২০১৯ সালের আইপিএলের একটি ম্যাচে প্রসিদ্ধ কৃষ্ণের বোলিং দেখে বিরাট কোহলি বলেছিলেন, ‘২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এই ছেলেটা আমাদের দলের বিস্ময় হতে পারে। অসাধারণ বোলার।’ আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রুনাল পান্ডিয়ার অভিষেক ম্যাচে ৫৮ রানের ইনিংস দেখে কিরণ মোরে বললেন, ‘আমার মতে ক্রুনাল অনেক বেশি লড়াকু। ক্রিকেটে সাফল্য পাওয়ার জন্য সেই ছোটবেলা থেকে লড়াই করে আসছে। আজকের এই ইনিংস দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা অনেকদিন মনে রাখবে। তবে দুঃখের ব্যাপার হলো হিমাংশু ভাই তার বড় ছেলের এমন মারকুটে ব্যাটিং দেখে যেতে পারল না।’
মঙ্গলবার পুনেতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একই ওয়ানডেতে অভিষেক প্রসিদ্ধ-ক্রুনালের। দুজনই রেকর্ড গড়েছেন। সাফল্য তাদের এক বিন্দুতে দাঁড় করিয়েছে। তবে উঠে আসার গল্প দুজনের আলাদা। ভারত ‘এ’ দলের হয়ে একাধিক বিদেশ সফর করে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে আইপিএলে প্রসিদ্ধের উত্থান। গত তিন বছর নাইটদের হয়ে আইপিএলে ২৪ উইকেট নিয়েছেন তিনি। ২০১৮-১৯ মৌসুমে বিজয় হজারে ট্রফিতে ৭ ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়েছিলেন। এবার ৭ ম্যাচে ১৪ উইকেট নেন কর্নাটকের এই পেসার। অর্থনীতিতে ¯œাতক প্রসিদ্ধ সচ্ছল পরিবারের সন্তান। বাড়ি বেঙ্গালুরুতে। ভারতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ঘরের মাঠ ও বিদেশে ভারত ‘এ’ দলের হয়ে একাধিক ম্যাচ খেলেছি। এই সফরগুলো আমাদের মতো তরুণদের খুবই সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে সাহায্য করেছে নাইট শিবির। আমাদের দলে একাধিক তারকা। শুভমান গিল, আন্দ্রে রাসেল, ইউয়েন মরগান, দিনেশ কার্তিকদের মতো ব্যাটসম্যানের বিরুদ্ধে নেটে বোলিং করার পাশাপাশি সাবেক বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। তাছাড়া গত তিন বছর আইপিএলে একাধিক ম্যাচ খেলার সুবাদেও নিজের ভুলত্রুটির ব্যাপারে অনেক কিছু উপলব্ধি করেছি।’ সেই উপলব্ধি থেকে নিজের শক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল প্রসিদ্ধ, ‘ধারাবাহিকতাই আমার অস্ত্র। আউটসুইং, ইনসুইং তো রয়েছেই। কিন্তু একই জায়গা থেকে বলকে দুই দিকে সুইং করানোর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা। সেটা নিয়ে অনেক দিন ধরে কাজ করছি। এবারের বিজয় হজারে ট্রফিতে সেটা খুব কাজে লেগেছে। ভুবি ভাইয়ের (ভুবনেশ্বর) কাছ থেকেই এই ব্যাপারে পরামর্শ নিয়ে সামনের দিকে এগোতে চাই।’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রসিদ্ধ যে লম্বা সময় থাকতে এসেছেন তার প্রমাণ দিয়ে দিলেন অভিষেকেই। ৮.১ ওভারে তিনি ৫৪ রানের বিনিময়ে নিয়েছেন ৪ উইকেট, ওয়ানডে অভিষেকে কোনো ভারতীয়র সেরা বোলিং। পর পর ২ ওভারে আউট করেন জেসন রয় এবং বেন স্টোকসকে। এরপর নেন স্যাম বিলিংস ও টম কারেনের উইকেট।
প্রসিদ্ধের তুলনায় ক্রুনালের উঠে আসার পেছনে অনেক লড়াই ছিল। ১৯৯৮ সালে গুজরাটের সুরাট শহরে গাড়ি কেনা-বেচার ব্যবসা করতেন ক্রুনাল এবং হার্দিকের বাবা হিমাংশু পান্ডিয়া। ছেলেকে ক্রিকেটার বানাবেন বলে ব্যবসার পাট চুকিয়ে সে বছরই বরোদায় চলে যান। দুই ছেলের ক্রিকেট প্রশিক্ষণের জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা ছিল না বাবার। তাই ছেলেরা ম্যাগি খেয়ে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিয়েছেন। হিমাংশুর চেষ্টা আর ছেলে দুটির প্রতিভা দেখে এগিয়ে আসেন কিরণ মোরে। প্রায় বিনা বেতনে দুই ভাইকে নিজের অ্যাকাডেমিতে সুযোগ করে দেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৫ সালে হার্দিক মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে সুযোগ পান। এর পরের বছর সুযোগ পান ক্রুণাল। বরোদার হয়ে বুচিবাবু ট্রফি খেলতে গিয়ে কাঁধের হাড় ভাঙে। সেই সময় ডাক বিভাগের সরকারি চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন। বেতন ছিল প্রায় ২০ হাজার রুপি। বাবা হিমাংশু সংসার চালাতে না পেরে ছেলেকে চাকরি করতে বলেছিলেন। কিন্তু ক্রুনাল সেই চাকরির চিঠি ছিঁড়ে ফেলে ক্রিকেটকে আঁকড়ে ধরেন। ২০১৬ সালে রাজ্য দলের হয়ে সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে খেলার সময় জন রাইটের চোখে পড়ে যান। এরপর মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স হয়ে ভারতের টি-টোয়েন্টি দলে জায়গা করে নেন ক্রুনাল। গত ১৬ জানুয়ারি বাবা মারা গেছেন। পিতৃবিয়োগের সেই স্মৃতিই প্রথম ওয়ানডেতে নামার আগে তার চোখে জল এনে দিয়েছিল। ২০১৮ সালে উইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে অভিষেকের সময়ও হার্দিকের হাত থেকে ‘ক্যাপ’ নিয়েছিলেন ক্রুনাল। মঙ্গলবারও ছোট ভাইয়ের হাত থেকেই ওয়ানডে ক্যাপ পেলেন। সেই থেকে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন ক্রুনাল। অভিষেকে দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়ে ম্যাচ শেষে টুইটারে ক্রুনাল লিখেছেন, ‘বাবা, প্রতিটা বল খেলার সময় তোমার কথাই মনে পড়েছে। চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। তোমাকে সব সময় নিজের পাশে অনুভব করেছি। আমার শক্তি হওয়ার জন্য ধন্যবাদ। সব সময় আমার পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ। আশা করি তোমায় গর্বিত করতে পেরেছি। এটা তোমার জন্য বাবা, আমরা যা করি তা তোমার জন্যই।’ গতকাল ছিল (২৪ মার্চ) ক্রুনালের জন্মদিন। সে কথা মনে করিয়ে ছোট ভাই হার্দিক লিখেছেন, ‘বাবা তোমার জন্য গর্বিত। তোমার দিকে তাকিয়ে হাসছে, বাবা তোমার জন্য জন্মদিনের অগ্রিম উপহার পাঠিয়েছে। তোমার জন্য দারুণ খুশি আমি। এটা তোমার জন্য বাবা।’ নিজের ইনিংস বাবা হিমাংশুকে উৎসর্গ করেছেন ক্রুনাল।