চর পড়ে শঙ্খ নদের অস্তিত্ব বিপন্ন

দক্ষিণ চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খরস্রোতা শঙ্খ নদ আজ মৃতপ্রায়। নাব্য হারিয়ে নদটি এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। শঙ্খের বুকে ও দু’পাশে চর পড়ে খালে রূপ নিয়েছে নদটি। এতে শুকনো মৌসুমে নৌ-চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অথচ এককালে এটি ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতির প্রাণ সঞ্চালক। এক সময় নৌপথে যাতায়াত ছাড়াও পণ্য নিয়ে বড় বড় নৌকা ও লঞ্চ চলত শঙ্খ নদ দিয়ে। আশির দশকেও এই নদ দিয়ে চট্টগ্রাম নগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলত নৌযান।

বাংলাদেশ ও আরাকান রাজ্যের মধ্যবর্তী পার্বত্য অঞ্চল আরাকানের মদক পাহাড় থেকে শঙ্খ নদের উৎপত্তি। সর্পিলাকার ১৯৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই নদ বান্দরবান হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা-বাঁশখালীর সীমান্ত দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে। বিভিন্ন কারণে শঙ্খ দিন দিন আরও বেশি বিপন্ন হচ্ছে। এতে করে শঙ্খের তীরবর্তী এলাকাগুলোতে আবাদি জমি থাকলেও পানির অভাবে ফসল ফলাতে পারছেন না কৃষকরা। আর যেসব কৃষক চাষাবাদ করছেন তাদের ফলনও আশানুরূপ হচ্ছে না। এ কারণে আবাদি জমিগুলোও এখন অনাবাদি হয়ে পড়ছে। অবস্থার পরিবর্তন না হলে আগামী কয়েক দশকে তলদেশ ভরাট হয়ে নদটি পুরোপুরি নাব্য হারিয়ে ফেলবে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরেজমিন স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শঙ্খ নদের আনোয়ারা ও বাঁশখালী অংশের ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ১৫টি স্থানে চর জেগেছে। এর মধ্যে আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর, বারখাইন, কানু মাঝির হাট, পঙ্খীর চর, চর জুঁইদন্ডী ও বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম বরুমচড়া, বৈলগাঁও এবং চমকারদিয়ার চর এলাকায় বিশাল বিশাল চর জেগেছে।

আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরও চর পড়ে শঙ্খের গতি একেবারে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা। শঙ্খ নদের তৈলারদ্বীপ অংশ থেকে শঙ্খের মোহনা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার খনন করা হলে নদটি আবারও গতিশীল হবে বলে মনে করেন তারা।

জুঁইদন্ডী গ্রামের শঙ্খপাড়ের বাসিন্দা আবদুল গফুর বলেন, ১৯৯১ সালের ভয়াবহ বন্যার আগে শঙ্খ নদে প্রচন্ড স্রোত ছিল, নদটিও ছিল খুব গভীর। বন্যার পর থেকে শঙ্খ নদে চর পড়া বৃদ্ধি পায়। আর সেখানে মাছের ঘেরসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ শুরু হয়। গত পাঁচ বছরের মধ্যে অতিরিক্ত চর পড়ে নদ সরু হয়ে গেছে।

দক্ষিণ বরুমচড়া-কানু মাঝির ঘাটের মাঝি খুইল্যা মিয়া জানান, ১০ বছর আগেও শঙ্খের এপার থেকে ওপারে নৌকা নিয়ে যেতে হলে স্রোতের কারণে অনেক ভাটিতে গিয়ে নৌকা থামাতে হতো। এখন সোজা গিয়ে নদ পার হওয়া যায়। বছরের অর্ধেক সময় শঙ্খ নদে পানি কম থাকে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বালু ও পলি চলে আসায় শঙ্খ নদ ভরাট হচ্ছে। এ কারণে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় শঙ্খ নদে পানিপ্রবাহ কমে গেছে। নদটি নাব্য হারিয়ে ফেললেও এটি খননে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

পাউবো চট্টগ্রাম পওর বিভাগ-১-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম দাশ বলেন, শঙ্খ নদে চর পড়ায় অনেকটা নাব্য হারিয়ে ফেলছে। শুকনো মৌসুমে এমন রূপ পায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে শঙ্খ নদ খননে আপাতত আমাদের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই।

চট্টগ্রামের ইতিহাস গবেষক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘নদীর সঙ্গে এ দেশের মানুষের কৃষি, জীবনযাপন, জীবিকা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক। তাই নদীবিহীন বাংলাদেশ কল্পনা করা যায় না। শঙ্খ নদ দেশের প্রধান নদনদীগুলোর অন্যতম। এটিকে খননের মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।’