করোনা মোকাবিলায় নারী নেতৃত্ব

এবার বৈশ্বিক করোনা মহামারীর মধ্যেই এমন এক সময়ে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপিত হতে যাচ্ছে যখন জাতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ মুজিববর্ষ পালন করছে।

এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘কভিড-১৯ আক্রান্ত পৃথিবীতে সম-ভবিষ্যৎ অর্জনে নারী নেতৃত্ব’। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত আনন্দের খবর হলো নারী দিবসের ঠিক প্রাক্কালে খবর এসেছে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়া শীর্ষ তিন সফল নারী নেতার তালিকায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে দেওয়া বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২১ উপলক্ষে দেওয়া বিশেষ ঘোষণায় মহামারী চলাকালীন সফলভাবে নেতৃত্ব দেওয়া শীর্ষ তিন নারী নেতার নাম ঘোষণা করেন কমনওয়েলথের মহাসচিব প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড কিউসি। এই তিন নারীনেত্রী হলেনবাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন ও বার্বাডোজের প্রধানমন্ত্রী মিয়া আমোর মোটলি।

প্রাণঘাতী এই মহামারী আক্রান্ত পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষায় রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান নারীরাই কেবল নন, দুনিয়াজুড়েই নারী সমাজ বিশেষ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবিকারনা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেভাবে সম্মুখ সৈনিকের ভূমিকা পালন করেছেন এবং করে যাচ্ছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শুধু সেবা নয়, কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ, সাহস ও শক্তি জুগিয়ে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে নারী সমাজ। করোনার কারণে যখন অফিস-আদালত, দোকানপাট, যানবাহন ও হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ ছিল, কর্মহীন হয়ে কোটি কোটি মানুষ অনাহার ও অর্ধাহারে জীবন যাপন করছিল, তখন এই নারী সমাজই জীবনের মায়া ত্যাগ করে খাদ্য সহায়তা নিয়ে অনাহারী মানুষের পাশে দাঁড়ান দৃঢ়তার সঙ্গে। তারা তৈরি খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেন কর্মহীন যানবাহন চালক, কৃষিশ্রমিক এবং দিনমজুরদের হাতে।

অন্যদিকে, করোনা মোকাবিলায় বিশ্বের নারী নেতৃত্বাধীন কিছু দেশ যে সফলতা দেখিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরা  যেখানে মহামারী ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে করোনা মোকাবিলায় সফল হচ্ছেন নারী সরকারপ্রধানরা। এইসব নারী নেতৃত্বাধীন দেশগুলোর করোনা মোকাবিলার কৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নেতৃত্বের কয়েকটি সাধারণ গুণাবলির কারণেই তারা করোনা ঠেকাতে সক্ষম হয়েছেন। এই গুণাবলির মধ্যে রয়েছে তথ্যের স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নাগরিকদের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা। করোনা মহামারীর মতো এই বৈশ্বিক সংকটের সময়ে দক্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত রেখেছে জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও তাইওয়ানের মতো দেশগুলো। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়োপযোগী সাহসী পদক্ষেপ এবং যোগ্য নেতৃত্বে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যার ফলে এখানে করোনার মতো মহামারীকালেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়নি। খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পায়নি। কলকারখানা ও মাঠে-ময়দানে উৎপাদন প্রক্রিয়া অচল হয়ে পড়েনি।

ইউনাইটেড ইনস্টিটিউট অব পিস তাদের একটি প্রতিবেদনে বলেছে, করোনার মতো মহামারী ঠেকাতে নারীর অভিজ্ঞতা ও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তবিক পক্ষে করোনা মোকাবিলায় বিশ্বের নারী নেতৃত্বাধীন দেশগুলোর দিকে তাকালে এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। নারী নেতৃত্বাধীন দেশগুলোর এই সফলতার দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন উঠেছে; হাজার বছর ধরে চলে আসা পুরুষ নেতৃত্বের জায়গা কি এবার  ছেড়ে দেওয়ার সময় এসেছে? শুধু করোনা পরিস্থিতি নয়, গত কয়েক দশক ধরেই দেখা যাচ্ছে নেতৃত্বের দিক দিয়ে নারী নেতৃত্ব যথেষ্ট সফল এবং কঠিন ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।

করোনা আক্রান্ত পৃথিবীতে সফল নেতৃত্বের জন্য ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেদেরিকসেন, আইসল্যান্ডের ক্যাটরিন, নরওয়ের আর্নাসলবার্গ, তাইওয়ানের সাইইং ওয়েন এবং সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী ফিনল্যান্ডের সানা মার্টিন প্রশংসিত হচ্ছেনযারা সবাই নারী।

অন্যদিকে, পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর কিন্তু করোনা মোকাবিলায় সমালোচিত ও চরম ব্যর্থ নেতা হিসেবে সমালোচিত হচ্ছেন সদ্যসাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যের বরিস জনসন, চীনের শি চিনপিং এরা সবাই পুরুষ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিথ্যা জাতীয়তাবাদের আগুনে ঘি ঢেলে তার নগ্ন রূপটি  প্রকাশ করেছেন। এই মহামারীকালে নরেন্দ্র মোদির প্রদীপ প্রজ¦ালন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।

শুধু নেতৃত্বের দিক দিয়ে নয়, চিকিৎসা ক্ষেত্রেও এই সময় নারীর ভূমিকা উল্লেখ করার মতো।  ভয়াবহ করোনা সংকটকালে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় জরুরি সেবাদানে নারীর ভূমিকাই অগ্রগণ্য। চীনসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে নারী চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীরা দিনরাত একাকার করে যেভাবে রোগীকে সেবা দিয়েছেন তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। বাংলাদেশে একটি সংবাদ ব্যাপক  ভাইরাল হয়েছিল, সেখানে দেখা যাচ্ছে, একজন সেবিকা করোনা রোগীর সেবার জন্য বহুদিন ধরে বাড়ি যেতে পারছেন না, হাসপাতালেই থাকছেন। মাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে ওঠা তার ছোট্ট মেয়েটিকে এক আত্মীয় হাসপাতালে নিয়ে এসে কাচের ওপারে দূর থেকে মাকে দেখিয়ে নিচ্ছেন। কী অসহনীয় কষ্ট!

তাই সার্বিক বিবেচনায় এটা বলা মোটেও বাহুল্য হবে না যে, করোনা-উত্তর পৃথিবীতে নারী নেতৃত্বে নারীর ক্ষমতায়ন সুখ ও সমৃদ্ধি আনবে বলে প্রতীয়মান হয়। আমরা যদি এই সময়ে  পরিবারগুলোর দিকে তাকাই তাহলেও দেখা যাবে, প্রায় প্রতিটি পরিবারেই করোনা মহামারীর বিশেষ পরিস্থিতি সামলাতেও নারীরাই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন।

এই দুর্যোগে নারীই পরিবারের হাল ধরেছেন আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায়। শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাবই নয়, সবক্ষেত্রেই নারীকেই নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের মনোবল অটুট রাখতে, আপৎকালীন সাংসারিক খরচ কমিয়ে আনতে সন্তানের যতœ-আত্তি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে নারীকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। ময়মনসিংহে একজন চাকরিজীবী নারীর স্বামী করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তার শবদাহে আত্মীস্বজনরা মৃত্যু ভয়ে না এলেও ওই ব্যক্তির স্ত্রীই স্বামীর মুখাগ্নি করে মানবসেবা ও ভালোবাসার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

অন্যদিকে পুরুষরা পারিবারিক সহিংসতার রূপকার হয়ে সংবাদ শিরোনাম হচ্ছেন। পরিবারে নারীর এই যোগ্য ভূমিকা ও পুরুষের বীভৎস রূপ মূল্যায়ন করে পৃথিবীর মানুষকে নতুন করে ভাবতে হবে সংসারে নারীরাই এখন থেকে মুখ্য নেতৃত্বে থাকবেন কি না? কেননা করোনার এই সংক্রমণকালে এটা প্রমাণিত কী রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, কী সংসার, সবখানেই নারীরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। তারা সঠিক সময়ে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেন নারীরাই।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি.

netairoy18@yahoo.com