ভুয়া ওয়ারেন্টে ৩৫ দিনের কারাবাস!

বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের পোটকাখালী গ্রামের বাসিন্দা বাদল মিয়া (৫৭)। পেশায় কৃষক। কৃষিকাজ করেই পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করছিলেন। ৫৭ বছর বয়সের জীবনে কখনো তিনি রাজধানী ঢাকায় যাননি। কিন্তু সেই ঢাকারই এক শিশুকে ধর্ষণের মামলায় শিশু আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) বলে বরগুনা থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে বাদল মিয়াকে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যে ওয়ারেন্টের বলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেই ওয়ারেন্টটাই ছিল ভুয়া।

গ্রেপ্তারের আগে কোনোরকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই ভুয়া ওয়ারেন্টে আটকের ফলে ৩৫ দিন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়েছে বাদল মিয়াকে। কারামুক্তির পর গত মঙ্গলবার রাতে বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেই এসব তথ্য জানান তিনি। এ সময় তার ছেলে, স্বজন ও গ্রামের বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।

বাদল মিয়ার অভিযোগ, স্থানীয় দালাল (পুলিশের সোর্স) সাইফুল ও ইলিয়াস ষড়যন্ত্র করে তাকে ফাঁসিয়েছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথম আমাকে পুলিশ যেদিন গ্রেপ্তার করে তারপর ২৫ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে এনে আমাকে সাইফুলদের বাড়িতে চার দিন আটকে রাখে। আমার মনে হয় আমার ক্ষতিসাধন করার জন্য পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশে সাইফুল ও ইলিয়াস এ ভুয়া ওয়ারেন্ট বানিয়ে আমাকে আটক করায়। আমি জীবনে কখনো ঢাকা যাইনি, অথচ সেই ঢাকারই একটি শিশু ধর্ষণ মামলায় আমাকে ৩৫ দিন জেল খাটতে হয়েছে। যারা আমার সঙ্গে প্রতারণা করে আমাকে জেল খাটিয়েছে, আমি তাদের সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’ একই সঙ্গে তার মতো আর কোনো নিরপরাধী যাতে এভাবে ভুয়া ওয়ারেন্টে হয়রানির শিকার না হন সেজন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে দাবি জানান বাদল মিয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর বরগুনা সদর থানা পুলিশের এএসআই সাইফুল ইসলাম ঢাকার শিশু আদালতের ৯(১) ধারার শিশু ধর্ষণ মামলায় একটি ওয়ারেন্টের বলে বাদল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসেন। সেবার স্থানীয় পুলিশের সোর্স ইলিয়াস ও সাইফুলের মাধ্যমে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে থানা থেকে বাদলকে ছাড়িয়ে নেন স্বজনরা। তবে এর অল্প কিছুদিন পরই ১৪ ডিসেম্বর ফের একই মামলার ওয়ারেন্টে বরগুনা সদর থানার আরেক এএসআই নাঈমুর রহমান আবারও গ্রেপ্তার করেন বাদল মিয়াকে। সেবার কোনো ‘মীমাংসা’ না হওয়ায় তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। এরপর বাদল মিয়ার ছেলে বাবাকে মুক্ত করার জন্য ঢাকায় গিয়ে বিভিন্ন আদালতে কথিত এ মামলা সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন। তিনি জানতে পারেন, ঢাকা জজ কোর্টে শিশু আদালত বলতে কোনো আদালতই নেই। সেখানে নয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে, যেগুলো শিশু আদালত হিসেবে কাজ করে। যার কোনো আদালতেই বাদল মিয়ার বিরুদ্ধে যে ওয়ারেন্টের কাগজ দেখানো হয়েছে সেই মামলার উল্লেখ নেই। ঢাকার নয়টি নারী ও শিশু আদালতে খোঁজ করে ওই মামলার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পরে বিষয়টি বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারকের দৃষ্টিগোচর করা হলে তিনি বিষয়টি আমলে নিয়ে বাদল মিয়াকে মুক্তির আদেশ দেন।

মামলার ওয়ারেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ওয়ারেন্টে মামলা নম্বর হিসেবে লেখা হয়েছে জি.আর ৪২৫/১৭ ও শিশু-৮৯০/১৮। এছাড়াও অপরাধ হিসেবে লেখা হয়েছে শুধু ৯(১) ধারা। পাশাপাশি মামলা নম্বরে ২০১৭ সাল উল্লেখ থাকলেও বিচারকের স্বাক্ষরের স্থলে তারিখ দেওয়া হয়েছে ০৪/০৪/১৪। মামলা ২০১৭ সালের হলেও ওয়ারেন্টে ২০১৪ সালের বিচারকের স্বাক্ষর বিশ্বাসযোগ্য নয়। এছাড়াও ওয়ারেন্টে সংশ্লিষ্ট আদালতের সিল থাকার কথা থাকলেও এ ওয়ারেন্টে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সিল রয়েছে। পারিপাশির্^ক এসবকিছু বিবেচনায় বাদল মিয়ার বিরুদ্ধে জারি হওয়া কথিত ওয়ারেন্টটি ভুয়া বলে ধারণা করা হয়।

ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী মনোয়ার হোসেন জুয়েল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওয়ারেন্টে যে মামলার নম্বর উল্লেখ রয়েছে আমরা সেই নম্বর অনুযায়ী ঢাকার নয়টি নারী ও শিশু আদালতে তল্লাশি চালিয়ে এরকম কোনো মামলার অস্তিত্ব পাইনি। মামলায় যে বিচারকের স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে, সেই স্বাক্ষরটিও জাল। এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে ওয়ারেন্টটি সম্পূর্ণ ভুয়া।’

বাদল মিয়ার ছেলে রাকিবুল ইসলাম রাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাবাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশ ও স্থানীয় দালাল যৌথভাবে আমার বাবাকে হেয়প্রতিপন্ন ও আমাদের ছোট করার জন্যই এ কাজ করেছিল। আমার বাবাকে গ্রেপ্তার করার পর আমি নিজে ঢাকার সব শিশু আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে এ ধরনের কোনো মামলার অস্তিত্ব পাইনি। প্রত্যেকটা আদালতের সার্চিং সিøপ আমরা উত্তোলন করে এনেছি। আমার বাবাকে যারা ফাঁসিয়ে ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করিয়েছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে বাদল মিয়াকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করা এএসআই সাইফুল ইসলামের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়াও পুলিশের সোর্স সাইফুল ও ইলিয়াসের মোবাইল ফোনেও কল করে তাদের পাওয়া যায়নি।

আর বাদল মিয়াকে দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তার করা বরগুনা থানায় কর্মরত এএসআই নাঈমুর রহমান বলেন, ‘২০১৮ সালে বাদল মিয়ার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বরগুনা থানায় এসেছে। তখন আমি পিরোজপুরে কর্মরত ছিলাম। আমি বরগুনা থানায় যোগদান করেছি গত বছর ৬ নভেম্বর। সে হিসেবে আমি যোগদান করার দুই বছর আগেই বরগুনা থানায় বাদল মিয়ার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আসে। তাই আদালতের আদেশ অনুযায়ী বাদল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে আমি আইনানুগ প্রক্রিয়া অবলম্বন করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাদল মিয়া নিভৃত গ্রামের একজন মানুষ। তিনি বা তার পরিবারের কারও সঙ্গেই আমার কোনোরকম পরিচয় কিংবা যোগাযোগ ছিল না। শুধু গ্রেপ্তারের জন্যই তাকে আমি খুঁজেছি। এখানে আমার কোনো দোষ নেই। তিনি শুধু শুধুই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিচ্ছেন।’

অন্যদিকে বরগুনা সদর থানার ওসি কেএম তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘অন্যসব গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামির মতোই বাদল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করে পুলিশ। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এখানে পুলিশের কোনো দোষ নেই। কেননা সবক্ষেত্রে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয় না পুলিশের।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে বা যারা পুলিশের সঙ্গে প্রতারণা করে একজন নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করেছেন, তাদের খুঁজে বের করতে ইতিমধ্যে আমরা অনুসন্ধান শুরু করেছি। শিগগির তাদের আমরা আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হব।’