ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ এবং জনবহুল এলাকা কুমারশীল মোড়। পাশে সদর হাসপাতাল, সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি গণগ্রন্থাগার, মাতৃসদন। এ মোড়ের বহুতল ভবন আমিন কমপ্লেক্সের অপর পার্শ্বে ময়লা বিরাট স্তূপ। নাক চেপে অনেকটা দূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন বাসিন্দারা। চরম দুর্গন্ধে তাও টেকা কষ্ট।
পাশ্ববর্তী বাণিজ্যিক ভবন, সরকারি অফিস-সর্বত্রই উৎকট গন্ধের দাপট। এ অবস্থা এখন পৌর শহরের মোড়ে মোড়ে। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ। রাস্তায় রাস্তায় স্তূপ ময়লা-আবর্জনা। কারণ গত ছয় দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ময়লা-আবর্জনা অপসারণ বন্ধ।
রবিবার হেফাজতের হরতাল চলাকালে তাণ্ডব থেকে বাদ যায়নি ১৬০ বছরের প্রাচীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা। ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের সঙ্গে চলে লুটপাটও। এতে পৌরসভা নিশ্বেঃস হয়ে গেছে।
পৌরসভার সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মচারীরা জানিয়েছেন, ‘ময়লা যে সরাবেন সেই বেলচা পর্যন্ত লুট হয়েছে। ঝাড়ু, টুকরি, শাবল, বুট, ব্লিচিং পাউডারের ড্রাম কোনো কিছু নেই। গার্বেজ ট্রাক-ট্রলি ভাঙচুর-ধংস করা হয়েছে। তিন শ পোর্টেবল মোবাইল ডাস্টবিন, দু শ পোর্টেবল হ্যান্ড ট্রলি এবং ২০টি রিকশাভ্যান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে ময়লা-আবর্জনা অপসারণের কাজ বন্ধ। সবমিলিয়ে পৌরসভার ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক। কোনে কার্যক্রম চালানোর মতো ব্যবস্থা নেই’।
পৌরসভা সূত্র জানায়, স্বাধীনতা দিবসের বিকালে প্রথম হামলা হয় পৌরসভার বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে। সেখানে থাকা বঙ্গবন্ধুর তিনটি ম্যুরাল ভাঙচুর করা ছাড়াও স্কয়ারের ফোয়ারায় থাকা নয়টি সাবমারসিবল পাম্প আগুনে পোড়ানো হয়। পৌর মুক্তমঞ্চের গ্রানাইট পাথর, ৫০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি, ২০টি ফ্লাডলাইট ভাঙচুর করা হয়। ২৮ মার্চ হরতাল চলাকালে পুনরায় হামলা হয় পৌরভবনে। ভাঙচুর-লুটপাটের পর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় সেখানে। এতে ৪তলার পুরো পৌরভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পৌরভবনের আসবাব বলতে কিছু নেই। আগুনে ছাই হয়ে গেছে সব রেকর্ডপত্র।
তারা জানান, ক্ষয়ক্ষতির বিবরণে পৌর কর্মকর্তারা জানান, ২০টি স্টিলের আলমারি, ২৫টি কাঠের আলমারি, ১৮টি ডেস্কটপ কম্পিউটার, ৫টি ল্যাপটপ, ৪টি ফটোকপি মেশিন, ৩৪টি টেবিল, ৭টি সেক্রেটরিয়েট টেবিল, ১১৫টি চেয়ার, ২ টনের এসি ৫টি, স্বাস্থ্য শাখার ১২টি ডিপ ফ্রিজ, চারটি সাধারণ ফ্রিজ, সিলিং ফ্যান, স্টোরে রক্ষিত ১০ হাজার এলইডি বাতি, তিন হাজার বাতি শেড, ৫০ কয়েল বৈদ্যুতিক তার, বিভিন্ন ধরনের ১৬টি গাড়ি, ইক্যুয়েপমেন্ট চেইন ডোজার ১টি, রোড রোলার ৩টি, ১টি মশক নিধন গাড়ি, হাইড্রোলিক বিম লিফটার ১টি, ভেকুটেক ১টি, এক্সাভেটর ১টি, হাইড্রোলিক ড্রিলিং মেশিন ১টি, ঘাস কাটার মেশিন ২টি, মিকচার মেশিন ৩টি, ভাইবেটর ২টি ভাঙচুর ও আগুনে পোড়ানো হয়।
সূত্র আরো জানায়, এ ছাড়া ভাণ্ডারে রক্ষিত যানবাহনের খুচরো যন্ত্রাংশ, সংরক্ষণ শাখার মালামাল, স্টেশনারি মালামাল, বাড়ির প্ল্যান অনুমোদনের পে-অর্ডারসহ নথি, চেক রেজিস্টার, ইস্যু রেজিস্টার, ক্যাশ বই, অ্যাসেট রেজিস্টার, সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত নথি ও সার্ভিস বই, সব রেজিস্টার, বিভিন্ন ডকুমেন্টস, ঠিকাদারের বিল-জামানতের নথিসহ বিভিন্ন মালামাল আগুনে পুড়ে গেছে।
পৌরসভার সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তন আগুনে ছাই হয়েছে। মিলনায়তনের পাঁচ শ চেয়ার, ২০ সেট সোফা, ২০টি ৫ টনের এসি, ১০টি ২ টনের এসি এবং ১৫০ সিলিং ফ্যান আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
পৌরসভার মেয়র মিসেস নায়ার কবির বলেন, হেফাজতের স্থানীয় কিছু নেতাকর্মী, বিএনপি-জমায়াত সদ্য অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে আমার দুই প্রতিদ্বন্দ্বিকে নিয়ে এ হামলা চালিয়েছে।
তিনি জানান, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে হামলা হয়। সে সময় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি শাবল দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। গান পাউডার ও পেট্টল ঢেলে পৌরভবনের সবকিছু জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। হামলার সময় ভীত-সন্ত্রস্ত পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পার্শ্ববর্তী সুইপার কলোনিতে পালিয়ে জীবন বাচাঁন। এতে আমাদের শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তা ছাড়া আমার বাসভবনেও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। সেখানে নিচতলায় থাকা একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালামাল লুট করে নেয়া হয়। পৌরসভার পক্ষ কোনো নাগরিক সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।