পৃথিবীর অতি বুদ্ধিমান পাখি কাক। পবিত্র কোরআনে কাকের বুদ্ধিমত্তার কথা স্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে। আদম (আ.)-এর সন্তান কাবিলকে আল্লাহ একটি ছোট কাকের মাধ্যমে দাফনের পদ্ধতি শিক্ষা দেন। সেই ঘটনায় সাধারণ কোনো পাখির কথা উল্লেখ না করে সুনির্দিষ্টভাবে কাকের কথা উল্লেখ করা থেকে বোঝা যায়, অন্য পাখির তুলনায় কাকের বুদ্ধিমত্তা বেশি। আধুনিক গবেষণায়ও অন্য পাখির তুলনায় কাকের বুদ্ধিমত্তার কথা প্রমাণিত হয়েছে।
আদম (আ.)-এর সন্তান কাবিল কর্তৃক হাবিলকে হত্যার ঘটনা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বপ্রথম হত্যাকা-। এই ঘটনার আগে কোনো মৃত্যুর ঘটনা না ঘটার কারণে কাবিল জানতেন না কীভাবে মৃতদেহ দাফন করতে হয়। তাই তাকে দাফনের পদ্ধতি শেখানোর জন্য আল্লাহ একটি কাক পাঠান। সেই ঘটনার অবতারণা করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এরপর তার আত্মা তাকে ভ্রাতৃহত্যায় প্ররোচিত করল। তাই সে তাকে হত্যা করল এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দলে অন্তর্ভুক্ত হলো। তারপর আল্লাহ একটি কাক পাঠালেন। সেই কাক মাটি খুঁড়তে লাগল, সে ভাইয়ের লাশ কীভাবে গোপন করবে তা দেখানোর জন্য। সে বলল, ধিক আমাকে! আমি এই কাকের মতোও হতে পারলাম না, যাতে ভাইয়ের লাশ গোপন করতে পারি। এই বলে সে অনুতাপ করতে লাগল। (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৩০-৩১)
‘দি সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশিত কানাডার ভার্মন্ট বিশ^বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী বার্ন্ড হেনরিচ এবং স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রোস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী থমাস বুগনিয়ারের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, কাকের ব্যতিক্রমী মানসিক দক্ষতা রয়েছে। কাক যুক্তি ব্যবহার করে সমস্যা সমাধান করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের বুদ্ধিমত্তা বানরকেও ছাড়িয়ে যায়। গবেষণার ক্ষেত্রে কাক আগে করেনি এমন কিছু জটিল কাজ তাকে দেওয়া হয়েছিল। তবুও সমস্যার সৃজনশীল ও যৌক্তিক সমাধান খুঁজে বের করতে তারা বারবার সফল হয়েছে। এটুকুই নয়, বরং কোনো রকম ভুল ছাড়াই প্রথম প্রচেষ্টাই তারা সফল হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখানো হয়, কাক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য সমাধান যাচাই, কার্যকর সমাধান নির্বাচন এবং প্রথমবারেই নির্ভুল প্রয়োগ করার ক্ষমতা রাখে যা অনেক সময় সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীও করতে পারে না।
একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, কাক মাছ ধরার জন্য একখন্ড সোজা তার ব্যবহার করে একটি ফাঁদ বা বড়শি তৈরি করেছে। অন্য একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, একটি লম্বা নলের ভেতরে অল্প একটু পানিতে খাবার ভাসমান আছে, কাকটি প্রথমে চঞ্চুর সাহায্যে নলের গভীরতা পরিমাপ করল, এরপর এটি পানির উচ্চতা যথেষ্ট পরিমাণ বাড়িয়ে খাবার তার চঞ্চুর নাগালে আনতে একেবারে নির্ভুল সংখ্যক ছোট ছোট নুড়ি পাথর ফেলল।
এই পরীক্ষার ভিডিওটি দেখে আমি (লেখক) নিজেই মানুষের মধ্যে একটা ছোট পরিসরে পরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নিই। বিভিন্ন বয়সের মানুষের সামনে ভিডিওটি প্লে করলাম এবং কাকের বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান শো করার আগেই তা অফ করে দর্শকদের কাছে জানতে চাইলাম, ‘কাকের স্থানে আপনি হলে কী করতেন?’ সবার উত্তর ছিল, ‘নলটি ধীরে ধীরে উপুড় করে খাবারসহ পানি বের করার সময় খাবারটি খপ করে ধরে ফেলব।’ কিন্তু তারা যখন দেখল, কাক পানি ফেলে দেওয়ার সহজ পদ্ধতি ব্যবহার করেনি, বরং পানি অপচয় করে পরিবেশের কোনো ধরনের ক্ষতিসাধন ছাড়াই খাবারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে, তখন তারা মুগ্ধ ও বিনীত হলো যেমনটি করেছিল আদম (আ.)-এর পুত্র কাবিল।
জাপানের একটি সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, কাকের পক্ষে সাধারণভাবে খোলা সম্ভব নয় এমন শক্ত খোলসের বাদাম তারা প্রথমে উঁচু গাছ থেকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে ভাঙত এবং পরে সেগুলো খেত। এরপর তারা দ্রুতগতির গাড়ি চলাচলের রাস্তায় বাদামগুলো ছুঁড়ে ফেলত, যা আগের চেয়েও কম সময়ে ভেঙে যেত। দ্রুতগতির যানবাহনের ঝুঁকি এড়াতে তারা সেই পদ্ধতিতে আরও পরিবর্তন আনলো। গাড়িগুলো থামানোর জন্য তারা ট্রাফিক লাইট লাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে শেখলো। এরপর লাইটের দিকে দৃষ্টি রেখে তারা গাছের ডাল থেকে দ্রুততার সঙ্গে খাবার ছিনিয়ে নেমে আসত এবং যত দ্রুত সম্ভব লাইট পরিবর্তন হওয়ার আগেই নিরাপদে উড়ে যেত।
কাকের সামাজিক বুদ্ধিমত্তাও দেখার মতো। তারা শিকারকে ফাঁদে ফেলে হত্যা করার জন্য দলগঠন করতে সক্ষম। দলের দুটি কাক শিকারের পালানোর পথ বন্ধ করার জন্য মাটিতে উড়ে বেড়ায় আর বাকিরা আক্রমণে অংশ নেয়। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বলেন, এই আচরণ থেকে ধারণা করা যায়, তারা একে অপরের এবং টার্গেট প্রাণীর মনস্তত্ত্ব বুঝতে সক্ষম, যেটি ‘থিউরি অব মাইন্ড’ নামে পরিচিত। এমনকি তারা পরীক্ষার সময় তাদের দেওয়া সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্যও দল গঠন করতে পারে। আয়নায় নিজেকে শনাক্ত করার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে।
তাদের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার আরেকটি পরিচয় হলো, তারা মরুভূমি কী পাহাড়, পৃথিবীর সবধরনের আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। কঠিনতম মুহূর্তেও তারা খাবার খুঁজতে পারে। তারা যেতে পারে না এমন জায়গাতেও, কখন কীভাবে কোন প্রাণীকে ব্যবহার করে খাবার আনতে হয়, তাও তাদের আয়ত্তে রয়েছে। জীববিজ্ঞানী থমাস বুগনিয়ার বলেন, ‘বুদ্ধিমত্তা বিবেচনায় কাক দুই বছরের বাচ্চার সমান।’
কাক সামাজিক জীবনকে বেশ গুরুত্ব দেয়। তাদের রয়েছে বৃহত্তর সংঘবদ্ধ জীবনযাপন। তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সাময়িক ঠুকরাঠুকরি হলেও কখনো মরণপণ লড়াইয়ে প্রবৃত্ত হয় না। তারা একমাত্র তাদের পরিবারের জন্য বিপজ্জনক শত্রুর বিরুদ্ধেই মরণপণ লড়াই করে।
প্রশ্ন জাগতে পারে, অন্য পাখিরাও তো কাকের চেয়ে কম বুদ্ধি নিয়ে সুন্দর জীবনযাপন করছে। তাহলে কাককে এত বুদ্ধিমত্তা দানের কারণ কী হতে পারে? তার উত্তরে বলতে চাই, পবিত্র কোরআন বুদ্ধিমান পাখি কাককে মানুষের পরামর্শদাতা হিসেবে দেখিয়ে জ্ঞানের এক বিশাল দরজা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। কাক পরিবেশের প্রতি সম্মান দেখিয়ে যৌক্তিক চিন্তা, সৃজনশীল সমস্যা সমাধান, কৌশলগত পরিকল্পনা, দলবদ্ধভাবে কাজ করা এবং কার্যকর সম্পদ ব্যবস্থাপনার ভালো প্রশিক্ষক। মানুষে মানুষে খুনোখুনিতে লিপ্ত
রক্তখেকোদের জন্যও কাকের জীবনে রয়েছে বিরাট শিক্ষা।
লেখক : মিসরের ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক। ‘অ্যাবাউট ইসলাম’ থেকে প্রবন্ধটির সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন আসরারুল হক