প্রধানমন্ত্রীর মহানুভবতায় অভিভূত শাম্মী আক্তার

গত বছর নভেম্বরে একটি পত্রিকায় যখন তার দুরবস্থার কথা লেখা হলো, তখন থেকেই যেন বদলে গেল শাম্মী আক্তারের জীবন। স্বামীহারা শাম্মীর দুই নাবালক সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনের গল্প পত্রিকায় পড়ে প্রথমে তার পাশে দাঁড়ালেন যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি কাজী নাবিল আহমেদ। এককালীন ৫০ হাজার টাকা অর্থ সহায়তার পাশাপাশি প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন নাবিল। সেই খবর চলে এলো ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের কাছে। দ্রুত শাম্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী তাকে বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অর্থ সহায়তা চাওয়ার। প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাসে প্রধানমন্ত্রীর কাছে শাম্মী চাইলেন অর্থ সহায়তা। সেটা তো পেলেনই, গতকাল এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শাম্মীকে দিলেন মাথা গোঁজার ঠাঁই! যা খোদ শাম্মীর কাছেই অকল্পনীয় একটা ব্যাপার।

২০১০ সালে ঢাকা সাউথ এশিয়ান গেমসের তায়কোয়ান্দো ডিসিপ্লিনের অনূর্ধ্ব-৪৯ কেজি ওজন বিভাগের স্বর্ণপদক জয়ের পর সরকারের কাছ থেকে শাম্মী পেয়েছিলেন ৫ লাখ টাকা অর্থ পুরস্কার। তার আগের বছর সাইফুল ইসলাম নামে এক তায়কোয়ান্দো খেলোয়াড়ের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন। শারীরিক সমস্যার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে অবশ্য সোনা জয়ের পরের বছরই খেলা ছেড়ে দেন। ২০১২ সালে সাইফুল-শাম্মী দম্পতির কোল আলো করে আসে প্রথম সন্তান আবু হুরায়রা। স্বামী সাইফুল ইসলাম চাকরি করতেন সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে। প্রথম সন্তান হওয়ার পর আনসারের চাকরি ছেড়ে পুরোদস্তুর গৃহিণী বনে যান শাম্মী। সুখে-দুঃখে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু ২০১৭ সালে জন্ম হয় দ্বিতীয় ছেলে আবু হামজার। কিন্তু ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট শাম্মীর জীবনে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার। এক কাল রাতে ডাকাত পড়ে তাদের ঝিনাইদহের বাসায়। ডাকাতের দায়ের কোপে মারা যান স্বামী সাইফুল ইসলাম। ছয় বছরের হুরায়রা আর ১৩ মাসের হামজাকে নিয়ে অকুল সাগরে পড়ে যান শাম্মী। সেই থেকে সংগ্রামের শুরু। দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় ঘুম নেই শাম্মীর। দু’বেলা খাবার জোটাও কঠিন। তার ওপর সেনানিবাসের বাসা ছাড়ারও তাগাদা আসে। কোথায় মাথা গুঁজবেন এই চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েন। তখনই একটি সংবাদপত্র তার দুরবস্থার গল্প নিয়ে সংবাদ প্রচার করলে ফের বাঁক বদল ঘটে শাম্মীর জীবনে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকার অর্থ সহায়তা পাওয়ার কথা ক’দিন আগেই জেনেছিলেন। গতকাল মন্ত্রণালয়ে তাকে ডেকে পাঠান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। দুই ছেলেকে নিয়ে সেই অর্থ সহায়তা পাওয়ার আশায় মন্ত্রণালয়ে হাজির হন শাম্মী। কিন্তু সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল আরও বড় বিস্ময়। মন্ত্রী ২৫ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি তুলে দেন ফ্ল্যাটের কাগজ, যা পেয়ে কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন শাম্মী ‘আমি আসলে ভাবতেই পারিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অর্থ সহায়তার পাশাপাশি আমাকে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁইও উপহার দেবেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আল্লাহর কাছে একটাই দোয়া করি প্রধানমন্ত্রীকে যেন তিনি দীর্ঘায়ু দান করেন। যাতে তিনি আমাদের মতো অসহায়দের এভাবেই সহায়তা করে যেতে পারেন আরও বহু দিন।’

শাম্মী নিজেই স্বীকার করলেন প্রধানমন্ত্রীর এই মহানুভবতায় তার এবং দুই সন্তানের ভবিষ্যতের ভাবনা পুরোপুরিই দূর হলো, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর সত্যি বুঝতে পারছিলাম না কী করে দুই ছেলেকে মানুষ করব। তার ওপর যখন ক্যান্টনমেন্টের বাসাটা ছাড়ার নোটিস পেলাম, তখন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার জোগাড়। এ অবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের আর্থিক ও থাকার সমস্যা দূর করে দিয়েছেন। এর জন্য প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, যশোর-৩-এর সংসদ সদস্য নাবিল স্যার এবং সাংবাদিক বদিউজ্জামান মিলনের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’

শাম্মীর হাতে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ সহায়তা ও ফ্ল্যাটের কাগজ তুলে দেওয়ার পর ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, ‘ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী সুখে-দুঃখে সবসময় আমাদের খেলোয়াড়দের পাশেই থাকেন। তিনি ক্রীড়াঙ্গনের প্রকৃত অভিভাবক। করোনাকালেও আমরা খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছি। ভবিষ্যতেও এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে।’