বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নন্দিত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হক মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। গতকাল রবিবার সকাল ৬টা ২০ মিনিটে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় একুশে পদকজয়ী এ শিল্পীর। এর মাত্র চার দিন আগে করোনামুক্ত হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছিলেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। গুণী এ শিল্পীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন শোক প্রকাশ করেছেন।
মিতা হকের জামাতা অভিনেতা মোস্তাফিজ শাহীন গতকাল সংবাদমাধ্যমকে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই মিতা হক নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। গত পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত তার কিডনি ডায়ালাইসিস চলছিল। এর মধ্যেই কয়েক দিন আগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন তিনি। তবে চার দিন আগে করোনাভাইরাস রিপোর্ট নেগেটিভ আসার পর হাসপাতাল থেকে তাকে বাসায় নেওয়া হয়েছিল।
শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত পাঁচ বছর যাবৎ নিয়মিত ডায়ালাইসিস নিয়ে ভালোই ছিলেন তার শাশুড়ি। কিন্তু সম্প্রতি কভিড আক্রান্ত হয়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল ছিলেন। যেহেতু তিনি কিডনি রোগী এবং কভিড আক্রান্ত, তাই তাকে গত ৩১ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তার করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট আসার পর বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। গত শনিবার দুপুরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। আরও অবনতি ঘটলে রাতে আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। রবিবার সকালে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।’
গতকাল বেলা ১১টায় মিতা হকের মরদেহ ছায়ানট প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিতসংখ্যক মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মরদেহে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর, ইরেশ যাকের, লাইসা আহমেদ লিসাসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকে। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে কেরানীগঞ্জের বড় মনোহারিয়া বড় মসজিদে বাদ জোহর তার জানাজা হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন মিতা হক। চাচা রবীন্দ্র গবেষক ওয়াহিদুল হক, সন্জীদা খাতুন ও উস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খানের কাছে গান শিখেছেন তিনি। ১৯৯০ সালে প্রকাশ হয় তার প্রথম রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবাম ‘আমার মন মানে না’। এরপর বাংলাদেশ ও ভারত থেকে মোট ২৪টি অ্যালবাম প্রকাশ হয়। তিনি সুরতীর্থ নামে তিনি একটি গানের স্কুল পরিচালনা করতেন। পাশাপাশি ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনের রবীন্দ্রসংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবেও কাজ করেছেন। রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন পরিষদের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন এ শিল্পী। সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০২০ সালে একুশে পদক লাভ করেন মিতা হক। ২০১৬ সালে শিল্পকলা পদক পান তিনি। প্রয়াত অভিনেতা ও নির্দেশক খালেদ খান ছিলেন মিতা হকের স্বামী। খালেদ খান ও মিতা হক দম্পতির একমাত্র সন্তান ফারহিন খান জয়িতাও দেশের খ্যাতনামা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী।
মিতা হকের মৃত্যুতে এক শোক বার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা এবং রবীন্দ্রসংগীতকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার প্রচেষ্টা মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’ রাষ্ট্রপতি মিতা হকের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
পৃথক শোক বার্তায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। মিতা হকের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ছায়ানট, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ এবং থিয়েটার পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে শোক প্রকাশ করেছেন।