করোনা মহামারিতে অর্থনীতির মন্দাবস্থার মধ্যে কানাডার বাড়ির বাজারের ঊর্ধ্বগতি ‘অস্বস্তিকর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং এই খাতের ব্যবসায়ীও।
তারা বলছেন, বাড়তি সঞ্চয়, ব্যাংক ঋণের সুদের হার হ্রাস করে ঋণের ব্যয় কমিয়ে আনার কারণে মানুষ বাড়ি কেনায় আগ্রহী হচ্ছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি বাড়ির দর বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কানাডার বাংলা পত্রিকা ‘নতুনদেশ’-এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগরের সঞ্চালনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ‘শওগাত আলী সাগর লাইভে’ কানাডার রিয়েল এস্টেট মার্কেটের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় তারা এই মতামত দেন।
স্থানীয় সময় বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত ‘কানাডার রিয়েল এস্টেট মার্কেটের ভবিষ্যৎ কী’ শিরোনামের আলোচনায় বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ ও অ্যাডমন্টনের ম্যাকইউয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রাফাত আলম, রিয়েল্টর ও বাংলা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী সাজ্জাদ আলী এবং সাংবাদিক মনজুর মাহমুদ।
রিয়েল এস্টেট মার্কেটে বিনিয়োগে আগ্রহীদের নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা এবং আগামী পাঁচ বছরের আয়-ব্যয়ের সম্ভাব্য গতি প্রকৃতি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন তারা।
কানাডার সামগ্রিক অর্থনীতির হালচাল তুলে ধরে ড. রাফাত আলম বলেন, কভিডের কারণে প্রবল চাপ তৈরি হলেও দেশ এখন অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভ্যাকসিন দেওয়া শেষ হলেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে যাবে এবং বর্ধিত প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থনীতি এগিয়ে যাবে।
কানাডার রিয়েল এস্টেট মার্কেটের বর্তমান অবস্থাকে স্বাভাবিক হিসেবে আখ্যায়িত করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, কানাডীয়রা এখন নগদ ডলারের ওপর বসে আছে। পরিসংখ্যান বলছে, তাদের হাতে ১০০ বিলিয়ন ডলার বাড়তি সঞ্চয় অলস পড়ে আছে, যেগুলোর বিনিয়োগের পথ খুঁজছেন।
তিনি বলেন, কভিডের সময় সরকারের দেওয়া প্রণোদনা নাগরিকদের টাকার প্রবাহকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সময়ে মানুষের অন্যান্য ব্যয় কমে গেছে। ফলে তাদের সঞ্চয় বেড়েছে, মানুষের হাতে নগদ অর্থ জমা হয়েছে। এই অর্থ তারা রিয়েল এস্টেট এবং শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করছেন।
তিনি বাংলাদেশি কানাডীয়দের রিয়েল এস্টেট মার্কেটে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিজের আয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য ঋণের আনুপাতিক হার পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়ে বলেন, কোনো অবস্থাতেই যাতে ঋণের পরিমাণ মোট আয়ের এক-তৃতীয়াংশের বেশি না হয়।
রিয়েল্টর সাজ্জাদ আলী এ পরিস্থিতিকে ’অস্বস্তিকর’ আখ্যা দিয়ে বলেন, গত ২০ বছরের পেশাগত জীবনে বাড়ির দাম নিম্নমুখী হতে কখনো দেখিনি। আবার এমন লাফিয়ে বাড়তেও দেখিনি। সব সময় একটা ভদ্রজোনোচিত গতিতে বাড়ির দাম ওপরের দিকে গেছে।
বর্তমানের বাজারে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ক্রেতার আধিক্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, আর্থিকভাবে মানুষে সক্ষমতা বেড়ে গেছে, তাদের হাতে নগদ অর্থও বেড়েছে।বিশ বছর আগে টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটিতে বছরে ৩০ হাজার ডলার আয় করেন এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন হতো। এখন একশত বা দেড়শত হাজার ডলারের বেশি আয় করেন এমন বাংলাদেশির সংখ্যা অনেক। তিনি বলেন, বাংলাদেশিদের চেয়ে আয়তনে বড় এবং ধনী অন্যান্য কমিউনিটিতেও এভাবে বিত্তশালীর সংখ্যা বেড়েছে।
তিনি যাদের সক্ষমতা আছে তাদের এখনই বাড়ির বাজারে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে বলেন, বিনিয়োগের আগে অবশ্যই নিজের আর্থিক শক্তি, আগামী দিনে ব্যক্তিগত আয়ের প্রবাহের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেন।
সাংবাদিক মনজুর মাহমুদ বর্তমান বাজারকে সম্পূর্ণ ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, একটি বাড়ি বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত সেটি নিয়ে বিডিং-এর নামে দরের যুদ্ধ (প্রাইস ওয়ার) শুরু হয়ে যায়। এর মাধ্যমে দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে ফেলা হয়।
বাজারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পাচার হয়ে আসা অর্থের প্রবাহসহ নানা ধরনের কালো বিনিয়োগের কথাও উল্লেখ তিনি। বলেন, সাধারণ নাগরিকেরা নিজের থাকার জন্য কিংবা বিনিয়োগ হিসেবে রিয়েল এস্টেট মার্কেটের দিকে ঝুঁকলেও কানাডার কালো অর্থনীতির একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থল এই রিয়েল এস্টেট খাত।
নতুনদেশ-এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগর বাড়ির বাজারে বিনিয়োগকারীদের হোমওয়ার্ক ও রিসার্চ করে বিনিয়োগে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, যে কোনো বিনিয়োগই সাধারণ মানুষের জন্য জটিল ও দুর্বোধ্য। কাজেই সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের উচিত ক্রেতাদের শিক্ষিত করে তোলার পদক্ষেপ নেওয়া।