নারী দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ লাখ লাখ টাকা আদায়

দেশের বাইরে থেকে বেশ কিছুদিন ধরে জুতা ও ব্যাগ আমদানি করে অনলাইনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হোম ডেলিভারি দেন কাওসার আহম্মেদ রনি (২৯) নামের এক ব্যবসায়ী। রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন দক্ষিণ বনশ্রীতে তার অফিস রয়েছে। অনলাইনে রনির কাছে এক নারী ব্যাগের অর্ডার দেন। অর্ডার অনুযায়ী পণ্য ডেলিভারি দিতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন তিলপাড়া ২০ নম্বর রোডের উত্তরণ ক্লাবসংলগ্ন এলাকায় যান রনি। সেখানে পৌঁছামাত্র ওত পেতে থাকা তিন থেকে চারজন লোক জোরপূর্বক পাশের ছয়তলা ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় রনিকে। সেখানে নিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। এরই মধ্যে সেখানে আসা এক নারীকে রনির পাশে বসিয়ে আপত্তিকর ছবিও তোলে। এরপর আরও চারজন লোক এসে নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে রনিকে মারপিট শুরু করে। তারা রনিকে বলে, এখানে অনৈতিক কার্যকলাপ হচ্ছে। এ সময় তারা রনির কাছে এক লাখ টাকা দাবি করে এবং মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। দাবি করা টাকা না দিলে রনির পরিবারের লোকদের ডেকে এনে অপমান করার হুমকি দেয়। রনি নিরুপায় হয়ে তার কাছে থাকা ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম কার্ড ও পিন নম্বর দিয়ে দেন। ওই রাতেই এটিএম কার্ডের মাধ্যমে এবং মোবাইল ফোনের রকেট অ্যাকাউন্ট থেকে মোট ৭০ হাজার টাকা তুলে নেয় প্রতারক চক্রটি। পরবর্তী সময়ে ফের পুলিশ পরিচয়ে ফোন করে দাবি করা ৩০ হাজার টাকা দিতে চাপ দেয় ওই ব্যক্তিরা। রনি তাদের ২০ হাজার টাকা পাঠান।

গত বছরের শেষের দিকে পনির নামে এক ব্যক্তির মধ্যস্থতায় রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার এক যৌনকর্মীর বাসায় যান সরকারি একটি সংস্থার অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা। সেখানে যাওয়ার কিছু সময় পরই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ওই যৌনকর্মীর বাসায় এসে হাজির হয় চার থেকে পাঁচ যুবক। তাদের একজন স্থানীয় থানার এসআই, আরেকজন সাংবাদিক ও অন্যরা এলাকার বড় ভাই পরিচয় দেয়। তারা বাসায় ঢুকেই ওই যৌনকর্মীর সঙ্গে ওই কর্মকর্তার আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও রেকর্ড করে। এরপর মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে ওই কর্মকর্তার পরিবারকে ডেকে আনার ভয় দেখায় তারা। নিরুপায় হয়ে দাবি করা টাকা দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে সটকে পড়েন ওই কর্মকর্তা। এর কিছুদিন পরই সরকারের এক উপসচিবকেও একইভাবে ফাঁদে ফেলে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় এই চক্র।

গত মঙ্গলবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর খিলগাঁও থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলো বদিউজ্জামান শাহীন (৪০), মিজানুর রহমান (৪৫), ফয়সাল আহম্মেদ (২৩), কামরুজ্জামান সোহেল (৩২), সাইফুল ইসলাম ইমরান (৩১) ও বীথি আক্তার সোমা (২৬)। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের ৫টি এটিএম কার্ড, বাংলাদেশ পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার ইউনিফর্ম, বেল্ট ও ফিল্ড ক্যাপ উদ্ধার করা হয়।

ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত অন্তত ৫০ থেকে ৬০টি এমন প্রতারণার ঘটনা ঘটিয়েছে তারা। তাদের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক প্রতারণার মামলাও রয়েছে। জামিনে মুক্ত হয়ে তারা ফের একই কাজ করছে। চক্রের হোতা পনিরের নামে বিভিন্ন থানায় ৫টি প্রতারণার মামলা রয়েছে। তবে ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই মান সম্মানের ভয়ে চেপে যান।

অভিযানে থাকা ডিবির তেজগাঁও বিভাগের (সংঘবদ্ধ অপরাধ, গাড়ি চুরি প্রতিরোধ ও উদ্ধার টিম) সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. বায়েজীদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে প্রতারণার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তারা সর্বশেষ গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়া উত্তরণ ক্লাবসংলগ্ন এলাকায় ব্যবসায়ী কাওসার আহম্মেদ রনিকে ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেয়। এ সময় মিজানুর রহমান নিজেকে পুলিশ পরিচয় দেয়। অন্যরা কেউ সাংবাদিক আবার কেউ এলাকার বড় ভাই পরিচয় দেয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটি প্রথম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে ২০১৫ সালে। এর আগে থেকেই তারা নারী দিয়ে বিভিন্ন মানুষকে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায় করে আসছিল। চক্রের হোতা পনির। সে এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। রাজধানীতে তার ১০টির বেশি গ্রুপ রয়েছে। প্রতি গ্রুপের সদস্য ছয় থেকে সাতজন। তাদের মধ্যে নারী যৌনকর্মীও রয়েছে। এই যৌনকর্মীদের দিয়েই মূল ফাঁদ পাতে পনির। পুলিশের পোশাক, সাংবাদিকতার ইনস্ট্রুমেন্ট সবই আছে চক্রের কাছে। ঘটনার পর চক্রের সদস্যদের একটি অংশ নিজেদের এলাকার বড় ভাই পরিচয়ে মধ্যস্থতাও করে। মূলত রাজধানীর লিখগাঁও, মাদারটেক, বাসাবো এলাকায় কিছু বাসা ভাড়া নিয়ে যৌনকর্মীদের রাখে পনির। সেখানেই মূলত ফাঁদ পাতে অর্থ আদায়ের। গ্রেপ্তার বীথি আক্তার সোমা ছাড়াও চক্রের সক্রিয় দুই নারী সদস্যের তথ্য পেয়েছে ডিবি। তাদের যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এই যৌনকর্মীদের একজন কাওসার আহম্মেদ রনির কাছে অনলাইনে ব্যাগের অর্ডার দিয়েছিল। চক্রগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বিভিন্ন বিকাশ ও রকেট অ্যাকাউন্টের টাকা ক্যাশ আউট করত হবিগঞ্জ থেকে। গ্রেপ্তার সাইফুল বিকাশ ও রকেটের এজেন্ট। সে টাকা তুলে ফের ঢাকায় চক্রের সদস্যদের কাছে পাঠাত।

ডিবির তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. গোলাম মোস্তফা রাসেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চক্রটি বেশ কিছুদিন ধরে নারীদের দিয়ে ফাঁদ পেতে টাকা আদায় করছিল। এ ধরনের প্রতারক চক্রকে আমরা আগেও গ্রেপ্তার করেছি। যখনই আমাদের কাছে অভিযোগ আসে, আমরা অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করি। এদের মতো আরও কিছু চক্র আছে। তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

জামিনে মুক্তি পেয়ে ফের একই কাজ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জামিনের বিষয়টি সম্পূর্ণ বিজ্ঞ আদালতের এখতিয়ার। তবে আমরা যখনই দেখি তারা জামিনে মুক্তি পেয়ে অপরাধ করছে, তখনই গ্রেপ্তার করি।’