পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয়ে খোদ পুলিশ সদস্যদের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতারণা করে আসছে ‘সংঘবদ্ধ’ একটি চক্র। প্রথমে পুলিশের ডিআইজি বা এআইজি পরিচয় দিয়ে অন্য সদস্যদের মোবাইলে কল করত চক্রটির সদস্যরা। পরে সিম রেজিস্ট্রেশনের কথা বলে পরিবারের বাকি সদস্যদেরও ফোন নম্বর চেয়ে নিত তারা। এরপর টার্গেট করা ওই পুলিশ সদস্যের ফোন নম্বরটিও কৌশলে ডাইভার্ট করে নিত প্রতারকরা। একপর্যায়ে ওই পুলিশ সদস্য সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে জানিয়ে তাৎক্ষণিক টাকার প্রয়োজনের কথা বলে তার পরিবারের সদস্যদের কাছে ফোন করত তারা। কখনো আবার নারী নিয়ে অবৈধ কাজ করতে গিয়ে ওই পুলিশ সদস্য আটক হয়েছেন, সুরাহা করতে টাকা লাগবে জানিয়েও ফোন করা হতো। এতে ওই ভুক্তভোগী পরিবারটি তাদের আপনজনকে ফোন করতে গেলে কল চলে যেত প্রতারকদের কাছে।
এ ঘটনায় মো. জাকির হোসেন (২৬) নামে চক্রটির হোতাকে গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর মগবাজার বিটিসিএল কলোনি থেকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা গুলশান বিভাগ (ডিবি)। এ সময় তার কাছ থেকে ৫০০ পিস ইয়ারাও উদ্ধারের কথাও জানায় তারা।
ডিবির ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে এর আগেও অস্ত্র, মাদক ও প্রতারণার ১১টি মামলা রয়েছে। কখনো সে ডিআইজি মাসুদ ওরফে এআইজি মাসুদ, আবার কখনো ইন্সপেক্টর মাসুদ, কখনো-বা অ্যাডভোকেট শাহপরান, কখনো ডাইরেক্টর হেদায়েত পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করত সে। সে একজন পেশাদার প্রতারক। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার বিজয়নগর থানার চর ইসলামপুরে তার বাড়ি। দুর্গম এই এলাকায় বসবাস করে সে গত সাত থেকে আট বছর বিভিন্ন পরিচয়ে প্রতারণা করে আসছে। কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত বিভিন্ন পদমর্যাদার সদস্য ও তার পরিবারকে ফোন করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, বিভাগীয় মামলার ভয়, চলমান মামলার দিকনির্দেশনা, নানা রকমের তদবির করে আসছিল সে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছরের ২৫ জুলাই চক্রটির কবলে পরেন পুলিশ পরিদর্শক অশীত কুমার মিত্র। প্রতারণার শিকার হয়ে নড়াইল সদর থানায় একটি জিডিও করেন তিনি। জিডি সূত্রে জানা যায়, অশীত কুমার মিত্রের পরিবারের কাছ থেকে সড়ক দুর্ঘটনার কথা বলে ৩৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। এর আগে অশীত কুমার মিত্রের মোবাইল নম্বরটি ডাইভার্ট করে এর নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রতারকরা। ২০১৬ সাল থেকে আজ অবধি নয়টি পুলিশ সদস্যের পরিবারের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জাকির। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনবার জেলও খেটেছে সে। প্রতিবার জামিনে মুক্তি পেয়ে ফের একই কাজ করছে। প্রতারণার কাজে পুলিশের ব্যবহৃত ফোন নম্বরের সঙ্গে হুবহু মিল রেখে সিম নম্বর কেনে জাকির। এরপর ডিআইজি বা আইজি মাসুদ পরিচয়ে প্রথমে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের অফিসারদের ফোন করত সে।
ডিবি গুলশান জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মাহবুবুল হক সজীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চক্রের একজনকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও প্রতারণার ১১টি মামলা রয়েছে। চক্রের অন্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই।’