নিও-নরমাল ও অভিযোজিত স্থাপত্য চর্চা

স্থাপত্য চর্চা কিংবা নগরায়ণ যে কথাই বলি না কেন, এই বিষয়টির সঙ্গে এবং এই পেশায় জড়িত সবাইকে নতুন আরেকটি বিষয় নিয়ে ভীষণভাবে ভাবতে হচ্ছে। সেটি হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা। সহজভাবে বললে যাদের জন্য এই স্থাপত্য চর্চা কিংবা নগরায়ণের বিকাশ, সেই আপামর জনসাধারণের প্রাত্যহিক জীবনযাপনে প্রকৃতি ও পরিবেশের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। চলমান এই বৈশি^ক মহামারীর সময়কাল আমাদের স্থাপত্য চর্চার চিন্তার বিকাশকে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছে।

করোনাভাইরাস থেকে সৃষ্ট কভিড-১৯ রোগটি সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত করে আমাদের শ্বাসতন্ত্রকে। এখন বিশ^জুড়েই করোনার বিভিন্ন ধরনের প্রতিষেধক টিকাদানের কাজ চলছে। তবুও সমগ্র মানবজাতির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখনো এই ভাইরাসের কারণে ব্যাহত হচ্ছে। মানুষ তাই শিখছে এই পরিস্থিতির ‘নিও নরমাল’ বা ‘নতুন স্বাভাবিক’ জীবনযাপনের কৌশল।

এখনো কোনো কোনো দেশের বিভিন্ন জায়গায় লকডাউন রয়েছে। এই বিশাল জনসংখ্যার কোনো একটি বড় অংশকে হঠাৎ করেই তাদের দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাসটি পরিবর্তন করতে হয়েছে এই মহামারী থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য। মানুষকে ভ্রমণের রুটিন থেকে শুরু করে খেলাধুলা আর জীবনযাপনের সহায়ক বিভিন্ন কাজের পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হয়েছে। নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হচ্ছে জীবনের প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই। কিন্তু এর মধ্যেও মানুষের জীবনযাত্রা থেমে নেই।

আমরা যদি গ্রামের দিকে একটু লক্ষ করি, সহজেই দেখতে পাব সেইসব জায়গাতে মানুষের মধ্যে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসটির বিষয়ে তেমন কোনো সচেতনতা প্রবল পরিমাণে নেই। বিশেষ করে শহরের সঙ্গে তুলনা করলে সেটি বলাই যায়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা এখনো অব্যাহত। তাছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ার কারণে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের পক্ষেই একজনের কাছ থেকে আরেকজনের নির্দিষ্ট শারীরিক দূরত্ব সবসময়ে বজায় রাখা কঠিন। সেটা যেমন কর্মক্ষেত্রে তেমনি পারিবারিক আবাসিক পরিসরেও না। এ কারণে আমরা আমাদের আবাসন থেকে শুরু করে অফিস কিংবা যেকোনো ধরনের স্থাপনায় সবক্ষেত্রে কভিড-১৯ এর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারছি না। অধিক জনসংখ্যা এবং ঘনত্ব মূলত এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

সাম্প্রতিক গবেষণায় এটি এখন প্রতিষ্ঠিত যে চলমান এই কভিড মহামারীর জীবাণু সাধারণত বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ায়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা এবং গবেষকরা যে কোনো স্থাপনার অভ্যন্তরীণ ‘অ্যারোসল এক্সপোজার’-এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন এবং দিয়ে চলছেন। প্রতিদিন আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন নতুন আরও তথ্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বাইরে থেকে যখন বায়ুপ্রবাহ একটি আবাসস্থল কিংবা স্থাপনার মধ্যে আসবে সেটিকে কীভাবে পরিশোধিত করা যায়? যেখানে রোগ-জীবাণুর বিস্তার ঘটানো রোধ করা সম্ভব। শুধুমাত্র কভিড মহামারীর জন্যই এই চিন্তাটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। অন্যান্য সংক্রামক রোগের জন্যও এটা সমানভাবে প্রযোজ্য। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে যেখানে বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ অত্যধিক পরিমাণ বেশি এবং বায়ুদূষণের মাত্রা প্রকট। তাই বাতাস পরিশোধনের চিন্তাভাবনাগুলো এখন প্রবলভাবে গবেষকদের নাড়া দিচ্ছে। তাই এখন স্থাপত্য চর্চা বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য হলো বিশ্বব্যাপী এই মহামারীর পরিণতি থেকে কীভাবে মানব সভ্যতাকে রক্ষা করা যায়। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থানীয় এবং স্থিতিশীল প্রযুক্তি দিয়ে। এজন্য আমাদের একটি সঠিক ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন।

এই রোডম্যাপ অবশ্যই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কেইস স্টাডি কিংবা বিল্ডিং অ্যাপ্লিকেশন এবং কাঠামোগত ধারণার মাধ্যমে আসতে পারে। যেখানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চলাফেরার রীতিনীতি কিংবা অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ বিশ্বজুড়ে চলমান এই মহামারী পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে এবং সাধারণ জীবনযাপন পুনরুদ্ধার করতে হলে আমাদের সবার আগে জানতে হবে আমরা যে স্থানে বসবাস করছি সেই স্থানটিকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়? আর এই ক্ষেত্রেই অভিযোজিত স্থাপত্য চর্চার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটি নতুন কোনো স্থাপনার ক্ষেত্রেও হতে পারে কিংবা পুরাতন স্থাপনার ক্ষেত্রেও হতে পারে।

এসব কারণে এখন ধরেই নেওয়া হচ্ছে করোনা সময়কালের কিংবা এর পরবর্তী সময়ে স্থাপত্য চর্চায় বিশেষ একটি পরিবর্তন আসবে। তবে পরিবর্তনটি কীভাবে বর্তমান জীবনযাপনের সঙ্গে অভিযোজিত হবে সেই নিয়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন। যা নিয়ে এখন অনেক ধরনের প্রায়োগিক গবেষণা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে আমাদের দেশের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে এই গবেষণার ব্যাপকতা আরও বেশি অংশে বাড়াতে হবে। বিশেষ করে যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। সুতরাং এদেশের স্থাপত্য চর্চা নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে করোনা পরবর্তী সময়ের জন্য।

স্থাপত্যের এই নতুন অভিযোজনের জন্য বসবাসের জায়গাগুলোর সঙ্গে মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতে হবে। আমাদের ভাবতে হবে অল্প জায়গায় কীভাবে বসবাসের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করলে একদিকে যেমন সোশ্যাল আইসোলেশনের বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে, ঠিক তেমনি মানুষ ঘরে বসে বাইরের কাজ করতে পারবে এবং শারীরিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে পারবে। যেহেতু বায়ুদূষণ আমাদের একটি প্রধান সমস্যা এই সমস্যাকে বাস্তবিক চিন্তার ভিত্তিতে কীভাবে সমাধান করা যায়, বিশেষ করে স্থাপনায় অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সৃষ্টিতে এই বিষয়টি নিয়ে সামগ্রিকভাবে গঠনমূলক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

এটি সর্বজনগ্রাহ্য যে, আমরা যে স্থানে বসবাস করি তার চারপাশে অনেক ধরনের মাইক্রো ব্যাকটেরিয়া-জীবাণু জন্ম নেয় কিংবা সবসময় বিদ্যমান থাকে, এ কথা বললেও ভুল হবে না। এমনকি আমরা দৈনন্দিন জীবনে আমাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন জীবাণুর সংক্রমণের হার আরও বাড়িয়ে দিচ্ছি। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য এটি ক্ষতিকর কি না? আর কীভাবে বসবাসের জায়গায় এই ধরনের মাইক্রো ব্যাকটেরিয়া মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করে? বর্তমানে পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বর্তমানের করোনাভাইরাসের কথা। যার প্রভাব আমরা প্রতিনিয়তই অনুভব করছি। তাই আমাদের অবস্থানগত পরিবেশে জীবাণুর বিস্তার প্রতিরোধে স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীদের কোনো কিছু করার আছে কি না এসব বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। বিশেষ করে আমাদের এমন কিছু প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে কিংবা উদ্ভাবন করতে হবে যা সহজে আমাদের বসবাসের জায়গাগুলোতে জীবন ধ্বংসকারী জীবাণু থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবে। তবে সেই প্রযুক্তিগুলো অবশ্যই সহজলভ্য হতে হবে। তাছাড়া কী কী জীবাণু আমাদের বসবাসের চারপাশে থাকতে পারে সেগুলো সম্পর্কে আমাদের জানা প্রয়োজন। এটা শুধুমাত্র আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই নয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যও জরুরি।

বিশেষ করে কভিড-১৯ মহামারীর ক্ষেত্রে জনসাধারণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য ভবনগুলোকে অবশ্যই শক্তি সাশ্রয়ী করা এবং একইসঙ্গে জলবায়ু সংকটকে মোকাবিলা করার মতো করে গড়ে তুলতে হবে। এমন গুরুত্বপূর্ণ সমাধানের দিকে যেতে হবে খুব অচিরেই। আইএ’র অনুমান অনুযায়ী আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে এই টেকসই ভবনগুলো প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে। যা শুধু পরিবারগুলোর জন্যই নয় সরকার এবং একটি দেশের জন্য আর্থসামাজিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি উভয় ক্ষেত্রেই যেকোনো ভবনের জন্য আরও কীভাবে শক্তি সাশ্রয়ী এবং স্বাস্থ্যবান্ধব প্রযুক্তি উন্নয়ন করা সম্ভব সেই বিষয়গুলো নিয়ে স্থানীয়ভাবে আমাদের ভাবতে হবে। এভাবে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এবং স্থাপত্য চর্চার ক্ষেত্রে অভিযোজিত বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আমরা বিভিন্নভাবে স্থাপত্য চর্চা করি কিংবা বিভিন্ন নতুন নতুন আইডিয়া দিই কোনো মূল গবেষণা ছাড়াই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সেসব আইডিয়া আমরা বাস্তবায়নও করতে পারি না। যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো সমাধান জনবান্ধব হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সেগুলো বাস্তবায়ন করা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য হবে এটিই স্বাভাবিক। তাই এই মুহূর্তে আমাদের জন্য অবশ্যই বাস্তবায়নযোগ্য এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যা হতে হবে জনবান্ধব, স্বাস্থ্যবান্ধব এবং যা সাধারণ মানুষদের সঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহারকে অধিক গুরুত্ব দেবে। বিশেষ করে স্থাপনা নির্মাণ বিধিমালাতে স্থাপত্য চর্চার অভিযোজনের এইসব বিষয়কে অধিক গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে সংযোজিত করাই হবে সবার জন্য মঙ্গল। কারণ সময়ের পরিক্রমায় এই পরিবর্তনগুলো আমরা যত তাড়াতাড়ি গ্রহণ করতে পারব ততই আমাদের জন্য ভালো।

লেখক সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণারত।

sajal_c@yahoo.com