মোবাইল সেট হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগসহ টাইপ শুরু করি। চোখ যায় হাতের দিকে। বাম হাতের বুড়ো আঙুলের ওপরে একটা মশা। লাল টানটান পেট নিয়ে চোখের সামনেই রক্ত টানছে। মনোযোগ হরণসহ মাথায় রাগ জমতে শুরু করে। রাগের মাথায় মশাকে আঘাত করতে গেলে হাত থেকে সেট ছিটকে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। মশা কখনো কখনো ‘ভন্’ শব্দে তুষের মতো কানের ভাঁজে এসে বসে। অসহ্য হয়ে সজোরে লাগাই থাপ্পড়। পিষতে সজোরে চেপে ধরি। কান তালালাগা থাপ্পড় থেকে হাত সরাতে না সরাতেই আমাকে বোকা বানিয়ে আঙুলের ফাঁক গলিয়ে ‘ভন্’ শব্দে ছুটে পালায়। বোকা বানানোসহ নিজের হাতে নিজের গালে চপেটাঘাত খাইয়ে গুনগুন গান গেয়ে অক্ষত মশার চলে যাওয়া দেখে নিমেষে মিশে যায় লেখার ভাব ও মুড। সন্ধ্যায় সারা ঘরে ধূপ-ধুনোর ধোঁয়াসহ ড্রয়িংয়ের ফাঁকে ফাঁকে মশার কয়েল। ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় মশার দম বন্ধ হওয়ার আগে মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়।
সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গেই আশপাশের ডোবা-নালা, খানা-খন্দ থেকে বের হয়ে আসে মশা বাহিনী। মানুষের সাড়া পেলেই কুণ্ডলী পাকিয়ে নেমে আসে মাথার কাছে। অনিবার্য কারণ ছাড়া বাইরে হাঁটা-চলা বন্ধ। সন্ধ্যার আগে ঘরের সব দরজা-জানালা আটকে দেওয়ার পরও কাচের ফাঁকফোকর ও বাথরুমের ঘুলঘুলির ছিদ্র দিয়ে এরা ঘরে প্রবেশ করে। পড়ার ঘরের চেয়ার-টেবিল ছেড়ে বাচ্চাদের লেখাপড়াও মশারির তলায়। ফাঁক পেলেই এরা ঢুকে পড়ে মশারির ভেতর। মশারির ভেতরের মশা মারার জন্য কয়েকবার নিতে হয় মশা মারার চায়না ইলেকট্রিক ব্যাট। মশার যন্ত্রণায় কেউ কেউ ফজরের নামাজও আদায় করেন মশারির ভেতর। প্রাতঃভ্রমণকালে পুঁচকে মশা নাকের মাথায় বসার জন্য চোখের সামনে ঘুর ঘুর করে। অসহ্য হয়ে দুহাত দুদিক থেকে সজোরে লাগাই তালি। তালির ঘায়ে মশা ধরাশায়ীর আগেই চোখের চশমা ধরাশায়ী হয়। মশার দিনের বিশ্রামাগার যেন ওয়াশরুম। ওয়াশরুমে কেউ প্রবেশ করলে দিনের বেলায়ই মৌমাছির মতো ঘিরে ধরে। কর্মস্থল চেম্বারে টেবিলের তলায় পা রাখার আগেই মশার অ্যারোসল স্প্রে করতে হয়। অ্যারোসলের গন্ধে টেবিলের ওপরে উঠে আসে রাতের উপোসি নমরুদ বাহিনী। কলমধরা হাতের পিঠে একসঙ্গে কয়েকটা বসে পড়ে। শুঁড় ঢুকিয়ে রক্ত টানতে শুরু করে চোখের সামনেই।
পাড়াগাঁয়ে আমার জন্ম। শৈশবে পুস্তকে নামসহ মশার ছবি দেখতাম। বর্ষার শেষদিকে পানি কমতে শুরু করলে দু-একটা মশা চোখে পড়ত। বাড়ির ঘাটায় যে পানিতে মশা ডিম দিত সে পানিতে কিলবিল করত গুঁড়া মাছ। বিলুপ্ত হওয়া কাটাইরা, দাড়িকানা, ডেলা, ঘারবাঁকা ইত্যাদি মাছের প্রিয় খাবার মশা। পানিতে বসে ডিম দেওয়ার আগেই মশা মাছের পেটে চলে যেত। যেখানে মশার ডিম সেখানেই কিলবিল করত এসব মাছ। ডাঙায় কুনোব্যাঙের ছা ও ঘাসফড়িঙের প্রিয় খাবার মশা। ধানক্ষেতে কাটাইরা মাছ লাফ দিয়ে ওপর থেকে মশা ধরত। সন্ধ্যায় মশা খাওয়ার জন্য দেখা যেত মশাভুক কীটপতঙ্গও। বর্তমানে গাঁয়ের চিত্রও ভিন্ন। মশারি ছাড়া এখন গাঁয়েও ঘুমানো যায় না। মশা জ্বালাতন করার চেয়ে রোগ ছড়ানোর বিষয়গুলো আরও বেশি ভয়ংকর। যেমন
(ক) ম্যালেরিয়া : স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা মানবদেহে ম্যালেরিয়ার জীবাণু ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে থাকা পরজীবী জীবাণু প্রথমে মশাকে আক্রান্ত করে। পরে ওই মশা সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ালে তার শরীরেও জীবাণু প্রবেশ করে।
(খ) চিকুনগুনিয়া : এই রোগের ভয়ানক প্রকোপ খুব বেশি পুরনো নয়। মশার কামড়ের মাধ্যমে শরীরে রোগের জীবাণু প্রবেশের দুই থেকে ১৪ দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ শুরু হয়। জ্বর, মাথাব্যথা, ত্বকের র্যাশ, বমিভাব ও বমি ইত্যাদি ছাড়াও শরীর ব্যথা, বিশেষ করে হাড়ের জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা হওয়া এ রোগের বিশেষ লক্ষণ। রোগ সেরে যাওয়ার পরও এই হাড়ের ব্যথা সপ্তাহ, মাস কিংবা বছরব্যাপী ভোগাতে পারে। এই রোগের বাহক এডিস মশা।
(গ) পীতজ্বর : ‘ইয়েলো ফিভার’ নামে পরিচিত এই রোগের বাহকও এডিস মশা। জ্বর, মাথাব্যথা, জন্ডিস, পেশি ব্যথা ইত্যাদি এই রোগের লক্ষণ বা প্রধান উপসর্গ।
(ঘ) হেমোরেজিক জ্বর : ডেঙ্গুর যে প্রবণতা তা থেকে লক্ষণ কিছুটা ভিন্ন। এডিস মশা কামড়ালে প্রচণ্ড জ্বর হতো কিন্তু এবার অনেক ক্ষেত্রেই তাপমাত্রা খুব বেশি হতে দেখা যাচ্ছে না। গত কয়েক বছর এ জ্বর হচ্ছিল অনেকের।
(ঙ) এনকেফেলাইটিস : ‘কিউলেক্স’ নামক মশার মাধ্যমে ছড়ায়। জাপানি এনকেফেলাইটিস একটি ভাইরাসঘটিত রোগ যার সংক্রমণ মানুষ ও অন্যান্য পশুর মধ্যে ঘটে থাকে। এই সংক্রমণে মানুষের মস্তিষ্ক ঘিরে ঝিল্লি-প্রদাহ দেখা দেয়।
(চ) জিকা ভাইরাস : এই ভাইরাস যে রোগ সৃষ্টি করে তার সঙ্গে ডেঙ্গু জ্বরের কিছুটা মিল রয়েছে। বিশ্রাম নেওয়া হলো প্রধান চিকিৎসা। এখনো এর কোনো ওষুধ বা টীকা আবিষ্কৃত হয়নি। যেসব নারী জিকা জ্বরে আক্রান্ত তাদের গর্ভের সন্তান ছোট আকৃতির মাথা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে।
(চ) ডেঙ্গু জ্বর : গত বছর বর্ষাকালে এই রোগের ভয়াবহতা আমরা সবাই দেখেছি। ‘এডিস অ্যাজিপ্টাই’ মশার কামড়ের মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু মানবদেহে প্রবেশ করে।
রোগ ছড়ানোর কাজে পুরুষ মশার চেয়ে ভয়ংকর স্ত্রী মশা। পুরুষ মশার গড় আয়ু তিন দিন। স্ত্রী মশা ছয় থেকে আট সপ্তাহ বেঁচে থাকতে পারে। বিশ্বে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মশার প্রজাতি নিয়মিত মানুষকে কামড়ায়। এরা প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের শরীরে রোগজীবাণু সংক্রমণের চালক হিসেবে কাজ করে। এদের মধ্যে সব থেকে বেশি ক্ষতিকর এডিস মশা। এডিস মশার কারণে ছড়ায় ডেঙ্গু, ইয়েলো, জিকা এবং চিকুনগুনিয়া। এক তথ্যে প্রকাশ, ‘বিশ্বের প্রায় ১১০টিরও বেশি দেশে ডেঙ্গু মহামারীর আকার নিয়েছে। পৃথিবী জুড়ে বছরে প্রায় ৫ কোটি থেকে ১০ কোটি মানুষের মধ্যে এটি সংক্রমিত হয়, যার মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, এবং প্রায় ১২,৫০০-২৫,০০০ জনের মৃত্যু ঘটে।’
এডিস শুধু মশা হিসেবে নয়, পৃথিবীতে যত কীটপতঙ্গ আছে তার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক এই কীট। কুইনাইন আবিষ্কারের আগে ভয়ংকর রোগের তালিকায় ছিল ম্যালেরিয়াও। অ্যানোফিলিস মশার কারণে হয় ম্যালেরিয়া। প্রতি বছর, প্রায় ৫১.৫ কোটি মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং প্রাণ হারায় ১০ লাখেরও অধিক মানুষ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, ‘বিশ্বে মোট এক লাখ কোটি প্রজাতি রয়েছে। যার মধ্যে এখন পর্যন্ত মানুষ মাত্র ১% প্রজাতি চিহ্নিত করতে পেরেছে।’ দিন যত যাচ্ছে ততই চেনা হচ্ছে নতুন নতুন রোগ ও নতুন নতুন প্রজাতি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে একদিকে মানুষ দেখছে মঙ্গল গ্রহে ঝবপড়হফ ঐড়সব বানানোর স্বপ্ন, অন্যদিকে এডিশ মশা ও কভিড-১৯ কীট ও অণুজীবরা দুঃস্বপ্ন হয়ে ঘুম কেড়ে নিচ্ছে উঁচুতলার মানুষদের।
‘মশা মারতে কামান দাগা’ উক্তির অর্থের মতো যারা মশাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যভাবে দেখেন তারা ভাবতেই পারেন না মশার শেকড় কত গভীরে। ‘বার্মিজ এক টুকরো অ্যাম্বরে পাওয়া একটি প্রাগৈতিহাসিক মশার ফসিলের বয়স’ থেকে জানা যায় প্রায় বাইশ কোটি ষাট লাখ বছর আগে মশার পূর্বপুরুষদের উদ্ভব। নতুন নতুন রোগ, কীট ও অণুজীব মানুষের দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠার কারণ, একদিকে প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশ রক্ষায় উপকারী প্রজাপতি, ব্যাঙ, কেঁচো, শুঁয়াপোকা, চড়ুই, শকুন, বোলতা, মৌমাছি, মাকড়সা, গুইসাপ ইত্যাদি অন্যদিকে বাড়ছে ক্ষতিকর প্রাণী মশা, মাছি, তেলাপোকা, ছারপোকা, কভিড-১৯ ইত্যাদি কীট ও অণুজীব।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় গত বছরের এ সময়ের তুলনায় বর্তমানে মশার ঘনত্ব বেড়েছে চার গুণ। ঘনত্ব বাড়তে বাড়তে যেদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে সেদিন ‘মশা মারতে কামান দাগা’ উক্তিটি বাগধারার ঢং ছেড়ে সত্যে পরিণত হতে শুরু করবে।
লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
adv.zainulabedin@gmail.com