মোবাইল ব্যাংকিং

নিবন্ধিত গ্রাহকের দুই তৃতীয়াংশই নিষ্ক্রিয়

মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় নিবন্ধিত গ্রাহক ১০ কোটি ছাড়ালেও প্রতি মাসে লেনদেন হচ্ছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি হিসাবে। ফলে দুই-তৃতীয়াংশ হিসাবই নিষ্ক্রিয় থেকে যাচ্ছে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জানুয়ারি মাসে দেশের ১৫টি মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত গ্রাহক বেড়ে ১০ কোটি ৫ লাখে উন্নীত হয়। গত ডিসেম্বরে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার নিবন্ধিত গ্রাহক ছিল ৯ কোটি ৯৩ লাখ।

তবে জানুয়ারি মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক বাড়লেও সক্রিয় গ্রাহক ছিল ৩ কোটি ২৪ লাখ। সেই হিসেবে গত জানুয়ারি মাসে ৬ কোটি ৮১ লাখ গ্রাহকই নিষ্ক্রিয় ছিল।

তা ছাড়া সক্রিয় গ্রাহক তেমন একটা বাড়ছেও না। গত ডিসেম্বরে সক্রিয় গ্রাহক ছিল ৩ কোটি ২৩ লাখ। যেখানে এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সক্রিয় গ্রাহক ছিল ৩ কোটি ৩৩ লাখ।

কোনো গ্রাহক একটানা তিন মাস লেনদেন না কারলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে নিষ্ক্রিয় গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নগদ-এর তথ্য অন্তর্ভুক্ত না থাকায় এই সেবার প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠছে না। তারা বলছেন, এক বছরে প্রচুর নতুন গ্রাহক বাড়লে সক্রিয় হিসাবও বাড়ার কথা।

গত বছরের এপ্রিলে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) হিসেবে কাজ করার অনুমোদন পায় ডাক বিভাগের নগদ। তা ছাড়া সম্প্রতি ক্যাশ আউট খরচ কমিয়েও গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে দেখা গেছে প্রতিষ্ঠানটিকে। ফলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকদের মধ্যে নগদ-সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ছে বলে দাবি করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

নগদ-এর একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩ কোটি নিবন্ধিত গ্রাহক রয়েছে। এই হিসাবগুলোয় উপবৃত্তির টাকা প্রদান করা হয়। ফলে অধিকাংশ হিসাবই সক্রিয় থাকে। এ তথ্য আমলে নিলে সক্রিয় গ্রাহকের সংখ্যা অনেক বাড়বে বলে মনে করছেন নগদ-এর কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের সংখ্যা ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১০ লাখ ৪৪ হাজার ৫৮৭ জনে নেমে এসেছে। এই এজেন্টদের তালিকায় নগদ-এর তথ্য যুক্ত হলে এই তালিকা আরও বড় হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগদ কোনো ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান না হওয়ায় কিছু কারিগরি সমস্যা হচ্ছে। আমরা নগদকে বলেছি, তাদের মূল প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে এর সমাধান করতে। তাহলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তথ্যের মধ্যে নগদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার জটিলতা আর থাকবে না।’

২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১১ সালের ৩১ মার্চ বেসরকারি খাতের ডাচ-বাংলা ব্যাংক প্রথম দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে। ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা এক কোটির মাইলফলক অতিক্রম করে।

এক জায়গা থেকে অন্য জায়গার মানুষের কাছে কেবল টাকা পাঠানোই নয়, বিভিন্ন সেবার বিল, কেনাকাটার বিল, রেমিট্যান্স আহরণ, সামাজিক সুরক্ষার ভাতা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তির টাকা পরিশোধ, কর্মীদের বেতন পরিশোধসহ অনেক ধরনের সেবা মিলছে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) আওতায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত জানুয়ারি মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকরা মোট ৫৭ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা লেনদেন করেছেন। দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশনস শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, ১০ কোটি গ্রাহকের মধ্যে বড় একটি অংশ বিকাশের সেবা নিচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে ৫ কোটি ১০ লাখের বেশি গ্রাহক রয়েছে বিকাশের। ২৬টি ব্যাংকসহ ভিসা ও মাস্টার কার্ড থেকে অনায়াসে নিজের এবং প্রিয়জনের বিকাশে অর্থ লেনদেন করতে পারছেন গ্রাহকরা।

তিনি বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং এখন শুধু টাকা আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই সেবায় যুক্ত হচ্ছে অনেক নতুন নতুন সেবা। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল অর্থাৎ সেবা মূল্য পরিশোধ, কেনাকাটার বিল পরিশোধ, বেতন-ভাতা প্রদান, বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো, অর্থাৎ রেমিট্যান্স প্রেরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যাংক থেকে মোবাইলে ও মোবাইল থেকে ব্যাংকেও লেনদেন করার সুবিধা পাচ্ছেন গ্রাহক। তা ছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারেও গ্রাহকের আগ্রহ বাড়ছে। ফলে এটা একটা লাইফস্টাইল প্রডাক্টে পরিণত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে এমএফএসে রেমিট্যান্স সংগ্রহ ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় রেমিট্যান্স এসেছে ১৮৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির হিসাবে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে ১৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা বিতরণ হয়েছে ২ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। বিভিন্ন সেবার বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৮০৩ কোটি টাকা। কেনাকাটার বিল পরিশোধ হয়েছে ১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা।

মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই সেবার মাধ্যমে দেওয়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার টাকাগুলো গ্রামে-গঞ্জে যাচ্ছে। এই টাকাটা পাওয়ার পরপরই তারা ক্যাশ আউট করেন। পরে আর কোনো লেনদেন হয় না এই হিসাবগুলোতে। ফলে হিসাবগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।