শাল্লার গ্রামে হেফাজত সমর্থকদের হামলা

প্রতিবাদে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ

সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় শাল্লা থানায় একটি মামলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নোয়াগাঁও গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যক্তি এ মামলা করেন বলে জানিয়েছেন থানাটির ওসি নাজমুল হক। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই হামলায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ।

এদিকে নোয়াগাঁও গ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে হামলার পর গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন র‌্যাবের ডিজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। এ সময় তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের কঠোর হাতে দমন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন। গতকাল বেলা ১১টায় র‌্যাব মহাপরিচালকসহ বাহিনীটির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা নোয়াগাঁও গ্রামে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি ঘুরে দেখেন। পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাবপ্রধান বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে। আজকের মধ্যেই মামলা হবে। অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াবে সরকার।’

গ্রামবাসীকে ভয় না পাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। আজ থেকে র‌্যাব ক্যাম্প হবে। সরকার আপনাদের পাশে আছে। এ দেশ হিন্দু-মুসলিমসহ সবার। এ চিন্তা করেই সরকার কাজ করছে এবং এজন্য দেশের অগ্রগতি হচ্ছে।’

অন্যদের মধ্যে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান এবং শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মুক্তাদীর আহমদ র‌্যাবপ্রধানের সঙ্গে ছিলেন।

র‌্যাবপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর গতকাল বিকেলে নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যক্তি বাদী হয়ে শাল্লা থানায় একটি মামলা করেন বলে জানিয়েছেন শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হক। তবে মামলার বাদী বা আসামিদের সংখ্যা সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি তিনি। এছাড়া নোয়াগাঁও গ্রামের ওই হামলার ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলেও জানান ওসি নাজমুল।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতা মামুনুল হককে ফেইসবুকে কটাক্ষ করার অভিযোগ তুলে তার সমর্থকরা গত বুধবার সকালে নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর ও মন্দির ভাঙচুরের পাশাপাশি লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে তার ফেইসবুক আইডি থেকে মামনুল হককে কটাক্ষ করে স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগ তুলে ওই হামলা হয়। এ ঘটনায় সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত নোয়াগাঁও ও হবিবপুর গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভয়ে গ্রামছাড়াদের অনেকে এখনো বাড়ি ফেরেননি। পুরুষরা ঘরবাড়ি দেখাশোনার জন্য বাড়ি ফিরলেও নারী ও শিশুদের বাড়ি নিয়ে আসেননি অনেকে।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ : এদিকে নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় হেফাজত নেতা মামুনুল হকসহ জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সিলেটে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন-সমাবেশ করেছে সামাজিক সংগঠন ‘দুষ্কাল প্রতিরোধে আমরা’। গতকাল বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। বিক্ষোভ মিছিলটি জিন্দাবাজার পয়েন্ট ঘুরে শহীদ মিনারে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।

বক্তারা বিতর্কিত হেফাজত নেতা মানুনুল হককে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বলেন, মুজিববর্ষের শুরুর দিকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আলোচনায় উঠে আসেন মামুনুল হক। এরপরও সরকার বিতর্কিত এ নেতাকে গ্রেপ্তার না করে উল্টো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাহফিল করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

সরকারের তোষণ নীতির ফলে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদের উত্থান ঘটছে : সুনামগঞ্জের শাল্লায় ঘরবাড়িতে হামলা ও লুটপাট এবং মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। সংগঠনের নেতারা বলছেন, সরকারে তোষণ নীতির ফলে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদের উত্থান ঘটছে। নীতিহীন রাজনীতির কারণেই দেশ বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। গতকাল ছাত্র ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক মাহির শাহরিয়ার রেজার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়।

এছাড়া নোয়াগাঁও গ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি, মন্দিরে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের হামলা, ভাঙচুর, লুটপাটের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। গতকাল বামজোটের নেতারা এক বিবৃতিতে বলেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে দেশ স্বাধীন করলেও স্বাধীনতার ৫০ বছরে শাসকশ্রেণি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র কায়েম থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।