নির্মাণের পরিবর্তে ব্লক ভিত্তিতে উলম্ব আবাসন নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। আর ইমারতের উচ্চতার ক্ষেত্রে, ব্যক্তি পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৮ তলা এবং সরকারি/বেসরকারি উদ্যোগে ব্লকভিত্তিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইমারতের উচ্চতা ১০ তলা (ব্লক আয়তন ০.৬৬-২ একর), ১৫ তলা (ব্লক আয়তন ২-৫ একর), এবং সীমাহীন (ব্লক আয়তন ৫ একরের বেশি) এর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এরকম সুপারিশ বা শর্ত প্রকৃত অর্থে স্বল্প ও নিম্নবিত্তের আবাসন সমস্যা সমাধান করতে পারবে না বরঞ্চ পুঁজিপতি শ্রেণিকেই লাভবান করবে। কারণ প্রথমত, সহায়তা ও প্রণোদনা পাওয়ার যে শর্ত থাকে তা স্বল্প ও নিম্নবিত্ত ব্যক্তির কাছে কখনো পৌঁছায় না বা সেসব গ্রহণ করার যোগ্যতা তাদের থাকে না। আবার এই ব্লকভিত্তিক আবাসন নির্মাণের যে ধারণা তা স্বল্প ও নিম্নবিত্তের আবাসন নির্মাণের আকাক্সক্ষা বা ধরনের বিপরীত। দ্বিতীয়ত এই ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন ধারণা মডেল টাউনভিত্তিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করবে যা কেবল পুঁজিপতি শ্রেণির মাধ্যমেই সম্ভব। আর পুঁজিবাদ সেই উপায়ন্তরটাই বেছে নেয় যেটা সর্বোচ্চ মুনাফা দেবে, যেখানে ভোক্তাই তার আয়ের প্রধান উৎস। এর ফলে যে আবাসন তৈরি হবে তা উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্তের আবাসন চাহিদা পূরণ করবে বা অতি ঘনত্বপূর্ণ ইমারত তৈরি হবে। যা নিম্নবিত্তের আবাসনের জোগান দেবে না বা নাগরিকদের নিরাপদ আবাসনের পরিবর্তে স্বাস্থ্যঝুঁকি বা অন্যান্য দুর্যোগঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। আবার এই ড্যাপ প্রণয়নের ফলে পুঁজিপতি শ্রেণির জন্য নতুন নতুন বিনিয়োগ অঞ্চল তৈরি হবে, মুনাফার সুযোগ হবে। এই উন্নয়ন ও পুঁজিপতি শ্রেণির মুনাফা করার প্রকৃতি, স্বল্প ও নিম্নবিত্তের মানুষের আবাসন খরচ ঊর্ধ্বগতির দিকে নেবে। যা প্রকৃত অর্থে, স্বল্প ও নিম্নবিত্তের জন্য বাসযোগ্য নগর প্রদানের পরিবর্তে নগরের বাইরে অপর্যাপ্ত নগর সুবিধাপূর্ণ অঞ্চলের দিকে ঠেলে দেবে।
নগরে সাধারণ মানুষের নগর অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ড্যাপ প্রণয়ন অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু এই ড্যাপ তৈরির প্রক্রিয়ায় একচেটিয়া সাধারণ মানুষকে অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ এবং তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোকেও যেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য এবং সীমাবদ্ধতাকে যেন স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এর থেকেও প্রধান কর্তব্য হচ্ছে ড্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন যেন পুঁজিপতি শ্রেণিকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া না হয়। এখানে উন্নয়নের দৃষ্টি হতে হবে সমতার। আর ভৌত-উন্নয়নের মাপকাঠিতে প্রতিটা অঞ্চলের উন্নয়ন যেন সমকক্ষ, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত হয়। এর জন্য ড্যাপে বিনিয়োগের উন্মুক্ত বিধানের পরিবর্তে দৃঢ়, অটুট এবং অপরিবর্তনশীল ভূমি বা ইমারত নির্মাণ নীতিমালা প্রণয়ন এবং এর প্রয়োগ অত্যাবশ্যকীয়।
লেখক নগর পরিকল্পনাবিদ ও পিএইচডি স্টুডেন্ট, সেন্টার ফর আরবান রিসার্চ, আর.এম.আই.টি ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া
md.badrul.hyder@student.rmit.edu.au