আজ রবিবার আন্তর্জাতিক বনভূমি দিবস। দিবসটি সামনে রেখে প্রতি বছরই নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বনভূমি রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না কর্র্তৃপক্ষ। বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে দখল হচ্ছে বনভূমি। বন ও পরিবেশবিষয়ক সংসদীয় কমিটির হিসাবে সারা দেশের ২৮ জেলায় ২ লাখ ৫৭ হাজার একর বনভূমি বেহাত হয়েছে। ১ লাখ ৬০ হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জড়িত এই দখলে। রাজনৈতিক চাপসহ নানা কারণে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে না কোনো পদক্ষেপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন উজাড়ের মচ্ছবে এক দিকে যেমন জীববৈচিত্র্য হুমকির হুমে পড়েছে, তেমনি হুমকিতে পড়েছে মানবস্বাস্থ্যও।
৫০ বছরে বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে টিকে আছে মাত্র ২৩ লাখ হেক্টর, যা মোট ভূখণ্ডের ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অথচ একটি দেশের সুস্থ, সুন্দর ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের জন্য ভূখণ্ডের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা অপরিহার্য। সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যে হারে বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকে দেশের বনভূমির হার নেমে আসবে মাত্র ৫ শতাংশে। বন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চরম দুর্নীতি, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা আর ক্ষমতাধর একশ্রেণির লোভী মানুষের কারণে উজাড় হচ্ছে বন।
সম্প্রতি সংসদীয় কমিটির দেওয়া হিসাবে দেশের ২৮টি জেলায় ১ লাখ ৬০ হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার একর বনভূমি দখল করে রেখেছে। এর মধ্যে সংরক্ষিত বনই ১ লাখ ৩৮ হাজার একর। আর তার দখলে আছে অন্তত ৮৮ হাজার ২২৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি কক্সবাজারের। সেখানে মোট দখল হওয়া জমির পরিমাণ ৫৯ হাজার ৪৭১ একর; যা সারা দেশের বেহাত হওয়া বনভূমির ২০ শতাংশের বেশি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১২ সাল থেকে বন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে প্রতি বছরের ২১ মার্চ আন্তর্জাতিক বন দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বন পুনরুদ্ধার উত্তরণ ও কল্যাণের পথ প্রতিপাদ্যে আজ রবিবার দিবসটি পালিত হবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বন দখল ও ধ্বংস সরকারি ও বেসরকারি দুই উদ্যোগেই ঘটেছে। পরিবেশের হুমকি জেনেও ১ লাখ ৬০ হাজার একর বনভূমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া হয়েছে ৪৩ হাজার ৯৫ একর জমি। এ ছাড়া অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২১ একর বনভূমি। সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে দখলদারদের নামসহ তথ্য-উপাত্ত জমা দিয়েছে বন বিভাগ। ওই কমিটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বনভূমি দখলকারীদের নাম প্রকাশ করতে বলেছে; যাতে করে জনগণ তাদের শনাক্ত করতে পারে এবং দখলদারদের তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়।
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কমিটি বনভূমি দখলকারীদের একটি সম্পূর্ণ এবং বিস্তারিত তালিকা পেয়েছে। এটি পাঁচ হাজার পৃষ্ঠার এক বিশাল নথি। দখলকৃত এসব বনভূমি দ্রত উদ্ধারে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে যেন ভালো পরিমাণ বনভূমি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছে কমিটি। জবাবে কমিটিকে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয় দখলদারদের কাছ থেকে বনভূমি উদ্ধার করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি দিয়েছে।
বন বিভাগের মতে, গত এক বছরের ব্যবধানে ৫৩৪ একর বনভূমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বনভূমি হস্তান্তরের সুপারিশ করার পাশাপাশি সংসদীয় কমিটি প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ ছাড়া কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে উন্নয়নের নামে বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া বন্ধ করতে বলেছে। ৫০ বছরে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি বেদখল হয়েছে সবচেয়ে বেশি। কতজন দখলদার এসব জমি দখল করে নিয়েছে, তারও সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই বন বিভাগের কাছে।
নাম প্রকাশ না করে বন বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ১ লাখ ৪০ হাজার একরের মধ্যে জবরদখল হওয়া জমির পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার ১৩০ একর। এর মধ্যে মিরসরাইয়ে ৩ হাজার ৩২ একর, সীতাকুণ্ডে ৩৫০, ফটিকছড়িতে ৮ হাজার ২৯৫, হাটহাজারীতে ৩৯৩, রাউজানে ৬৪৭ ও রাঙ্গুনিয়ায় ৪১৪ একর জমি বেদখল হয়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সবচেয়ে বেশি জমি বেদখল হয়েছে ফটিকছড়ি উপজেলার সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনাঞ্চলের। উত্তর বন বিভাগের ১৯টি রেঞ্জের ৩৫টি বিটের কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ হাজার একর বনভূমি দখলে রেখেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। বিভিন্ন সময়ে এসব জমি উদ্ধার করা হলেও কয়েক দিন পরেই তা আবারও দখল করে নেন দখলকারীরা। বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, চট্টগ্রামের বনাঞ্চলকে উত্তর, দক্ষিণ ও উপকূলীয় বনাঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। তার মধ্যে উত্তর বন বিভাগের আওতায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিমাণই বেশি। মূলত মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার বনাঞ্চল নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ। এই বনাঞ্চলে ১৯টি রেঞ্জের ৩৫টি বিটে সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৩৭ একর। কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামে বনের জবরদখল হওয়া জমির একটি তালিকা করা হলেও তা পূর্ণাঙ্গ ছিল না।
বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজকে দেশের বন বিভাগের চিত্র হতাশা ও উদ্বেগজনক থাকলেও অতীত ছিল অনেক গৌরবের। দেশ স্বাধীনের পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব বিষয়ে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রথম কাজ শুরু করেছিলেন। দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণ, উপকূল সংরক্ষণে বনায়ন-পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, হাওর-বাঁওড়, নদ-নদী ও অন্যান্য জলাভূমি সংরক্ষণ, ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম প্রতিষ্ঠাসহ প্রকৃতি ও মানুষের কল্যাণে নানাবিধ প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। মূলত তার এমন উদ্যোগ স্মরণীয় করে রাখতে মুজিব বর্ষ উপলক্ষে বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনগণের মাঝে বিনামূল্যে ১ কোটি চারা বিতরণ করা হয়।
তিনি দাবি করেন, সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বর্তমানে বাংলাদেশের বৃক্ষ আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দেশের মোট আয়তন ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে; যা ২০২৫ সালের মধ্যে ২৪ শতাংশের বেশি উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়ে ইতিমধ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চলতি বছর থেকে নতুন করে আরও কিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করছি।