বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত সরকারপ্রধান নির্বাচিত হয়ে প্রথমে কোন দেশে গেলেন? জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটল, যখন প্রথম সফর হিসেবে ঘোষিত হলো মালয়েশিয়ার নাম। মার্কিন চুক্তির চাপ, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন আর চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন এই নিয়ে নানা আলোচনা যখন চলছে, সেই সময় চীন সফর রাজনৈতিক মহলে আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। জানা যাচ্ছে, মালয়েশিয়ার সঙ্গে সংস্কৃতি বিষয়ক সমঝোতা স্মারকসহ তিনটি চুক্তি ও দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় প্রায় ১০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। তাদের দুর্দশার কথা পত্রিকার মাধ্যমে জানা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া হয়ে চীনে গেছেন গতকাল। থাকবেন ২৬ জুন পর্যন্ত। তিনি চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্সে অংশ নিচ্ছেন। সেখানে বিশ্বঅর্থনীতি, উদ্ভাবন, টেকনোলজি এবং এশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় অংশ দেবেন। দালিয়ান থেকে তিনি যাবেন বেইজিং। ২৩ থেকে ২৫ জুন অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে তিনি ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক একটি সেশনে মূল বক্তা হিসেবে যোগ দেবেন। সম্ভবত ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং পরবর্তীসময়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে। সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং উভয়ের সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জানা যাচ্ছে, চীনের সঙ্গে ঢাকার প্রায় ১৫টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে পারে। এর প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ ও চীন এরই মধ্যে বিভিন্ন খাতভিত্তিক খসড়া বিনিময় করেছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো দ্রুত মতামত প্রদান ও আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের জন্য কাজ করছে। শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গণমাধ্যম, উন্নয়ন সহযোগিতাসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অন্তর্ভুক্ত করে এমওইউ স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে যৌথভাবে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ প্রচারে সহযোগিতা পরিকল্পনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য সমঝোতা স্মারক, বাংলাদেশ থেকে চীনে উচ্চমানের পণ্য রপ্তানির যৌথ কর্মপরিকল্পনা, মুক্ত বাণিজ্য ও বহুপক্ষীয় সমর্থনের জন্য সমঝোতা স্মারক, সবুজ উন্নয়নে বিনিয়োগ সহযোগিতা প্রচারের জন্য সমঝোতা স্মারক, বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন প্রচারের জন্য সমঝোতা স্মারক, চীন ও বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক, মানবসম্পদ উন্নয়ন সহযোগিতা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সমঝোতা স্মারক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার কাঠামো চুক্তি, মোংলা সুবিধা প্রকল্প, চায়না মিডিয়া গ্রুপ ও বাংলাদেশ তথ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতাসহ আরও কয়েকটি এমওইউ সই হতে পারে। এর অর্থনৈতিক তাৎপর্য এবং যত রাজনৈতিক তাৎপর্য তার চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বরাজনীতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, মার্কিন প্রভাব সব কিছুতে প্রভাব পড়তে পারে বিভিন্ন চুক্তি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল, নিঃসন্দেহে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু করা। কিন্তু এই বন্ধ হওয়া বাজার কীভাবে খুলবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আসলে সম্ভাবনা ও প্রতারণার এক ইতিহাস। ১৯৭৮ সালে মাত্র কয়েকজন কর্মী পাঠানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শ্রমিক পাঠানোর পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা এখন লাখ লাখ মানুষের জীবিকা ও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের একটা বিরাট অংশের ধনী মানুষ মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম বিবেচনা করে বাড়ি কিনেছেন, বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশুনা করে, বাণিজ্যও একেবারে কম নয়। ফলে আলোচনাটা অনেক বিষয় নিয়েই হয়তো চূড়ান্ত হয়েছে।
আশঙ্কা হচ্ছে, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চললে আবারও পুরনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হতে পারে। কারণ ঐ চুক্তিতে যোগ্য এজেন্সি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা, মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে অতীতের সেই বিতর্কিত সিন্ডিকেট ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে একটি চিঠির মাধ্যমে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্তের ভিত্তিতে কর্মী পাঠাতে সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তালিকা চেয়েছিল। এই শর্তগুলো বাস্তবায়ন কঠিন মনে হওয়ায়, মালয়েশিয়া সরকারকে অন্তত তিনটি শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানিয়েছিল বাংলাদেশ। শর্তগুলো হলো গত পাঁচ বছরে অন্তত ৩ হাজার প্রবাসীকর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকা ও তিন বছর ধরে অন্তত ১০ হাজার বর্গফুটের একটি স্থায়ী অফিস স্পেস থাকা। বাকি শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, অন্তত পাঁচ বছরের বৈধ লাইসেন্স থাকা, কমপক্ষে তিনটি দেশে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, গুড কন্ডাক্ট সার্টিফিকেট ও বলপূর্বক শ্রম বা মানব পাচারে জড়িত থাকার কোনো রেকর্ড না থাকা। বাংলাদেশে আড়াই হাজার এজেন্সি সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত। এদের মধ্যে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা মালয়েশিয়া সরকারকে দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এখনো কোনো সমাধান হয়নি।
এ রকম একটি সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর নিয়ে দেশে ও প্রবাসে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। মাঝে মাঝেই বন্ধ হওয়া এবং বর্তমানে স্থবির মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু হবে কি না, অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের বৈধকরণ কীভাবে হবে, দূতাবাসের সক্রিয়তাসহ প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার সমাধান এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক কি নতুন রূপ নেবে কি না? এসব প্রশ্ন মিলে এই সফর নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষত মালয়েশিয়ায় বসবাসরত লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর কাছে এই সফর কেবল একটি কূটনৈতিক ঘটনা নয়; বরং এটি তাদের জীবিকা, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ জীবন এবং দেশে ফিরে আসার সঙ্গে যুক্ত। তাই সাধারণভাবে প্রত্যাশা যে, দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত শ্রমবাজার সংকট, ভিসা জটিলতা, প্রবাস গমন ব্যয়, বাংলাদেশের কনস্যুলার সেবা এবং অনথিভুক্ত কর্মীদের সমস্যার সমাধানের একটি পথ খুঁজে পাওয়া গেছে ।
আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, শুধু শ্রমবাজার খুলে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অভিবাসনব্যবস্থার গভীরে থাকা কাঠামোগত যেসব সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে, সেসব সমাধানের পথ খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সফর কীভাবে ভূমিকা পালন করেছে সেটা ভবিষ্যতে জানা যাবে। গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, বাজার খোলা এবং বাজার বন্ধ হওয়ার পুনরাবৃত্ত চক্রের মধ্যেই আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। ২০০৮ সালে বন্ধ, ২০১৬ সালে আবার চালু, ২০১৮ সালে আবার বন্ধ, ২০২২ সালে নতুনভাবে চালু এবং ২০২৪ সালে আবার স্থগিত করা এই চক্রে আবর্তিত সমস্যা শুধু বাজার খোলা বা বন্ধ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমস্যার বীজ শ্রম অভিবাসনব্যবস্থার ভেতরেই লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় অভিবাসন ব্যয় অত্যন্ত বেশি। দুই বছরের চুক্তিতে ব্যয়ের টাকা তুলতে এবং দেশে ফিরে এসে নতুনভাবে জীবন শুরু করা সম্ভব হয় না। ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও কর্মীরা দেশে ফিরতে চায় না এবং অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় থেকে যায়। এর কোনো সমাধান হয়েছে কি না, জানা নেই।
আরেকটি নতুন সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস এবং অটোমেশন আগামী দশকে বহু স্বল্প দক্ষ চাকরি কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি নতুন দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি হবে। নির্মাণ, উৎপাদন এবং সেবা খাতের অনেক কাজ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। আজ যে সমস্ত কাজের জন্য হাজার হাজার শ্রমিক দরকার হচ্ছে আগামী দিনে সেই কাজ কয়েকশ দক্ষ প্রযুক্তিবিদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্পন্ন করা যাবে। আবার এক্ষেত্রে নতুন ধরনের কাজ সৃষ্টি হবে। তবে উপযুক্ত দক্ষতাও দরকার হবে। ফলে নতুন কাজের ক্ষেত্রও তৈরি হবে। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং নেপালের মতো দেশগুলো দক্ষ কর্মী তৈরিতে বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশ যদি সেই বিষয়কে অবহেলা করে শুধু বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে রেমিট্যান্স অর্জনের পুরনো ধারণা নিয়েই চলে, তাহলে ভবিষ্যতে যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তা অতিক্রম করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এই বাস্তবতার নিরিখে ‘বেশিসংখ্যক কর্মী’ নয়, বরং ‘বেশি বেশি দক্ষ কর্মী’ তৈরি করার পদক্ষেপ নেওয়াটাই বাংলাদেশের অভিবাসন লক্ষ্য হওয়া উচিত।
মালয়েশিয়া প্রায় সাড়ে তিন লাখ বর্গ কিলোমিটারের দেশ, জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটির একটু বেশি।
কৃষিভিত্তিক শিল্প, মাঝারি ও ভারী শিল্প, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, শ্রমিকের মজুরি ও নিরাপত্তা, জাতীয় আয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা এসব বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে থাকা দেশ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বাইরে মালয়েশিয়া একটি বড় শ্রমবাজার। পাম বাগান, নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি খাত আছে যেখানে স্বল্প দক্ষতার, স্বল্প মজুরির শ্রমিক প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ এসবের জোগানদাতা। বিপুল বেকারত্ব ও বিদেশে যাওয়ার আগ্রহের কারণে, বাংলাদেশি শ্রমিকদের পছন্দের তালিকায় মালয়েশিয়া আছে। নিপীড়ন এবং প্রতারণার নানা বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটছে সেখানে। এর সঙ্গে যুক্ত আছে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের বিষয়। এসবের অবসানে প্রধানমন্ত্রীর সফর ভূমিকা রেখেছে কি না, তা জানা যায়নি। তেমনি চীনের সঙ্গে কোন ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই হবে, তা জানা যাবে কয়েক দিন পর।
লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক