সাইবার অপরাধীদের সহজ শিকার নারী

অপরিচিত এক ফেইসবুক আইডি থেকে গত বছরের ১৭ নভেম্বর এক তরুণী ও তার আত্মীয়-স্বজনদের ফেইসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়। আইডিতে প্রবেশ করে ওই তরুণী দেখতে পান তারই ফেইসবুক থেকে ছবি নিয়ে আইডিটিতে ব্যবহার করা হয়েছে। তৎক্ষণাৎ তারা ফেইসবুকে রিপোর্ট করে আইডিটি নষ্ট করতে সক্ষম হন। কিন্তু পরদিন সকালে ওই তরুণী ফের দেখতে পান জেম ব্রেস্টার কুক নামে আরও একটি নতুন আইডি খোলা হয়েছে। সেখানেও তার ছবি পোস্ট করা হচ্ছে। শুধু ছবিই না, ছবির সঙ্গে তার মোবাইল নম্বর, অশালীন বার্তাসহ পোস্ট করা হচ্ছে। দিন-রাত দেশ ও দেশের বাইরে থেকে অনবরত বাজে প্রস্তাবের ফোনকলে দুর্বিষহ হয়ে পড়ে তার জীবন। এরপর তিনি অভিযোগ জানান পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন-এর পেইজে। পরে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন তিনি। প্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ জানতে পারে ওই আইডি ব্যবহার করছে মো. রেজাউল করিম ওরফে সোহেল (১৯) নামের এক তরুণ। পরে তাকে নীলফামারীর জলঢাকা থেকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

রাজধানীর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়া এক তরুণী ২০১৫ সালের দিকে এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তাদের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবিগুলো কৌশলে ধারণ করে ওই যুবক। সম্পর্কের দুই বছরের মাথা তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ওই যুবক চলে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। পরে সেখান থেকে প্রতিনিয়ত ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে ওই তরুণীকে। সম্প্রতি এক কু-প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ওই তরুণীর কিছু খোলামেলা ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ভুক্তভোগী তরুণী অভিযুক্ত যুবকের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগে অভিযোগ করেছেন।  

কর্মজীবী এক নারীর স্বামী সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে দুর্ঘটনায় মারা যান। গত বছরের শেষের দিকে গাজীপুরে শফিকুর রহমান নামের এক মেকানিকের কাছে স্বামীর একটি আইপ্যাড মেরামত করতে দেন। শফিকুর সেই আইপ্যাড থেকে ওই নারীর স্বামীর সঙ্গে তোলা কিছু ঘনিষ্ঠ ছবি সরিয়ে নেয়। পরে স্কুপিং নম্বর থেকে পরিচয় গোপন করে ওই নারীর কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে ওই সব ছবি ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। ভুক্তভোগী নারী সিআইডির কাছে অভিযোগ করেন। পরে তথ্য প্রয্ুিক্তর সহায়তায় সিআইডি জানতে পারে শফিকুর রহমান নামের ওই ব্যক্তি টাকা দাবি করেছে। তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়।

উল্লিখিত ওই তিন নারীর মতো এমন সাইবার অপরাধ ঘটছে হরহামেশাই। তরুণী থেকে মধ্যবয়সী কেউ রেহাই পাচ্ছে না সাইবার অপরাধীদের হাত থেকে। একটু অসাবধানতা বা এক সময়ের প্রিয় মানুষটিকে অতি বিশ্বাস করার মাশুল গুনতে হচ্ছে তাদের। নানা ধরনের অপরাধের মধ্যে বেশি ঘটছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও প্রকাশের ঘটনা। কখনো ফেইসবুক আইডি হ্যাক করে বাজে মন্তব্য বা ছবি ছড়ানোর ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে আবার প্রেমের সম্পর্ক ছিন্ন হলে প্রেমিকার সঙ্গে তোলা ঘনিষ্ঠ ছবি ও ভিডিও ভাইরাল করছে প্রেমিক। কখনো খোয়া যাওয়া বা চুরি হওয়া মোবাইল ফোনের ফটো গ্যালারিতে থাকা ছবিও ভাইরাল করছে অপরাধীরা। বিভিন্ন পর্নো সাইটেও প্রকাশ করছে ছবি বা ভিডিও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বিদ্রুপের শিকার হচ্ছেন। এ সময় মানসিক সাপোর্ট না পেয়ে অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ। সাইবার অপরাধের শিকার নারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে এমনসব ভয়ানক তথ্য পাওয়া গেছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমানে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা এককভাবে মোকাবিলা করা কারও পক্ষে সম্ভব না। পরিবার, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিওর (প্রতিরোধ কোনো রোগের চিকিৎসার চেয়ে ভালো)। নারীদের বিশেষ করে উঠতি বয়সের মেয়েদের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সচেতন থাকতে হবে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন সময় পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় যা অনেক সময় পরিবার বুঝতে পারে না। তারা বিষন্নতায় ভোগে। এক্ষেত্রে স্কুল পর্যায়ে মনোবিজ্ঞানী থাকা প্রয়োজন। কোনো ধরনের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হলে তাকে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আনতে পরিবারের সব চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে, মনোচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।   

এদিকে ভার্চুয়াল জগতে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। পুলিশ সদর দপ্তরের এলআইসি শাখার অধীনে চালু হয়েছে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’। এছাড়া সব ধরনের সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) গড়ে উঠেছে সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। ভুক্তভোগীরা প্রতিনিয়ত ছুটে যাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। জমছে অভিযোগের পাহাড়। অপরাধীদের গ্রেপ্তারও করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবুও দমছে না সাইবার অপরাধীরা। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিরাপদ ব্যবহার, ব্যক্তিগত ও পরিবারিক সচেতনতার ওপর জোর দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার স্পেসে বিচরণে সতর্কতার বিকল্প নেই। মোবাইল বা কম্পিউটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা, কোনো আনঅথরাইজড অ্যাপ ইন্সটল না করা, নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করা, ভালো মানের অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি ইমেইল বা ফেইসবুক অ্যাকাউন্টের টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু করলে, প্রাইভেসি নিশ্চিত করলে, বাস্তব জীবনে অপরিচিত কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব না করলে অনেকাংশেই নিরাপদ থাকা যায়।

পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ পুলিশের উদ্যোগে গত বছরের ১৬ নভেম্বর থেকে চালু হয়েছে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’। এই সেবাটির উদ্দেশ্য নারীর জন্য নিরাপদ সাইবার জগৎ তৈরি করা। এর মাধ্যমে ভুক্তভোগী নারীকে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা ও সাইবার সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভুক্তভোগীর তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করেই কাজটি করছে পুলিশ। গেল কয়েক মাসে পুলিশের এই সেবার মাধ্যমে গ্রহণ করা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, আইডি হ্যাক বা হ্যাকের মাধ্যমে প্রতারণা। এছাড়া ছবি বা ভিডিও এডিট করে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগও আছে। 

পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন-এর দেওয়া তথ্য মতে, প্রতিষ্ঠার পর মাত্র দেড় মাসে (৪ জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত) সর্বমোট ৭ হাজার ২৪৯ জন বিভিন্ন অভিযোগ দায়ের করেছেন।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হ্যারাসমেন্টের শিকার হয়ে সিআইডির সাইবার ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে অভিযোগ করেছেন ৬৪৩ নারী। আর চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে অভিযোগ করেছেন ৪১ নারী। 

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অ্যাডিশনাল ডিআইজি (সাইবার ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার) কামরুল আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়ে যারা আমাদের কাছে আসছেন তাদের বড় অংশই নারী। তারা বেশিরভাগই সাইবার বুলি-এর শিকার হচ্ছেন, হ্যারাসমেন্টের শিকার হচ্ছেন। তাদের অনেকেই প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন। হয়তো একটু কাছাকাছি বসেছে অথবা যারা গভীরতায় গেছে আর্থিক লাভের আশায় অপরাধীরা সেগুলোকেই পরবর্তী সময়ে পুঁজি করছে। সম্পর্ক নষ্ট করে ওই ছবি নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছে। টাকা দাবি করছে, না দিলে ছবি ভাইরাল করার ভয় দেখানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারীর বাবা-মা রক্ষণশীল হন। সে ক্ষেত্রে মেয়েটা অসহায় হয়ে পড়ে। অপরাধীরা তাকে হয়তো একটা অবৈধ প্রস্তাব দিচ্ছে, সেই প্রস্তাবে জড়ালে আরও ছবি তুলছে। অর্থাৎ তাকে একটা চেইন অফ প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। এ বিষয়টি খুবই ভয়ংকর। পরিবারের কাছে লজ্জায় মুখ দেখাবে কীভাবে এমন চিন্তা থেকে অনেকে নিজের জীবনহানি করতে বা বিনষ্ট করতেও তখন আর কুণ্ঠিত হন না।’