বর্তমানে মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে পুঁজিবাজারে তারল্য সরবরাহ বাড়াতে কালো টাকা বিনিয়োগে আরও কর সুবিধা চেয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য মাত্র ৫ শতাংশ কর দিয়ে পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ চেয়েছে দেশের প্রধান এই পুঁজিবাজার। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করহারের ব্যবধান ১৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জটি। গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় পুঁজিবাজারের জন্য এমন প্রস্তাব দিয়েছে ডিএসই।
কালো টাকা ৫ শতাংশ কর দিয়ে পুঁজিবাজারে একই ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তাব বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনও (বিএমবিএ) দিয়েছে। আর সাধারণ বীমা কোম্পানির প্রায় ৩৫ শতাংশ ও জীবন বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ করপোরেট কর দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)। গতকাল এনবিআর সম্মেলন কক্ষে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, মার্চেন্ট ব্যাংক, ডিএসই ও সিএসই প্রতিনিধিরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের পক্ষে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।
কর আওতার বাইরে থাকা কালো টাকা অর্থনীতির মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে ১০ শতাংশ কর দিয়ে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। এই সুবিধার আওতায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগ হয়েছে ২২৮ কোটি টাকা। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করতে এই সুযোগ নিয়েছেন ২০৫ জন ব্যক্তি। এতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ২২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ অব্যাহত থাকবে। কালো টাকা বিনিয়োগের এই বিশেষ সুযোগ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের ৩০ জুন করার প্রস্তাব দিয়েছে ডিএসই ও বিএমবিএ। একই সঙ্গে কালো টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান কর হার ১০ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে তারা। এই সুবিধা দেওয়া হলে করের বাইরে থাকা অপ্রদর্শিত অর্থ অর্থনীতির মূলধারায় ফিরে আসার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।
আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআরে পুঁজিবাজারের জন্য ১১ প্রস্তাব দিয়েছে ডিএসই। এর মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎসে কর কর্তনের হার কমিয়ে আনা, বন্ড থেকে প্রাপ্ত সুদের ওপর কর অব্যাহতি, করমুক্ত লভ্যাংশের আয়ের সীমা বাড়ানো, তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া স্বল্প মূলধনী কোম্পানির লেনদেনের জন্য স্টক এক্সচেঞ্জে চালুর অপেক্ষায় থাকা এসএমই বোর্ড ও অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে (এটিবি) তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর সুবিধা চেয়েছে ডিএসই। এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোকে পাঁচ বছরের জন্য ১০ শতাংশ হারে কর নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন ডিএসইর চিফ অপারেটিং অফিসার সাইফুর রহমান মজুমদার। এ ছাড়া অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে যেসব সিকিউরিটিজ তালিকাভুক্ত হবে সেগুলোকে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মতো বিবেচনা করার প্রস্তাব দেন তিনি।
সাইফুর রহমান মজুমদার বলেন, এতে সরকারের করের উৎস বৃদ্ধি পাবে। এসব কোম্পানি যখন পুঁজিবাজারে ভালো ব্যবসা করবে, লেনদেন বাড়বে, সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।
ডিএসইর প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মুদ্রাবাজার ও পুঁজিবাজারের তুলনায় বর্তমানের করপোরেট বন্ড মার্কেটের আকার খুবই ছোট। বন্ড মার্কেট বড় করার স্বার্থে এ খাতের কর ছাড় জরুরি বলে জানানো হয়। বর্তমানে জিরো কুপন বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয় বা সুদ সম্পূর্ণ করমুক্ত। তাই বন্ড মার্কেট চাঙ্গা করতে সুকুক ও সম্পদভিত্তিক সিকিউরিটিজের মতো অন্যান্য বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয় বা সুদকে জিরো কুপন বন্ডের মতো করমুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে ডিএসই।
বর্তমানে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয়কে করমুক্ত রাখা হয়েছে। গতকালের বাজেট প্রস্তাবে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয়কে সুদমুক্ত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে ডিএসই। তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশে দ্বৈতকর পরিহারেরও অনুরোধ জানিয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জটি। এ ছাড়া করপোরেট শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ আয়ের ওপর বর্তমানের ২০ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ কর কর্তনের সুপারিশ জানিয়েছে তারা।
ডিএসইর সদস্যদের লেনদেনে উৎসে কর শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশের পরিবর্তে পূর্বের শূন্য দশমিক শূন্য ১৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে ডিএসই, সিএসই ও বিএমবিএ।
২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমিয়ে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এতে করে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের ব্যবধান কমে সাড়ে ৭ শতাংশে নেমে আসে। ফলে অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে এবং বহুজাতিক ও স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী করে তুলতে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের ব্যবধান ১৫ শতাংশ করা প্রয়োজন বলে স্টক এক্সচেঞ্জ মনে করে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ করার পাশাপাশি ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত সেসব প্রতিষ্ঠানের করহার ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে ডিএসই। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত মোবাইল কোম্পানির করহার ৪০ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করারও প্রস্তাব রয়েছে। এদিকে গতকাল এনবিআরকে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে বিএমবিএ। একই সঙ্গে মার্চেন্ট ব্যাংকের করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর এই সংগঠনটি।