আর কিছুদিন পরেই হাওরের বছরের একমাত্র খোরাক বোরো ধান সোনালি রং ধরতে শুরু করত। ঠিক এমন সময় কালবৈশাখীর গরম বাতাসে কিশোরগঞ্জের হাওরের প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এতে জেলার হাজারো কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ফসল ঘরে তোলার কদিন আগে সবুজ ধানের গাছ ধূসর হয়ে পড়ায় কৃষকের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে।
খবর পেয়ে গতকাল বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাওর পরিদর্শন করেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারিভাবে সহায়তা করা হবে বলে আশ^স্ত করেছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, গত রবিবার সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে যায় কালবৈশাখী ও গরম বাতাস (লু হাওয়া)। এতে ফ্লাওয়ারিং স্টেজে থাকা বিআর-২৯ জাতের ধানের ছড়া ফেটে ভেতরের সাদা তরল দুধ শুকিয়ে গেছে। সাদা বিবর্ণ হয়ে পড়েছে ধানের গাছ। এখন ধানের শীষে কোনো ধান দেখা যায় না।
হাওরের কৃষকরা আরও বলেন, তিন বছর আগে বন্যায় আমাদের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে না উঠতেই আকস্মিক ঝড়ে আমাদের বছরের একমাত্র বোরো ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুই চোখে এখন অন্ধকার দেখছি।
ইটনা হাওরের কৃষক আলাউদ্দিন কান্নার সুরে বলেন, রবিবার বিকেলে মাঠের সবুজ ধানক্ষেতের সতেজতা দেখে আমার মনটা আনন্দে ভরে উঠেছিল। কিন্তু সোমবার সকালে ক্ষেতের আইলে গিয়ে দেখি সবুজ স্বপ্নগুলো ধূসর হয়ে গেছে। ধারদেনা করে ৭০ কাটা জমিতে বোরো ধান রোপণ করেছিলাম। এ ফসলকে ঘিরেই ছিল স্বপ্ন। কিন্তু এখন এমন অবস্থায় ভবিষ্যতের কিছু ভাবতে পারছি না।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের পশ্চিম ভুবিরচর গ্রামের কৃষক আবদুর রশিদ, আজিজুল হক, ছাফির উদ্দিন বলেন, আমাদের সব জমির ধান নষ্ট হয়ে শীষ সাদা হয়ে গেছে। এতে আর ধান বলে কিছু নেই। এবার আমাদের ধানের গোলা খালি থাকবে। সংসার চালানোই কষ্টকর হবে।
করিমগঞ্জ উপজেলার চামড়া বন্দর এলাকার কৃষক মো. কাঞ্চন মিয়া ও কান্দাইল এলাকার বড় হাওরের কৃষক আনোয়ার হোসেন (আনু) বুকচাপা কষ্ট নিয়ে বলেন, হঠাৎ করে গরম হাওয়ায় সবুজ ধানের গাছ ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে পড়েছে। পরের দিন রোদ ওঠার পর আমরা বিষয়টি টের পাই। আমাদের শেষ সম্বল বলে আর কিছুই রইল না।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ছাইফুল আলম বলেন, ঘটনার পরদিনই কয়েকটি হাওর পরিদর্শন করেছি। সবচেয়ে বেশি নষ্ট হয়েছে করিমগঞ্জ, তাগড়াইল ও ইটনা উপজেলায়। ধান পরাগায়ন পর্যায়ে ৩০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রায় ধানের পূর্ণতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝড়ের সময় ৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় প্রচ- বেগে বাতাস বয়ে যাওয়ায় জেলার ১৩টি উপজেলায় ২৫ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সাংসদ রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক বলেন, কৃষি বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছি। সম্পূর্ণ তালিকা হাতে পেলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন পাঠানো হবে।