রজব পেরিয়ে শাবান মাস চলছে। কিছু দিন পর আকাশে দেখা যাবে রমজানের আলো ঝলমলে বাঁকা চাঁদ। রমজানের অপেক্ষায় সুখময় অস্থিরতায় কাটছে মুমিন বান্দার দিন। তার জীবনজুড়ে শুরু হয়ে গেছে ইবাদতের সাজ সাজ রব। সে অপেক্ষায় আছে পবিত্র রমজানের। সে রমজানের জন্য সাজিয়ে নিচ্ছে তার জীবন। রমজানের প্রস্তুতি নিতে মুহাম্মদ (সা.) উম্মতদের শিক্ষা দিয়েছেন। রজব ও শাবান মাসজুড়ে তিনি দোয়া করতেন। প্রস্তুতি নিতেন। আল্লাহর দরবারে রমজানে ইবাদত করার সুযোগ চাইতেন। আমাদের উচিত, রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। রমজানের প্রস্তুতি আমরা এভাবে নিতে পারি-
দৃঢ় সংকল্প
জীবনের বিগত সব রমজান থেকে এই রমজানে সুন্দরভাবে ইবাদত করার দৃঢ় সংকল্প করা। আমল, ইস্তিগফার, ইবাদতে সময় কাটানোর নিয়ত করা। রমজানে কোন কোন আমল বেশি করা হবে; তা ঠিক করা। এই রমজান যেন বিগত বছরের রমজান থেকে আলাদা হয়। সাহাবি ওমর (রা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি, ‘কাজ (এর প্রাপ্য হবে) নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফলন পাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ০১)
বেশি বেশি দোয়া করা
আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি খুশি হন। প্রার্থনা কবুল করেন। কোনো সময় প্রার্থনার চেয়ে বাড়িয়ে দেন। বলতে হবে, হে আল্লাহ! আমার জীবনে বরকত দিন। সুস্থতা দিন। আমার দেহে শক্তি দিন। রমজান পর্যন্ত আমার হায়াতকে প্রলম্বিত করুন। রহমত বরকত হাসিল করার তৌফিক দিন। আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। নিশ্চয় আমি কাছেই আছি। আমি দোয়াকারীর দোয়া কবুল করি। যখন সে আমার কাছে দোয়া করে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৬) হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘দোয়া মুমিনের হাতিয়ার।’ (কানযুল উম্মাহ ২/৮৩)
পূর্ব পরিকল্পনা
রমজানের আগে কাজের একটি তালিকা তৈরি করুন। কায়িক পরিশ্রমের কাজ গুটিয়ে ফেলুন। বই পড়ার ইচ্ছা থাকলে এখনই সংগ্রহ করুন। পরিবারের সবার সঙ্গে রমজান কাটানোর ব্যাপারে পরামর্শ করুন। সম্ভব হলে, শেষ দশ দিন ইতিকাফের নিয়ত করুন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের ইচ্ছা করে, অথচ এখনো সে তা পূর্ণ করেনি, তথাপি তার জন্য একটি নেকি লেখা হবে। যদি সে ওই কাজটি করে ফেলে, তাহলে তার জন্য দশ থেকে সাতশ; বরং অগণিত নেকি লেখা হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩৫)
রমজানের ফাজায়েল ও মাসায়েল শিক্ষা
রমজানের ফাজায়েল নিয়ে আলোচনা করুন। ফাজায়েল জানলে আমল করতে সুবিধা হবে। প্রয়োজনীয় মাসায়েল শিক্ষা করুন। ফাজায়েল ও মাসায়েলের বই পড়–ন। কোন কাজ করা যাবে আর কোন কাজ করা যাবে না সে সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করুন। ইসলামের মাসয়ালা সম্পর্কে জ্ঞাত এমন নির্ভরযোগ্য ইমাম, আলেমকে জিজ্ঞেস করুন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম, যে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০২৭)
বিগত রমজানের কাজা আদায়
রমজানের রোজা মুসলমান, বালেগ, সুস্থ, বাড়িতে অবস্থানকারীর ওপর ফরজ। রোজা কাজা (ছুটে) হয়ে গেলে তা আদায় করা আবশ্যক। বিগত রমজানের রোজা কাজা হয়ে গেলে শাবান মাসে আদায় করুন। রমজান আসার আগে অতীতের পাপের বোঝা ঝেড়ে ফেলুন। আয়েশা (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমার ওপর রমজানের রোজা কাজা হয়ে যেত, তা পরবর্তী শাবান ছাড়া আদায় করতে পারতাম না। ইয়াহিয়া (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.)-এর ব্যস্ততার কারণে কিংবা নবী (সা.)-এর সঙ্গে ব্যস্ততার কারণে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৫০)
নামাজে মনোযোগ
অনেকে চিন্তা করে, রমজান আসলে নামাজ শুরু করব। তাদের জন্য এখনই নামাজে মনোযোগী হওয়া দরকার। জামাতের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা প্রয়োজন। আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই মুমিনরা সফল হয়েছে। যারা নিজেদের নামাজে বিনয়াবত। আর যারা অনর্থক কথা কাজ থেকে বিমুখ।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ১-৩)
গুনাহ ও বদভ্যাস পরিত্যাগ
গুনাহ ও বদভ্যাসের কাজ পরিত্যাগ করুন। রমজানের অপেক্ষা করবেন না। অন্যথায়, রমজানের বরকত থেকে বঞ্চিত হবেন। গুনাহ করতে করতে রমজানে প্রবেশ করলে, রমজানের বরকত লাভ হবে না। এখনই আত্মশুদ্ধি অর্জনের চেষ্টা করুন। রমজানের পবিত্রতা বজায় রাখুন। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য গুনাহ ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই যারা গুনাহ করে, অচিরেই তাদের কৃতকর্মের বদলা দেওয়া হবে।’ (সুরা : আনয়াম, আয়াত : ১২০)
কোরআন তিলাওয়াত
এখন থেকেই অল্প অল্প কোরআন তিলাওয়াত করুন। কোরআন পড়তে না জানলে, আলেমের কাছে গিয়ে শিখুন। যারা নিয়মিত তিলাওয়াত করতেন, বাড়িয়ে দেন। রমজানে বেশি কোরআন খতম দেওয়ার চিন্তা করুন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআন তিলাওয়াত করে. তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে, এ লেবুর মতো যা সুস্বাদু এবং সুগন্ধযুক্ত। আর যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে না, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে, এমন খেজুরের মতো, যা সুগন্ধহীন, কিন্তু খেতে সুস্বাদু। আর ফাসিক-ফাজির ব্যক্তি যে কোরআন পাঠ করে, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে রায়হানজাতীয় লতার মতো, যার সুগন্ধ আছে, কিন্তু খেতে বিস্বাদ। আর ওই ফাসিক যে কোরআন একবারেই পাঠ করে না, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ওই মাকাল ফলের মতো, যা খেতেও বিস্বাদ এবং যার কোনো সুগন্ধও নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০২০)
সদকা
গরিব, মিসকিনদের খোঁজ-খবর নিন। সাধ্যমতো দান-সদকা করুন। রমজানের প্রস্তুতি নিতে তাদের সহযোগিতা করুন। তাদের ইফতার ও সাহরির ব্যবস্থা করুন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে আদম সন্তানেরা, তোমরা অকাতরে দান করতে থাকো, আমিও তোমাদের ওপর ব্যয় করব। নবী (সা.) আরও বলেন, আল্লাহর ডান হাত প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ। রাত দিন অনবরত ব্যয় করলেও তা মোটেই কমছে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১৯৮)
আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান
আপনার পরিবারে রমজান বিষয়ক সচেতনতা তৈরি করুন। সম্ভব হলে, মহল্লার মসজিদে নির্ভরযোগ্য আলেম এনে রমজানের গুরুত্ব, ফজিলত ও আমল সম্পর্কে সেমিনার করুন। আল্লাহ বলেন, ‘আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎ কর্ম করে এবং বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : হা-মিম আস সাজদা, আয়াত : ৩১)