‘বিশ্বকাপ জেতার জন্য নিজেকে এখনো ধরে রেখেছি’

২০১৯ বিশ্বকাপের পর পাকিস্তান দলে জায়গা হারান মোহাম্মদ হাফিজ। অনেকেই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু ২০২০ এ আবার ডাক পেলেন সতীর্থদের কাছে ‘প্রফেসর’ নামে পরিচিত এই অলরাউন্ডার। এবার যেন নতুন আবির্ভাব তার। ৪০ বছর বয়সেও একেজন তরুণের মতো মারকাট ব্যাটিং করে চলেছেন। টি-টোয়েন্টিতে পাকিস্তানকে বদলে দিয়েছেন একদম। তাই গত এক বছরে টি-টোয়েন্টির সেরা ব্যাটসম্যান হাফিজ। এক বর্ষপঞ্জিতে ৮৩ গড় ও ১৫২ স্ট্রাইক রেটে ১০ ম্যাচে সর্বোচ্চ ৪১৫ রান তার। ১ জানুয়ারি-৩১ ডিসেম্বর, ২০২০ সময়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ ২০টি ছক্কা তার ব্যাটে। সর্বোচ্চ ২২টি কাতারের কামরান খানের ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২১টি কুইন্টন ডি ককের। ক্রিকইনফোর ক্রিকেট মান্থলির মুখোমুখি হয়ে এমন বদলে ফেরার রহস্য জানালেন হাফিজ। সঙ্গে আরও বিষয় নিয়ে খোলামেলা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন- 

২০১৯ বিশ্বকাপের পর বাদ পড়েছিলেন। এরপর গত বছর ডাক পেলেন। বাদ পড়ার পর ক্যারিয়ার শেষ ভেবে নিয়েছিলেন কিনা?

মোহাম্মদ হাফিজ : মোটেও না, পাকিস্তানের হয়ে সবশেষ বিশ্বকাপে আমি মনে করি খুব ভালো পারফরম করেছি। টুর্নামেন্টে আমি ৪ নম্বরে খেলি, আমার দায়িত্ব ছিল ভালো শুরু পেলে তা ধরে রাখা নয়তো বাজে সময় কাটিয়ে আসা। আমি নিজের দায়িত্বটা ঠিকঠাক করেছি। অনেকেই মনে করেছে ২৫ বলে ২৫ করে আউট হয়ে আমি উইকেট দিয়ে এসেছি কিন্তু না এটাই আমার দায়িত্ব ছিল।

গত বছরটা আপনার জন্য একরকম রেকর্ড গড়া বছর। পাকিস্তান ক্রিকেটে পাওয়ার হিটিংয়ের নতুন দিগন্ত খুলেছেন। এক বর্ষপঞ্জিতে সবচেয়ে বেশি ছক্কা মেরেছেন। এটা কীভাবে সম্ভব হলো?

হাফিজ : গত তিন-চার বছরে টি-টোয়েন্টিতে পাওয়ার হিটিংয়ের খুব গুরুত্ব দেখলাম। আমার মনে হলো এটাতে আমার মানিয়ে নেওয়া উচিত। তাই আমি পাওয়ার হিটিং স্কিল নিয়ে কাজ শুরু করলাম ২০১৯ সালের পর থেকে। আসলে ২০২০ সিপিএল আমাকে ভালো হিটার হতে সাহায্য করেছে। দেখলাম উইন্ডিজ ব্যাটসম্যানরা ভালো পাওয়ার হিটার। জানতে চেষ্টা করলাম কীভাবে তারা এত ভালো হিটার। দেখলাম তারা অনুশীলনে শুধু ছক্কা মারার প্র্যাকটিস করে। টেকনিক বা অন্য কিছু না ভেবে ৫০-১০০ বল শুধু ছক্কা মারার চেষ্টা করে। ক্রিস গেইল, এভিন লুইস সবাইকে দেখলাম এটাই করছে। এখন থেকে আমি একটা ধারণা পাই এবং এই অনুশীলনটা শুরু করি। দেখলাম অনুশীলনে ব্যাপারটায় অভ্যস্ত হলে ম্যাচে ছক্কা মারা খুব সহজ। পরে ম্যাচেও সফল হলাম।  

আইপিএলে খেলতে না পারা পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিছিয়ে দিচ্ছে কি?

হাফিজ : এটা ঠিক আইপিএল যে কোনো ক্রিকেটারের উন্নতির জন্য একটা ভালো আসর। কিন্তু এটাই সব না। বিশ্বের যে কোনো লিগেই কিন্তু এখন দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। সিপিএল, বিপিএল বা বিগ ব্যাশ। আইপিএলে হয়তো সব ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পায় এবং সেরা মানটা আসে। কিন্তু এটাই ভালো করার একমাত্র কারণ না। তাহলে দেখুন আইপিএল না খেলেই পাকিস্তান কীভাবে টি-টোয়েন্টিতে র‌্যাংকিং সেরা? এটাই সব স্পষ্ট করে দেয়।

ক্যারিয়ারে পাকিস্তান দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ১৭ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনেক ভূমিকায় দেখা গেছে। দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। একজন ক্রিকেটারের দায়িত্ব বারবার পরিবর্তন হলে তার উন্নতি কতটা বাধাগ্রস্ত হয়?

হাফিজ : বিভিন্ন ক্রিকেটারকে বিভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমার অভিজ্ঞতা বলছে ভালো ব্যাটসম্যান বা ভালো বোলার হওয়া এক বিষয়। কিন্তু এটাই আপনাকে সেরা ক্রিকেটার করে দেবে না। কঠিন পরিশ্রম করা একটা বিষয়, ধারাবাহিকতা একটা বিষয়। এই সব বিষয় মিলেই কিন্তু একজন সেরা ক্রিকেটার। কিন্তু আমাদের এখানে (পাকিস্তান) কেউ একজন ভালো ছক্কা মারলেই তাকে প্রতিভা বলা হয়, ভালো সুইং করালে প্রতিভা বলা হয়। এবং তারাই দলে থাকে। আমি নিজে এই রকম পরিস্থিতিতে পড়েছি। এখানে এমনও হয় যে, কেউ নিজে না পারলে পিচ বা কোচের দোষ দিই । পরে আমি অনুধাবন করলাম ২০০৩ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত খেলেছি। এখনো যদি দলে জায়গা পাকা না করতে পারি তবে এটা আমারই ব্যর্থতা। এখান থেকেই আমি শিক্ষা নিয়েছি এবং এই পর্যায়ে এসেছি। আসলে বিভিন্ন দায়িত্বে আমার কোনো সমস্যা কখনই ছিল না। 

এখন আপনার ৪০ বছর, কীভাবে নিজেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টিকিয়ে রাখছেন?

হাফিজ : সত্যি বলতে, আমি পাকিস্তানের হয়ে অনেক কিছুই জিতেছি। কিন্তু আফসোস, দেশের হয়ে বিশ্বকাপজয়ী দলে আমার নাম নেই। এটাই আমাকে এখনো ক্ষুধার্ত রেখেছে। বিশ্বকাপজয়ী দলের অংশ হওয়ার জন্য আমি নিজেকে এখনো ধরে রেখেছি।

পাকিস্তান ক্রিকেটের কোনো কিছু বদল করতে হলে কী করবেন?

উত্তর : আসলে আমি এখনো এই রকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে আসিনি। তাই বলতে পারছি না। তবে একটা বিষয় বলতে পারি আমি চাই খেলার সুযোগ আরও বাড়াতে। যেন তরুণরা ঘরোয়া ক্রিকেটে আরও খেলতে পারে, নিজেদের চ্যালেঞ্জ ছুড়তে পারে এবং প্রতিযোগিতা করতে পারে। তাদের খেলার সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়িয়ে দিতে চাইব।