বিষম চিন্তা ডিজিটালে

মানুষ কথা বলে, বলতে চায়। অন্য প্রাণীরাও বলে। মুরগির গলায় ছুরি চালাবার সময় কঁক-কঁক করে সে যা বলে তা বুঝতে পারে না মানুষ। পারতই যদি তবে অ-মাংসাশীরা মানুষ মারে কী করে! নাকি মানুষ ভিন্ন জাতের প্রাণী বলে! মানুষের কথা মানুষ বুঝে ফেলে, যে যার মতো করে। অনেকে বেশি বলতে যায়, বেশি বুঝেও ফেলে। মাত্রা রাখে না কোনোটাতে। সমস্যা সেখানে, বিভ্রাটের সূত্র এখানে। বোবার শত্রু নেই, কথায় বলে। সে কথাও পুরো সত্য নয়, বুঝেছি আমি নিজে। জজিয়তির চাকরির আঠারো মাসের প্রশিক্ষণে তিন মাস ছিলাম সদর সিনিয়র সহকারী জজ সাহেবের সঙ্গে, আর তিন মাস ছিলাম সাব-জজ সাহেবের সঙ্গে। তারা দুজনেই এজলাসে চুপটি করে বসে শুধু শুনতেন, কোনো কথা না বলে। গুরু বিদ্যা মগজে করে এজলাস চালানো শুরু করলাম প্রথম পোস্টিং পেয়ে উপজেলা আদালতে। কিছুদিন পরে জেলা জজ এলেন পরিদর্শনে। ফিরে যাওয়ার সময় বললেন, বোবার মতো এজলাসে বসে থাকি বলে উকিল সাহেবরা অভিযোগ করেছেন তার কাছে। সেই থেকে কথা বলা শুরু একটু একটু করে। আমার গুরুদের একজনকে আল্লাহ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি করেছিলেন, আর একজনকে রেজিস্ট্রার করেছিলেন। অযোগ্য শিষ্য আমি উকিল সাহেবদের পাল্লায় পড়ে চলেছি কথা বলে।    

এক পরিচিতজন বললেন, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশে নাকি সুরক্ষা আছে! ‘জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন’ নামে ২০১১ সালের একটা আইন আছে বটে আমাদের। নামটা দেখে বুকে বল আসছে আপনার! জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মনে হলেই যে-কোনো তথ্য কাগজে, ফেইসবুকে, ইউটিউবে, হাটে-বাজারে যেখানে খুশি সেখানে, যেমনভাবে খুশি তেমনভাবে প্রকাশের সুরক্ষা দেয়নি এ-আইনে। শুধু নামটুকু দেখেশুনেই তার সবটুকু ধারণা করা মস্ত বড় ভুল। বাংলায় কেউ কখনো কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন রেখেছিল কি না ঠিক নেই, প্রবাদটি টিকে আছে। এ-আইনে ‘জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য’ বলা হয়েছে সরকারি টাকা-পয়সার অনিয়ম, সরকারি সম্পদের অব্যবস্থাপনা, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ফৌজদারি অপরাধ, বেআইনি-অবৈধ কাজকর্ম, জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পরিবেশের ক্ষতিকর কার্যকলাপ আর দুর্নীতির সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্য। এসব যদি বলার থাকে বলতে হবে ‘উপযুক্ত কর্র্তৃপক্ষ’-এর কাছে। অর্থাৎ, সেই সংস্থার প্রধান বা সংস্থার সংযুক্ত বা অধীনস্ত অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তরের বিভাগীয়, আঞ্চলিক, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন কার্যালয়ের প্রধানের কাছে। আর, সাংবিধানিক পদাধিকারীর বিরুদ্ধে হলে রাষ্ট্রপতির কাছে, সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে হলে স্পিকারের কাছে, অধস্তন আদালতের বিচারকের বিরুদ্ধে হলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে, দুর্নীতির বিষয় হলে দুদকের কাছে, সরকারি টাকা-পয়সার ব্যাপার হলে মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কাছে এবং অবৈধ-অনৈতিক ব্যাপার হলে থানায়। সুরক্ষা হলো, তথ্য সঠিক হলে (সে তো তদন্তকারীর মর্জি!) প্রদানকারীর পয়পরিচয় ‘সিক্রেট’ থাকবে (ভয় তো ‘ওপেন-সিক্রেট’-এর!), কোনো মামলা করতে পারবে না তথ্য প্রদানের কারণে (করবে তো অন্য কারণ বানিয়ে!), বদলি-শাস্তিও চলবে না তথ্য প্রদানের কারণে (চাকরিজীবীর বদলি-শাস্তি তো হয় জনস্বার্থে!)। ব্যবহার নেই মোটে এ-আইনের। সুরক্ষার যা অবস্থা! আশ্বস্ত হয় না তথ্য প্রদানেচ্ছুরা।

৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে সংবিধান। সুরক্ষা দেয়নি প্রকাশের। আছে আইনের বেড়াজালের নিয়ন্ত্রণ। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাটাও এরই মধ্যে। চিন্তা স্বাধীন বিবেকে, প্রকাশ আইনের অধীনে। যুক্তিসংগত কিছু বাধা দরকার রাষ্ট্রের, সমাজের, নাগরিকের বৃহত্তর স্বার্থে। নইলে যথেচ্ছাচারে নষ্ট হবে। গোলটা বাধে জনস্বার্থে আর জনের স্বার্থে, বৃহত্তর আর ক্ষুদ্রতরতে। দেয়ালেরও নাকি কান আছে, শান্তি নেই সেখানে কথা বলে। আজেবাজে বিজ্ঞাপনী-পোস্টারে সে-কানও বন্ধ। আগে চিকা মারা হতো বাউন্ডারি ওয়ালে। এখন ভিড়েছে ফেইসবুক ওয়ালে, ডিজিটালে। কথা শুধু বললেই চলে না, ছড়ানোও চাই। 

২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশের বিধিনিষেধ ছিল। সমালোচনায় বিলোপ হয়েছে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। সেই ‘থোড় বড়ি খাড়া’ ‘খাড়া বড়ি থোড়’ হয়ে ঘুরে এসেছে ২১, ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। ব্যবহার নেই ২০১১ সালের ‘জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন’-এর; যথেচ্ছ ব্যবহারে অপ বলে অপবাদ জুটেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের। ২১ ধারায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা, প্রচারণা অপরাধ। কাউকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, ভীতিকর কিছু এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি, সুনাম নষ্টের, বিভ্রান্তি ছড়ানোর মতো কিছুর প্রকাশ ২৫ ধারায় অপরাধ। ধর্মীয় মূল্যবোধ, অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কিছুর প্রকাশ ২৮ ধারায় অপরাধ। মানহানিকর কিছুর প্রকাশ ২৯ ধারায় অপরাধ। শ্রেণি-সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা, বিদ্বেষ সৃষ্টির, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট, অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর মতো কিছুর প্রকাশ ৩১ ধারায় অপরাধ।

আইনটা সংস্কারের কথা শুনছি। সংবিধানমতে রাষ্ট্রের ক্ষমতার মালিকানা যে জনগণের তার ষোল কোটি ভাগের ক্ষুদ্র এক ভাগী এই নিরীহজন সরল অভিপ্রায় জানায় পরিচালকমণ্ডলীর কাছে যে;  

(১) কেমন ধরনের প্রকাশ, প্রচার হলে বিরুদ্ধ প্রপাগান্ডা হবে, অপমানকর, আক্রমণাত্মক, ভীতিকর হবে, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে, ধর্মের অবমাননাকর হবে, শ্রেণি-সম্প্রদায়ে বিভেদ সৃষ্টি হবে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি আশঙ্কাজনক হবে এগুলোর সংজ্ঞা নেই আইনে। অস্পষ্ট, অনির্দিষ্ট হয়ে যথেচ্ছ ব্যবহারের চিচিং ফাঁক হয়ে আছে। বিস্তারিত ব্যাখ্যা, নমুনা ও উদাহরণ দিয়ে সুস্পষ্ট করুন এসব, ব্রিটিশ যেমন সেই ১৮৬০ সালে দিয়ে গেছে পেনাল কোডে। (২) যা প্রকাশিত হয়েছে, যা প্রচারিত হয়েছে তা সত্যি মঙ্গল চিন্তার প্রকাশ নাকি অমঙ্গল কামনার বহিঃপ্রকাশ, সত্যি শুভ নাকি অশুভ সে-সব বিশ্লেষণ করার জন্য এসব বিষয় যারা চর্চা করেন, চিন্তাভাবনা করেন, বোঝেন তাদের নিয়ে কমিটি রাখুন আইনে। বিশ্লেষণ করে সেই কমিটি অনুমোদন করলে তবেই হবে মামলা, সে-বিধান করুন। যার তার ইচ্ছেমতো মামলায় আইনের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আসবে।  (৩) কার মান গেলে কে মামলা করবে, প্রপাগান্ডার কথা বলে, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির কথা বলে কে মামলা করবে নির্ধারিত না থাকায় মামলা করে জনে জনে। কোন মামলা কে কয়টা করবে তার দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দিন একেবারে। (৪) এ-সব অপরাধ আমলে নেওয়ার এখতিয়ার আছে কেবল সাইবার ট্রাইব্যুনালের। আমলের এখতিয়ারই নেই যে-ম্যাজিস্ট্রেটের তার কাছে তদন্তকালে মামলা রাখার চল বন্ধ করুন। শুরু থেকেই মামলা রাখুন ট্রাইব্যুনালে। আসামি গ্রেপ্তার বা হাজির হলে সোপর্দ হবে ট্রাইব্যুনালে। এখতিয়ারবান ট্রাইব্যুনাল দেখবে মামলা চলে কি না, জামিন হবে কি না। ছুটির দুদিন থাকুক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। (৫) শুধু ২৫ আর ২৯ ধারা জামিনযোগ্য আছে। জামিনযোগ্য করে দিন ২১, ২৮, ৩১ ধারাও। শুনি মাদক কারবারি, প্রতারক, অর্থপাচারী, দুর্নীতিবাজ, এমনকি সন্ত্রাসীও জামিনে বেরিয়ে এসে গোপনে নামে নিজ নিজ কারবারে। তাদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর, ভয়ংকর তো নয় চিন্তাশীল মানুষ। গোপনে এদের চলে না, কাজ তো প্রকাশ করাতেই।

সংস্কার যতদিন না হয় ততদিন জামিন তো দিতেই পারেন চিন্তাশীল মানুষদের, না হয় যুক্তিসংগত শর্ত জুড়েই। অ-জামিনযোগ্য মানে যে জামিন নিষিদ্ধ নয় সে-কথা তো অজানা নয় কারও। আইনের নামে হয়রানি ঠেকাবে আদালত, এ ভরসা মানুষের। সুবিচারের শেষ ভরসার জায়গাটাও ভরসা শেষের জায়গা হয়ে গেলে কপাল ঠুকতে হবে। প্রকাশ না হলে সঠিক তথ্য জানতে পারবে না, জানতে না পারলে মঙ্গল চিন্তা করতে পারবে না মানুষ। চিন্তা করা ছেড়ে দেবে প্রকাশ করতে না পারলে। সঠিক তথ্যের, মঙ্গল চিন্তার প্রকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব, নিজেরই স্বার্থে। নইলে, অশুভ আর অমঙ্গলে ছেয়ে যাবে। কুসংস্কার আর অন্ধকারে ভরে যাবে। শুভ চিন্তা হলেই রাষ্ট্র, সমাজ রক্ষা পাবে, উন্নত হবে।   

লেখক প্রবন্ধকার ও আইনগ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

moyeedislam@yahoo.com