আমাদের দেশে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ খাবারপ্রাপ্তি ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। মূলত নিরাপদ খাদ্যের প্রাপ্যতাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে কীটনাশক ও রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। এখন বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্যের অভাবে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের দাবি এখন বেশ জোরালো হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের কম-বেশি প্রতিটি জেলায় এখন সবজির ব্যাপক চাষাবাদ হচ্ছে। দেশের উৎপাদিত সবজি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ করে এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি উপযোগী বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘আইপিএম’ (সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা) প্রকল্পের আওতায় মডেল প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন স্থানীয়ভাবে বিষমুক্ত সবজি ভোক্তা পর্যায়ে বিপণন হচ্ছে, অন্যদিকে বিষমুক্ত সবজি বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জিত হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আইপিএম প্রকল্পের অধীনে দেশে ১০টি উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে শুরু করেছে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষ।
আইপিএম প্রকল্পের আওতায় ১০০ একর করে মোট ১ হাজার একর জমিতে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির অধীনে দেশের ১০টি উপজেলায় আইপিএম মডেল ইউনিয়নগুলোতে ২৫টি দল রয়েছে। প্রতিটি দলে ৮ জন নারীসহ মোট ২০ জন সদস্য রয়েছে। কিষান-কিষানীর সমন্বয়ে মোট ৫০০ জনের দল গঠন করে ১০০ একর জমিতে তারা জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে সবজি উৎপাদন করছে। এসব জমিতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ডার্মি কম্পোস্ট সার ও ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনের জন্য রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের তরফ থেকে বিনামূল্যে বীজ, সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ, জৈব বালাইনাশক ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে এই প্রকল্পের সবজি চাষিদের কৃষি বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পরিবেশবান্ধব আইপিএম পদ্ধতিতে সবজির চাষাবাদ গোটা দেশেই সম্প্রসারণ করা উচিত। তাহলে দেশীয় চাহিদা পূরণ করে আরও বড় পরিসরে সবজি রপ্তানি করাও সম্ভব হবে।
এখন বাংলাদেশের শাক-সবজির প্রচুর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে বিদেশের বাজারে। শুধু ইউরোপের বাজার নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের সবজি। যদিও বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে বেশ কয়েক মাস শাক-সবজি রপ্তানি বন্ধ ছিল। কিন্তু করোনার প্রভাব কমে এলে আবার শুরু হয় সবজি রপ্তানি। বছর শেষে এই খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৬৪ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি দেশের সব খাতের রপ্তানির মধ্যে একক পণ্য হিসেবে চতুর্থ সর্বোচ্চ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী,
২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১৩ কোটি ডলারের শাক-সবজি রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকলেও রপ্তানি হয়েছে ১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের। সে হিসাবে এই খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৬ শতাংশ বেশি রপ্তানি হয়েছে। আগের বছর সবজি রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ১০ কোটি ডলারের। অর্থাৎ প্রতি বছরই শাক-সবজি রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের শুকনো খাবার বা ড্রাই ফুডের চাহিদাও বেড়েছে। গত অর্থবছরে কৃষি খাতে মোট রপ্তানি আয়ের ২৫ শতাংশই এসেছে শুকনো খাবার থেকে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে চা, তামাক, ফুল, ফল, মসলাসহ নানা কৃষিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের এসব পণ্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বড় বড় কোম্পানির তৈরি আটা, সুজি, বিভিন্ন ধরনের শুকনা খাবার, হোম ট্রয়লেটিজ, গুঁড়া মসলার চাহিদা বাড়ছে পশ্চিমা বিশ্বে। কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে সরকারও নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এমনকি রপ্তানি নীতিতে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। ফলে সবজি উৎপাদন দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা আশাবাদী, এ ধারা অব্যাহত থাকলে ইউরোপের দেশগুলোয় যেমন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বড় বাজার তৈরি হয়েছে, অনুরূপভাবে শাক-সবজিতেও বড় রপ্তানি বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আমরা সক্ষম হব।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, শাক-সবজি ছাড়াও ফলমূল রপ্তানি হয়েছে ৪ লাখ ৯০ হাজার ডলারের, যা আগের বছরের চেয়ে ৪৮ শতাংশ বেশি। শুকনো খাবার রপ্তানি হয়েছে ১৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের। নানা জাতীয় মসলা রপ্তানি হয়েছে ৩ কোটি ৩২ লাখ ডলারের, যদিও শুকনো খাবার ও মসলার রপ্তানি আগের বছরের চেয়ে কমেছে। কিন্তু চা রপ্তানি হয়েছে ৩১ লাখ ২০ হাজার ডলারের। জীবিত ও হিমায়িত মাছ রপ্তানি হয়েছে ৪৫ কোটি ৬১ লাখ ডলারের। বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসর অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে ৯৮টি দেশে ৪৮ ধরনের প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে। সংগঠনটি মনে করে, পণ্যের মান সনদসহ অন্যান্য রপ্তানি বাধা দূর করা গেলে কৃষি খাত থেকে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রপ্তানির সম্ভাবনাকে সরকারিভাবে আরও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়াও জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালায়েড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, শাক-সবজির ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও নানা সংকটের কারণে পুরোপুরি সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে রপ্তানি কাজের ব্যবস্থাপনায় বিমানবন্দরে বিশেষ স্ক্যানার না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো প্রক্রিয়াজাত খাবার রপ্তানির জন্য বিদেশ থেকে সনদ সংগ্রহ করতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি লাগে। আবার অনেকের পক্ষে তা সংগ্রহ করাও সম্ভব হয় না। ফলে সরকারের তরফে একটি সংস্থা বা ল্যাব স্থাপন করলে ব্যবসায়ীদের এ সংকট যেমন দূর হবে, তেমনি রপ্তানি আয়ও বৃদ্ধি পাবে। অবশ্য ইতিমধ্যেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি ল্যাবরেটরি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই পরীক্ষাগারে পণ্যের মান পরীক্ষা করে সনদ দেওয়া হবে। আশা করা হচ্ছে, এ উদ্যোগকে কার্যকর করলে শাক-সবজি, শুকনো খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে আরও গতি আসবে এবং ব্যাপকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। আর বাস্তবতা হচ্ছে, নিরাপদ রপ্তানি প্রক্রিয়া নিশ্চিত হলে চাষিদের উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে এবং সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, খাদ্যে ভেজাল, কৃষি চাষাবাদে অপরিমিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, ফলমূলে ফরমালিনের ব্যবহার স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষি চাষাবাদই শুধু নয়, মাছ চাষেও ভেজাল খাদ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মানুষ নানারোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকতে হলে নিরাপদ খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। যে কারণে ‘আইপিএম’ পদ্ধতির চাষাবাদকে গোটা দেশেই চালু করতে হবে। যদি বগুড়া, যশোরের চাষিরা বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করতে পারে, তাহলে উদ্যোগ নিলে এবং সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিলে গোটা দেশেই বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। পাশাপাশি সবজি চাষিদের উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাকেও জোরদার করতে হবে। যেন মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের বদলে চাষিরা সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারে। অনেক সময়ই চাষিরা সংরক্ষণের অভাবে পানির দামে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আর আমাদের দেশে এ ধরনের ঘটনা যে ঘটে, যা নতুন কিছু নয়। এ জন্য কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই কেবল সবজি চাষি ও ভোক্তার স্বার্থরক্ষা করা সম্ভব হবে।
লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক
ahairanju@gmail.com