মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় দেশে আবারও লকডাউনের ঘোষণা আসতে পারে, এমন গুজবে বড় দরপতন হয়েছে পুঁজিবাজারে। গুজবে প্রভাবিত হয়ে একশ্রেণির বিনিয়োগকারীর শেয়ার বিক্রির চাপে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক গতকাল ৮১ পয়েন্ট কমে গেছে। যদিও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, দেশে আবার কখনো যদি লকডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরিও হয় এবং ব্যাংক যদি খোলা থাকে, তাহলে বাজার চালু থাকবে। লকডাউনে দীর্ঘদিন বাজারের লেনদেন বন্ধ থাকার পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে গুজবটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ভীত হয়ে হাতে থাকা শেয়ার বিক্রির উদ্যোগে লেনদেন হওয়া সিকিউরিটিজের ৯০ শতাংশের দর কমে যায়। আর দীর্ঘদিন ধরে ফ্লোর প্রাইসে আটকে থাকার কারণে ৯২টি শেয়ারের দর অপরিবর্তিত থাকে। গুজবের বিষয়ে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে কোনো কারণে লকডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও ব্যাংক যদি খোলা থাকে, তাহলে পুঁজিবাজারের লেনদেন বন্ধ হবে না। এটি পুরোপুরি একটি গুজব। তিনি জানান, লেনদেন ব্যবস্থা এখন সবই অটোমেটেড। ওয়ার্কস্টেশনে শুধু ট্রেডার আসলেই হয়। এখন বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী সরাসরি ব্রোকারেজ হাউসে উপস্থিত থেকে লেনদেন করেন না। অধিকাংশই ফোন, ই-মেইল, মোবাইল অ্যাপস ইত্যাদি মাধ্যম ব্যবহার করেন লেনদেনের ক্ষেত্রে। তাই শুধু ব্যাংক খোলা থাকলেই লেনদেন চালু রাখা সম্ভব। একই মন্তব্য করেছেন ডিএসইর ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মতিন পাটোয়ারী। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, ব্যাংক খোলা থাকলে পুঁজিবাজারের লেনদেন চালু থাকবে। তবে এজন্য ইন্টারনেট সেবাসহ অন্যান্য সহায়ক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। লকডাউনে পুঁজিবাজার বন্ধের গুজবে গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই অনেক বিনিয়োগকারী সতর্কতার অংশ হিসেবে শেয়ার বিক্রি করে সাইড লাইনে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। এতে হঠাৎ করে বিক্রিচাপ বেড়ে যাওয়ায় শুরু থেকেই সূচক বড় পতনের দিকে এগিয়ে যায়। লেনদেন শেষে সূচক ৮১ পয়েন্ট কমে ৫৪৩৪ পয়েন্টে নামে। ডিএসই একদিনে বাজার মূলধন হারায় প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে করোনা সংক্রমণের পরিমাণ বাড়ছে। গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে ২ হাজার ১৮৭ জন নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যা গত ১০০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ৮ ডিসেম্বর ২ হাজার ২০২ জন সংক্রমিত করোনা রোগী শনাক্ত হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, করোনায় দেশে এ পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ৬২৪ জন করোনায় মারা গেছেন। গত ডিসেম্বরে দেশে করোনা রোগী শনাক্তের পরিমাণ কমে আসার পর গত এক মাসে তা আবারও বাড়তে শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের অনেকের আশঙ্কা, সংক্রমণ বাড়তে থাকলে আবারও লকডাউনে ফিরে যেতে পারে দেশ। তেমন হলে পুঁজিবাজারের লেনদেনও বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যেমনটা করোনা সংক্রমণের শুরুতে গত বছরের মার্চে হয়েছিল। সে সময় লকডাউনের কারণে টানা ৬৬ দিন পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ ছিল। যদিও ওই বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যাংকের কার্যক্রম চলেছিল। তবে এখন স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি সক্ষমতা বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসইসির উদ্যোগে স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। এদিকে দেশে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১২ পরামর্শ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের জানান, আমরা চাই দেশের অর্থনীতি ভালো থাকুক। লকডাউন আমরা করতে পারব না। এরা সরকারের সব সংস্থা মিলে সিদ্ধান্ত নেবে। আগামীতে দেখব কী সিদ্ধান্ত হয়। আমরা আমাদের কার্যক্রম জোরদার করছি। গতকাল লকডাউনের এই গুজবের জেরে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া সিকিউরিটিজের মধ্যে ২৩৯টির দর কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ২৬টির দর। গতকাল সবচেয়ে বেশি দর কমেছে সিমেন্ট, সাধারণ বীমা কোম্পানি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, এনবিএফআই ও বিবিধ খাতের শেয়ার দর। এসব কোম্পানি গতকাল ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত দর হারিয়েছে। এছাড়া সূচকে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাংক ও টেলিকম খাত ১ শতাংশের বেশি দর হারিয়েছে। অবশ্য গতকাল পতন যে হারে হয়েছে, লেনদেনের পরিমাণ ততটা কমেনি।