শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনুন

করোনা মহামারী মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টা ও সাফল্য প্রশংসিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিসরেও। বৈশি^ক এই মহামারীতে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ঝুঁকিও ছিল মারাত্মক। কিন্তু মহামারীর নেতিবাচক অভিঘাত থেকে দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে সরকার ঘোষিত সোয়া লাখ কোটি টাকারও বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ অত্যন্ত সময়োচিত পদক্ষেপ হিসেবে দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের এসব পদক্ষেপের ফলও ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু করোনা মহামারীর শুরু থেকে দেশের শিক্ষা খাতে যে বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে তা যেন কেবল উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পাচ্ছে। অথচ শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ শিক্ষাবিদরা আশা করেছিলেন যে, করোনাকালে শিক্ষায় সরকারের বিশেষ মনোযোগ থাকবে এবং শিক্ষার্থীরা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় শিক্ষাবর্ষ না হারিয়েই মহামারীর প্রভাব সামলে উঠতে পারবে। বলা বাহুল্য, সেটা তো হয়ই-নি বরং শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা।

দেশে করোনা শনাক্তের পরপরই গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। দফায় দফায় সেই ছুটি বাড়াতে বাড়াতে শিক্ষাবর্ষ শেষ হয়ে গেলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো ছুটি চলছে। অন্যদিকে, সাধারণ ছুটিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের শারীরিক উপস্থিতি বন্ধ থাকলেও প্রথমে শুরু হয় অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষা। এরপর গত শিক্ষাবর্ষের এইচএসসিতে দেওয়া হলো ‘অটো পাস’। আর পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের শেষ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়। কিন্তু বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয় নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় আবাসিক হল বন্ধ রেখেই এসব পরীক্ষা গ্রহণ শুরু করায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে এবং অবিলম্বে তারা সব বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার দাবি জানায়। এরই এক পর্যায়ে গত কয়েক দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলের তালা ভেঙে হলগুলোতে অবস্থান নেয়। অবশ্য প্রশাসনের অনড় অবস্থানের কাছে শিক্ষার্থীরা পিছু হটে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দ্রুত হল ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ঘোষণা দেন যে, আগামী ১৭ মে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হল খুলে দেওয়া হবে এবং ২৪ মে থেকে ক্লাসসহ নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে। অবশ্য এর আগে শিক্ষার্থীদের করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়া হবে বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী। কিন্তু এভাবেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি শিক্ষামন্ত্রী।     

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা বা বন্ধ এমনকি পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে শিক্ষা প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দিতে না পারার জেরে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে নামে রাজপথে। এই জটিলতার সূত্রপাত হল বন্ধ রেখে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া। মেসে বা ভাড়া বাড়িতে থেকে পরীক্ষা দেওয়ার চাপ সামলাতে না পারার কারণেই এই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। কিন্তু আবাসিক হল খোলার আন্দোলনে চাপে পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তড়িঘড়ি করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চলতে থাকা পরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দিলে শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে ঢাকার রাজপথ অবরোধ করে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আবারও অবস্থান পাল্টে ঘোষণা দেয় যেএই সাত কলেজের পরীক্ষা চলবে, কিন্তু অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার পরীক্ষার দাবিতে সড়ক অবরোধ করা রাজধানীর গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে পুলিশ। একই দিনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মার্চের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে চলমান পরীক্ষাগুলোর নতুন রুটিন প্রকাশ এবং পুলিশের হাতে আটক শিক্ষার্থীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নামে। রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে অন্তত ১০ শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। শিক্ষা প্রশাসনের একেকবার একেক রকম সিদ্ধান্ত দিয়ে এভাবে তালগোল পাকিয়ে ফেলে শিক্ষার্থীদের রাজপথে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। 

শিক্ষাবিদরা বলছেন, গোটা শিক্ষা পরিবারে দেশের সাড়ে ছয় কোটি মানুষ যুক্ত। সিদ্ধান্ত যেটা যখনই নেওয়া হোক না কেন, সেটা ভেবেচিন্তেই নেওয়া উচিত। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান, ‘যেটা ভালো সেটাই করা হয়েছে’ বলে যে মন্তব্য করেছেন সেটা অবশ্যই দায়সারা। কেউ কেউ বলছেন, ‘সরকার উভয় সংকটে রয়েছে। খুলে দিলেও অনেক হিসাবনিকাশ করতে হচ্ছে। আবার না খুললেও চাপ তৈরি হচ্ছে।’ কিন্তু কথা হচ্ছে প্রায় এক বছরেও এ বিষয়ে কোনো শিক্ষা প্রশাসন কেন নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে সম্মিলিতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারল না? এভাবে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চলমান পরীক্ষা স্থগিত করে আবারও সেশনজটে ফেলে দিল সরকার। এছাড়া নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এলেও পরীক্ষা আটকে থাকায় এসব নিয়োগ পরীক্ষাতেও অংশ নেওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হবে শিক্ষার্থীদের। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখন উচিত হবে দ্রুততার সঙ্গে একটি চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে আগেভাগেই সেটা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জানিয়ে দেওয়া।