জীবনের অমোঘ সত্য মৃত্যু। খন্দকার মুনীরুজ্জামান, খ্যাতিমান সাংবাদিক, আমার প্রিয় মুনীর ভাই, গত ২৪ নভেম্বর কভিড-আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, ৭২ বছর বয়সে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২.৭২ বছর। তিনি, আপাতদৃষ্টিতে, পরিণত বয়সেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তার মৃত্যুর খবরটি আমার ভেতর এক প্রবল রিক্ততাবোধ তৈরি করে, কিছুক্ষণের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়ি।
প্রতিদিনই তো কত মৃত্যুর খবর পাই, চেনা-অচেনা, দেশি-বিদেশি, খ্যাতিমান-অখ্যাত, শিশু-বৃদ্ধ মানুষের মৃত্যুসংবাদ। প্রতিটি মৃত্যুই ফেলে যাওয়া আত্মীয়-পরিজনের হৃদয়কে ব্যথিত করে। কিন্তু সবার ভেতরে সব মৃত্যু সমপরিমাণ বেদনার সঞ্চার করে না। করা সম্ভব নয়। আমাকেও করে না। কারণ সব মৃত্যু সবাইকে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। মৃতের সঙ্গে অন্যের জীবৎকালীন নৈকট্য ও নির্ভরতার অনুপাতের ওপরই বেদনাবোধের গভীরতা নির্ভরশীল।মুনীর ভাইয়ের সঙ্গে আমার কোনো পারিবারিক বন্ধন ছিল না, কিন্তু একটা নিগূঢ় নৈকট্য ও আপৎকালীন নির্ভরতা ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংকট ও সম্ভাবনা, সাংবাদিকতার বিপদ-আপদ, ইতিহাসের অতীত-ভবিষ্যৎ ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের আলাপচারিতা ছিল। অনেক বিষয়ে আমাদের মতান্তর হয়েছে, কিন্তু কখনোই আমাদের মনান্তর ঘটেনি। মুনীর ভাইয়ের সঙ্গে এই আলাপচারিতার অভিজ্ঞতা আমার ভেতর এক মূল্যবান স্মৃতি হিসেবে জাগরূক থাকবে। কিন্তু আমাদের আরও কথা বলার ছিল। তিনি বলেছিলেন, হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে এসেই আমাদের একটা নতুন ‘সেশন’ হবে। কিন্তু নতুন সেশনের জন্য তিনি আর ফিরলেন না। নিজের জন্য তার আরও বেঁচে থাকার দরকার ছিল কি না জানি না, তবে আমার মতো আরও অনেকের জন্য আরও কিছুকাল বেঁচে থাকা জরুরি ছিল। তিনি এক ভীষণ শ্বাসরুদ্ধকর, নিষ্ফলা সময়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তার এই অকরুণ মৃত্যু আমাদের দুর্বল করেছে।
প্রশ্ন উঠবে, তিনি আমাদের কে ছিলেন, আর সময়টাই শ্বাসরোধী কেন, কেনইবা নিষ্ফলা? নিষ্ফলা সময়কে ফের সুফলা যুগে রূপান্তরের জন্য তিনি কীভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারতেন? সময় আসলে অখন্ড ও অবিভাজ্য, যা নিরন্তর বয়ে চলে। মানুষ তার আপন প্রয়োজনে, তার জাগতিক কর্মকান্ড পরিচালনা ও মূল্যায়ন করার জন্য, সময়কে খন্ড খন্ড করে ক্ষণ, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, দশক, শতাব্দী, এমনকি সহস্রাব্দে বিভক্ত করে নিয়েছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে দেখা যায়, কোনো কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্ভাবনা, কিংবা কোনো বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত আবিষ্কার, কিংবা কোনো কোনো সফল রাজনৈতিক জনজাগরণ, মানুষকে একসঙ্গে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেয়। মানুষের সে ধরনের অগ্রগতির ঔজ্জ্বল্যে ওই নির্দিষ্ট সময়-কাল ইতিহাসে বিশিষ্ট হয়ে চিহ্নিত থাকে।
মুনীর ভাই ইতিহাসের এমনি এক উজ্জ্বল সময়ে যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে তার জন্ম। মাত্র কয়েক মাস আগে পাকিস্তান নামক নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। প্রধানত এ দেশের কৃষিনির্ভর বাংলাভাষী গরিব মুসলমান ও শূদ্র স্থানীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীর সফল রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু শাসক মুসলিম লীগের করাচিভিত্তিক নেতৃত্ব বাংলাভাষী বিশাল জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক-কল্পনা পদদলিত করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের যাত্রা সূচনা করে। বাঙালি মুসলমান ভেবেছিল, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত পাকিস্তানে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে, ব্রিটিশ আমলের শোষণ-নিপীড়নের নিগড়মুক্ত হয়ে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ সামষ্টিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু ঠিক শুরুতেই, ১৯৪৮ সালে, বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর এক নয়া-ঔপনিবেশিক ‘সংকট’ চাপিয়ে দেয় পাকিস্তান। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার ন্যায্য অগ্রাধিকার নাকচ করে শুধু উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অবাঙালি নেতৃত্ব। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবিতা, প্রগতিশীল ‘ছাত্র-আন্দোলন ও জনগণের রাজনৈতিক সংগ্রাম প্রাণের বিনিময়ে এই পশ্চিমা নয়া-ঔপনিবেশিক প্রকল্প রুখে দেয়। কিন্তু বাঙালি-বিদ্বেষী পশ্চিমা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড নানা সময়ে নানা রূপে অভিপ্রকাশিত হতেই থাকে। পূর্ববাংলাও তা নানাভাবে প্রতিরোধ করে করে এগিয়ে যায়। আর সে প্রক্রিয়ায় দুই দশকের মধ্যেই এ দেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সামষ্টিক রাজনৈতিক চেতনা বিকশিত হতে থাকে। মুনীরুজ্জামান ঠিক এ সময়কালে, বাঙালির জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক তৎপরতার প্রাণকেন্দ্র ঢাকা শহরে, মনে ও মননে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-সংগ্রামের উত্তাপ ধারণ করে, শৈশব ও কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনে পদার্পণ করেন। সেটা ১৯৬০-এর দশক।
১৯৬০-এর দশক সারা পৃথিবীর ইতিহাসে এক উজ্জ্বল সময়। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ প্রভৃতির বিরুদ্ধে দেশে দেশে তরুণসমাজ তখন মরণপণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এই তরুণদের এক প্রাগ্রসর অংশ শুধু সাম্রাজ্যবাদী, উপনিবেশবাদী আর বর্ণবাদী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেই ক্ষান্ত হতে রাজি ছিল না; সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর আপন আপন দেশে, একই সঙ্গে পৃথিবী জুড়ে, শোষণ-নিপীড়নহীন এক সমাজবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লড়াকু সংগ্রাম এগিয়ে নিতে ছিল বদ্ধপরিকর। পশ্চিম গোলার্ধে পুরুষতন্ত্রবিরোধী নারীবাদী রাজনৈতিক সংগ্রামও রাজপথে নেমে এসেছে তখন। পৃথিবীর কোনো বিজ্ঞানমনস্ক ও হৃদয়বান তরুণ-তরুণীই সেদিন এই সাম্যবাদী আদর্শের আকর্ষণ উপেক্ষা করতে পারেননি। মুনীরুজ্জামানও নন। তিনিও তার প্রাণবন্ত তারুণ্য নিয়ে এ দেশের সাম্যবাদী রাজনৈতিক ধারা-প্রভাবিত প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। যোগ দেন ছাত্র ইউনিয়নে। গোপনে যুক্ত হন সামরিক আইনের আওতায় নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। জেনারেল আইয়ুব খানের নেতৃত্বাধীন সামরিকতন্ত্রবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ক্রমান্বয়ে যে প্রবল ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়, ১৯৬৯ সালে, তার একজন নেতৃস্থানীয় কর্মী হিসেবে মুনীরুজ্জামান ঢাকা শহরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। এই রাজনৈতিক ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে, পাকিস্তানি কাঠামোর ভেতর অনুষ্ঠিত ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ বিজয়, পাকিস্তানি সামরিক-রাজনৈতিক চক্রের নির্বাচনী রায় প্রত্যাখ্যান ও পরে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর সেই চক্রের বর্বরোচিত বর্ণবাদী গণহত্যা শুরুর পরিপ্রেক্ষিতে, ১৯৭১ সালের মার্চে সূচিত হয় বাংলাদেশের ‘জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ’। সে পরিস্থিতিতে ক্ষুরধার রাজনৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ ও টগবগে যৌবনদীপ্ত মুনীরুজ্জামান ও তার কমিউনিস্ট সহকর্মীরা, বাঙালি জাতীয়তাবাদী কর্তৃপক্ষের বিবিধ বৈরী রাজনৈতিক-ভাবাদর্শিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একটি সফল সশস্ত্র জনযুদ্ধের ভেতর দিয়ে একই বছরের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জাতিরাষ্ট্র’ বাংলাদেশ।
মুনীরুজ্জামানদের সংগ্রাম-পরবর্তী স্তরে প্রবেশ করে। রাষ্ট্রের সমাজবাদী রূপান্তরের লড়াই। সে লড়াইয়ে জেতার জন্য চাই শ্রমজীবী শ্রেণির সাম্যবাদী ভাবাদর্শভিত্তিক রাজনীতির বিস্তার ও সে রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শক্তিমান সংগঠন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সফল মুক্তিযোদ্ধা মুনীরুজ্জামান এবার সাধারণ মানুষের সামগ্রিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামকে বেগবান করার জন্য নিজেকে শ্রমিকাঞ্চলে নিয়োজিত করেন। পূর্বাহ্ণে, ১৯৭০ সালেই, তার শ্রমিক আন্দোলনে হাতেখড়ি হয়েছিল। শ্রমিক বস্তিতে ঘুরে ঘুরে, শ্রমিকের জীবনযাপন করে, পুঁজির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শৃঙ্খল থেকে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির রাজনীতি প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে, তাদের দৈনন্দিন জীবনের লড়াই-সংগ্রামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে থাকেন শ্রমিকদের রাজনৈতিক সংগঠন। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘একতা’র সঙ্গেও তিনি সম্পৃক্ত হন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি তৎকালীন শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে বেশ কিছুকাল সমন্বয় ও সংগ্রামের বিভ্রান্তিকর রাজনীতি ও ‘অধনবাদী পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের’ কুহেলিকাময় তাত্ত্বিক রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করে, যা শেষ পর্যন্ত বিলোপবাদে পর্যবসিত হয় এবং আওয়ামী লীগের বাকশাল প্রকল্পে নিজেকে বিলীন করে। পরে শাসকশ্রেণির সামরিক প্রতিভূ জেনারেল জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান পর্বে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং জিয়ার কিছু কর্মসূচিকে কিছুকালের জন্য নৈতিক সমর্থন দান করে। ওদিকে, চীনপন্থি বলে পরিচিত কমিউনিস্টদের বিরাট অংশ জিয়ার রাজনীতিতে এ সময় চিরদিনের জন্য বিলীন হয়ে যায়। প্রগতিশীল বাম আন্দোলনের জন্য সে এক প্রগাঢ় রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ও বিহ্বলতার কাল। মুনীরুজ্জামান এ সময় কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক কর্মকান্ড থেকে খানিকটা দূরে ছিলেন। ফিরে আসেন ১৯৮০-এর দশকে। তখন তিনি জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা শহরে তৎপর ছিলেন। ১৯৯০-এর শুরুতে মুনীরুজ্জামান আবার কমিউনিস্ট পার্টিতে পুরোদমে সক্রিয় হন।
এদিকে, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সারা পৃথিবীতে প্রগতিশীল সমাজবাদী আন্দোলনের ওপর এক ঝড়ো বিপর্যয় নেমে আসে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন, রাশিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের রুশ-প্রভাবিত রাষ্ট্রসমূহে ‘সমাজতন্ত্রের’ পতন সারা বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ওপর ভয়ানক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মানুষের ইতিহাসে ১৯৬০-এর দশক যেমন ছিল আশার আলোয় ঝলমলে, ১৯৯০-এর দশক তেমনি হতাশার অন্ধকারে মলিন। দেশে দেশে, বিশেষত মস্কোপন্থি বলে পরিচিত কমিউনিস্ট সংগঠনগুলো এ সময় হতাশাগ্রস্ত হয়ে নানা রকম বিভক্তিকবলিত হয়, ক্ষয়ে যেতে থাকে তার শক্তি। মুনীরুজ্জামান তখন কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক। তিনি পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র সঙ্গেও জড়িত ছিলেন তখন। ১৯৯৩ সাল নাগাদ কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচি ও কর্মপন্থা নিয়ে তার মনেও দ্বিধার সঞ্চার হয়। ইতিহাসের সমসাময়িককালে কমিউনিস্ট রাজনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও অনিশ্চিত বোধ করেন। ১৯৯৩ সালে পার্টির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন তিনি।
দলীয় রাজনীতির সঙ্গে ব্যবধান তৈরি হলেও দীর্ঘকালের লালিত রাজনৈতিক ভাবাদর্শ আর সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার তাকে ছেড়ে যায়নি। ফলে, এবার তিনি ভিন্নভাবে, ভিন্ন পথে, তার প্রগতিশীল রাজনৈতিক ভাবনা বৃহত্তর সমাজে সঞ্চারিত করার মাধ্যম হিসেবে মূলধারার সাংবাদিকতা বেছে নেন। তিনি এর আগে সাংবাদিকতার ছাত্র ছিলেন। সাপ্তাহিক ‘একতা’য় কাজ করে লেখার মুনশিয়ানা রপ্ত করেছিলেন অনেক আগেই আর দেশ-বিদেশের নানা ঘটনা ও তাদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের খবর রাখতেন বরাবরই। নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আর চিন্তাশীল ভাবনা তো ছিলই। কিছুদিন তৎকালীন মূলধারার সাপ্তাহিকী যায়যায়দিন-এ কাজ করে, ১৯৯৬ সালে, ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দেন। পরে কিছুদিন ‘সংবাদ’ পরিচালনার ‘নির্বাহী’ দায়িত্ব পালনের পর, ২০১০ সালে পত্রিকাটি সম্পাদনার ‘ভার’ গ্রহণ করেন এবং সংবাদের ‘ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক’ হিসেবেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
প্রায় সিকি-শতাব্দীর পেশাগত সাংবাদিকতার জীবনে মুনীর ভাই ব্যক্তিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার এক তাৎপর্যময় নজির রেখে গেছেন। সাংবাদিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা। সমাজের সমতাভিত্তিক বিকাশের জন্য, সমাজ ও রাষ্ট্রের অধিকতর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য, রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত শক্তিমান শাসকশ্রেণির গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য এবং বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের অবাধপ্রবাহ জারি রেখে জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে পাঠক-শ্রোতা-দর্শকদের ‘অবহিত মতামত’ পরিগঠনে সাহায্য করার জন্য সুস্থ সাংবাদিকতা নিজেকে নিয়োজিত রাখে। জনসাধারণের বৃহত্তর স্বার্থের তরফে রাষ্ট্রের অন্তর্গত স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতাকে চাপের মধ্যে রাখাই সাংবাদিকতার প্রধান দায়িত্ব। যেকোনো দলীয় রাজনীতির উৎকট পক্ষাবলম্বন ও প্রচার করা, ভিন্নমতাবলম্বী ধ্যান-ধারণার প্রসার রুদ্ধ করা, কিংবা প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় সংগঠনসমূহের গণবিরোধী তৎপরতা সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের বশবর্তী হয়ে গোপন রাখা ইত্যাদি অপসাংবাদিকতা ছাড়া কিছু নয়। মুনীর ভাই যখন পেশাদারি সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন, তখন অপসাংবাদিকতা আমাদের দেশকে অনেকটাই আক্রান্ত করে ফেলেছে এবং তার বেদনার্ত চোখের সামনেই এই অপসাংবাদিকতা এখানে এক ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহণ করেছে। কিন্তু মুনীর ভাইয়ের জীবনকে এই অপসাংবাদিকতার মালিন্য এক মুহূর্তের জন্যও স্পর্শ করতে পারেনি। সাংবাদিক হিসেবে মুনীর ভাই প্রচুর লিখেছেন। রেডিও-টেলিভিশনে কথা বলেছেন বহুকাল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর দল-নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে রচিত একটি পুরো গ্রন্থ অনুবাদও করেছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের ধর্ম-নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ মুনীর ভাই ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির ব্যাপারে ছিলেন নিরাপস। এ রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক জাতীয়তাবাদী দলের প্রতি বিতৃষ্ণা ছিল তার সহজাত। অন্যদিকে, খাতা-পত্রে ঘোষিত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক-ভাবাদর্শের প্রতি মুনীর ভাইয়ের কিছুটা সহানুভূতি ছিল, কিন্তু প্রায়োগিক রাজনীতিতে দলটির স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা ও জনস্বার্থবিরোধী অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সমালোচনা করতে তিনি কখনোই পিছপা হননি। ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির সঙ্গে লীগের সাম্প্রতিক সখ্যও তার সমালোচনার লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল। আরও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো, এ দেশের রাষ্ট্রীয় রক্তচক্ষু, বিভিন্ন স্বৈরতান্ত্রিক সরকার প্রণীত নিপীড়নমূলক গণমাধ্যম আইনের চোখ রাঙানি, সুনীতি-বিবর্জিত বিত্তবান-শ্রেণি ও তার পৃষ্ঠপোষক প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীসমূহের ছড়িয়ে রাখা নানা আকার ও প্রকারের লোভনীয় টোপ, ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে সুস্থ ও জনকল্যাণমূলক সাংবাদিকতার ম্রিয়মাণ ধারাটিকে রক্ষা ও বিকশিত করার বেদনাদায়ক সংগ্রামের তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সম্মুখযোদ্ধা। তার মৃত্যু, আশঙ্কা করি, সাংবাদিকতার দুঃসময়কে দীর্ঘায়িত করবে। এখানেই আমি নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত বোধ করি। আমার ধারণা, তার আরও কজন সহযোদ্ধা ও সহকর্মীও তার মৃত্যুতে আমারই মতো ক্ষতিগ্রস্ত বোধ করেছেন।
একজন একক ‘ব্যক্তি’ মানুষ হিসেবে মুনীর ভাই তার ৭২ বছরের ‘জীবনকে’ ভীষণ মিতব্যয়িতার সঙ্গে ‘খরচ’ করেছেন, বিন্দুমাত্র অপচয় না করে, বৃহত্তর জনকল্যাণে ব্যয় করেছেন গোটা জীবন। জীবনের কৈশোর থেকে শুরু করে শেষদিন পর্যন্ত মানুষের বৃহত্তর কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় সবকিছুর সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। এ ধরনের জীবন সব দেশে, সব যুগে, নানা ধরনের বিপদে আকীর্ণ থাকে। সে বিপদের কাঁটায় তিনি নানা সময়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন; কিন্তু অসাধারণ ‘কৌতুকবোধ’সম্পন্ন এই মানুষটির মুখের হাসি তাতে মলিন হয়নি কখনো। জীবনের এ এক অপরূপ সাফল্য। এমন একটি মহৎ জীবনের অকস্মাৎ অবসানে বেদনা-ভারাক্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক। তবু, তার যাপিত জীবনের নিষ্কলঙ্ক সাফল্যকে আমি সেলিব্রেট করব আমৃত্যু।
লেখক : সম্পাদক, নিউ এইজ