করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সরকার আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধের কারণে গতকাল মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশ থেকে বন্ধ হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট চলাচল। এতে হাজার হাজার প্রবাসীর নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। এছাড়া টিকিটের দাম কিংবা হোটেল বুকিংয়ের টাকা ফেরত নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসী কর্মীদের জন্য ফ্লাইট চালু রাখার দাবি জানিয়েছে ট্রাভেল এজেন্ট মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)। গতকাল রাজধানীতে আয়োজিত আলাদা আলাদা সংবাদ সম্মেলনে তারা এ দাবি জানায়। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দুজন সচিব বলেছেন, প্রবাসগামী শ্রমিকদের প্রয়োজনে বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, চার্টার্ড ফ্লাইট, কার্গো ফ্লাইট, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত ফ্লাইট চলাচল নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকছে। তবে এসব ফ্লাইটের ক্ষেত্রে মানতে হবে বিশেষ নির্দেশনা। এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছে বেবিচক। কার্গো ফ্লাইট, ত্রাণ, মেডিকেল ইভাকুয়েশন, টেকনিক্যাল ল্যান্ডিং এবং বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত ফ্লাইটের ক্ষেত্রে যাত্রী ও ক্রুদের ডিজইনফেকশন, স্যানিটাইজিংসহ স্বাস্থ্যবিধি যথাযথ অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত ফ্লাইটে বড় উড়োজাহাজে ২৬০ এবং ছোট উড়োজাহাজে ১৪০ জনের বেশি যাত্রী নেওয়া যাবে না। এসব ফ্লাইটের যাত্রীদের যাত্রার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আরটি-পিসিআর পদ্ধতিতে করোনা পরীক্ষার নেগেটিভ সার্টিফিকেট সঙ্গে থাকতে হবে। বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত ফ্লাইটে যাত্রীরা দেশে এলে ১৪ দিন সরকার নির্ধারিত কোয়ারেন্টাইন সেন্টার অথবা নিজ খরচে সরকার নির্ধারিত হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।
আজ বুধবার থেকে সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছে সরকার। এর আওতায় অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের পাশাপাশি বন্ধ থাকবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও। নিষেধাজ্ঞার কারণে গতকাল মধ্যরাত থেকে বন্ধ হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৪ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধের নির্দেশনা জারি করেছে বেবিচক। অন্যদিকে গত ৪ এপ্রিল থেকে বন্ধ আছে দেশের সব অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট, যা ২০ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এমন অবস্থায় প্রবাসী কর্মীদের জন্য ফ্লাইট চালু রাখার দাবি জানিয়েছে বেশ কয়েকটি সংগঠন। আন্তর্জাতিক রুটের সব ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় হাজার হাজার প্রবাসীর নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় এমন দাবি উঠেছে। টিকিটের দাম কিংবা হোটেল বুকিংয়ের টাকা ফেরত নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। এর চেয়েও বড় ভয়ের আশঙ্কায় থাকা প্রবাসীরা জানান, ওইসব দেশে তাদের ভিসা, আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। যথাসময়ে ফিরতে না পারলে এগুলো নবায়ন করাও সম্ভব হবে না। এমনকি হয়তো তারা আর ফিরেও যেতে পারবেন না সেসব দেশে।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে আটাব সভাপতি মনছুর আহামেদ কালাম, হাব সভাপতি শাহাদত হোসেন তসলিম ও আটাব মহাসচিব মাজহারুল হক ভূঁইয়া বলেন, প্রবাসীদের ছুটি শেষে নিজ কাজে সুষ্ঠুভাবে ফিরে যাওয়া বা নতুন ভিসা নিয়ে কাজে যোগদান করতে তাদের যাতায়াত চলমান রাখা জরুরি। অন্যথায় তাদের চাকরি হারানোর শঙ্কা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণে বহুমুখী কর্মসূচি নিয়েছেন। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরও কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। ছুটিতে আসা প্রবাসীকর্মী এবং নতুন ভিসাপ্রাপ্ত কর্মীদের সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানোর বিষয়টিও বর্তমান সরকার মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করবে বলে তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।
সংবাদ সম্মেলনে তারা আরও বলেন, লকডাউনের সময় যাদের ফ্লাইট তারা যেতে না পারলে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে তারা কর্মহীন হয়ে পড়বে। পরিবার, দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শাহাদত হোসেন তসলিম বলেন, ‘পূর্ব নোটিস ছাড়াই ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে বিদেশগামী কর্মীরা। তাছাড়া কাতার ও ওমানে যাত্রীরা টাকা খরচ করে কোয়ারেন্টাইন হোটেল বুকিং দিয়ে রেখেছে, যে টাকা ফেরতযোগ্য নয়। এখন না যেতে পারলে তাদের লোকসান গুনতে হবে। লকডাউনের সাত দিনে প্রায় ২০ হাজার কর্মী বেশি দামে টিকিট কেটে কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কোয়ারেন্টাইন হোটেল বুকিং করেছে। এ অবস্থায় দেশে এবং বিদেশে কর্মক্ষেত্রে এসব প্রবাসী ক্ষতির সম্মুখীন হবে।’
আটাব মহাসচিব মাজহারুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘লকডাউন চলাকালীন বিদেশগামী কর্মীদের কথা বিবেচনায় এনে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ না করে জনশক্তি প্রেরণ খাতকে জরুরি সেবা খাত হিসেবে বিবেচনা করা হোক। বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার কর্মী কর্মস্থলে ফিরে যেতে অধিক মূল্যে টিকিট কিনেছে।’