ভদ্রলোকের নাম আগে শুনিনি। হলিউড-বলিউডের সিনেমা নিয়ে আমার তেমন আগ্রহও নেই। সেখানে কারা নায়ক বা নায়িকা হিসেবে বিখ্যাত, কারা ভিলেন হিসেবে নামজাদা, সে তথ্য আমার জানা নেই। হ্যাঁ, যারা অনেক বেশি আলোচিত, যাদের কথা পত্রপত্রিকায় প্রায়ই ছাপা হয়, আমি বড়জোর তাদের কথা জানি। সেই তালিকায় ওই ভদ্রলোকের নাম আমার চোখে পড়েনি।
করোনা শুরু হওয়ার পর থেকেই ভারতীয় পত্রপত্রিকায় তার নাম ছাপানো শুরু হয়। দারুণ সব কাজ করে তিনি গণমাধ্যমের নজর কাড়েন। সে সূত্রেই তার নাম প্রথম চোখে পড়ে। তার একেকটা কাহিনী পড়েছি, আর বিস্মিত হয়েছি। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় মাথা নুয়ে এসেছে। একজন সিনেমার মানুষ যখন বাস্তবজীবনে বিপন্ন মানুষের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেন, অসম্ভব দরদি ভূমিকা পালন করেন, তখন সবার কাছেই তা আলাদা গুরুত্ব পায়।
যার কথা বলছি, সেই ভদ্রলোকের নাম সনু সুদ। তিনি একজন ভারতীয় অভিনেতা, মডেল ও প্রযোজক। হিন্দি, তেলেগু ও তামিল সিনেমায় অভিনয় করেন। অল্প কিছু কন্নড় ও পাঞ্জাবি সিনেমায়ও অভিনয় করেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তিনি ভিলেনের অভিনয় করেছেন।
এই সনু সুদ তার অভিনয় বা চলচ্চিত্রের জন্য নয়, করোনা দুর্যোগে অসংখ্য ভারতীয় নাগরিকের জীবনে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে আলোচনায় এসেছেন। করোনার ভয়াবহ সময়ে মানুষ যখন নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান যখন হুমকির মুখে, সনু সুদ নিজের টাকায় একজন দুজন না, হাজার হাজার মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তার সেবাপ্রতিষ্ঠানের নাম শক্তি অন্নদনাম, যা শুরু হয়েছিল করোনা মহামারী শুরুর কিছুদিন পরে। এই প্রতিষ্ঠানের আওতায় প্রথমে প্রতিদিন ১৫০০ লোকের খাওয়ানোর ব্যবস্থা থাকলেও ধীরে ধীরে এটি বিরাট আকার ধারণ করে এবং এই প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন প্রায় ৪৫০০ মানুষের খাওয়ার জোগান দেয়, যা সত্যি অকল্পনীয়।
অথচ তিনি বলিউডের সবচেয়ে ধনী অভিনেতা নন। কোনো রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসেননি। তিনি ভোটপ্রার্থী ছিলেন না। তারপরও তিনি আকস্মিক লকডাউনে আটকে পড়া হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিককে সহায়তা করেছেন। দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। ঘরে ফেরার জন্য বাসের ব্যবস্থা করেছেন। এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছ থেকে ওড়িশার নারী পরিযায়ীদের দুর্দশার কথা শুনে আটকে পড়া ১৭৭ নারীশ্রমিককে নিজেদের রাজ্যে ফেরার জন্য বিশেষ বিমানের ব্যবস্থা করেছেন। এই ১৭৭ নারী কোচির একটি কারখানায় কর্মরত ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি উত্তর প্রদেশ এবং বিহারের ১০০০ শ্রমিককে সব নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ট্রেনে তাদের বাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। তিনি তার ছয়তলা হোটেল করোনাযোদ্ধা ডাক্তার এবং নার্সদের জন্য উন্মুক্ত করেছেন। এর ২৪টি রুমে অন্তত ৪৮ জন থাকতে পারেন এবং দুবেলায় ডাক্তার, নার্স বা করোনা রোধে সরাসরি কাজ করছেন এমন ৯৬ জনের থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা করেছেন। তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল ও জরুরি সেবার কাজে পিপিই, গ্লাভস, মাস্ক, স্যানিটাইজার এবং অনেক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করেছেন। শহর ছেড়ে গ্রামেও তিনি মাস্ক আর স্যানিটাইজার দিয়েছেন, গ্রামের মানুষদের করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়াবহতা বিষয়ে সচেতনতা শিক্ষা দিয়েছেন।
তিনি প্রবাসী রোজগার নামের এক সংস্থার আওতায় তিন লাখ প্রবাসী শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। বহু দুস্থ পরিবারের পাশেও দাঁড়িয়েছেন। কোথাও অনাথ শিশুদের দায়িত্ব নিয়েছেন, আবার কোথাও-বা হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। দুস্থ পরিবারের সন্তানদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছেন। তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের দুটি মেয়েকে ট্রাক্টর এবং একটি পরিবারকে চাষাবাদের কাজে মহিষ কিনে দেন। করোনা আক্রান্তদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে এই অভিনেতা কখনো শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাসের সুবিধার্থে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন নতুন স্মার্ট ফোনের, আবার কখনো আত্মরক্ষার স্বার্থে তৈরি করেছেন স্কুল।
সম্প্রতি শুরু হওয়া কৃষক আন্দোলনে কৃষকদের সমর্থনে পাওয়া গেছে তাকে।
মানুষকে সাহায্য করার জন্য নিজের সম্পত্তি বন্ধক দিয়েছেন এই অভিনেতা। তাকে ভালোবেসে সবাই সুপারম্যান ও করোনা ফাইটার কিং উপাধিতে আখ্যায়িত করেছেন। রাস্তায় রাস্তায় তার বিশাল হোর্ডিং লাগিয়েছেন। তিনি তার কাজের কারণে অনেকের কাছে ‘ঈশ্বর’ হয়ে উঠেছেন। তেলেঙ্গানার সিদ্দিপেটের ডব্বা টন্ডা গ্রামে তার অনুগামীরা তৈরি করেছে ‘সনু সুদ মন্দির’! অনুগামীদের কথায়, ‘দেশের একমাত্র ঈশ্বর সোনু সুদ!’
সোনু সুদের মানব দরদি কাজকে স্বীকৃতি দিতে একটি বিশেষ বিমান উৎসর্গ করেছে বিমান সংস্থা ‘স্পাইসজেট’ (ঝঢ়রপবলবঃ)। এই বিমানের গায়ে আঁকা হয়েছে সোনু সুদের মুখ, সঙ্গে রয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকের দলও! পাশে লেখা রয়েছে, ‘এ স্যালুট টু দ্য সেভিয়ার সোনু সুদ’। সম্প্রতি সোনু সুদকে করোনা ভ্যাকসিন কর্মসূচির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর বানিয়েছে পাঞ্জাব সরকার।
‘জীবে প্রেম করে যে জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’, স্বামী বিবেকানন্দের এই বাণী সোনু সুদ যেন অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। মানবসেবা যে ঈশ্বর পূজার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন তিনি। আর মানুষের জন্য কাজ করতে যে কোনো প্ল্যাটফর্ম লাগে না, রাজনৈতিক দলে নাম লেখাতে হয় না, সেটাও তিনি দেখিয়েছেন। কখনো ভাষণ দেননি, কখনো মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেননি, কিন্তু মানুষের সেবায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন।
মান আর হুঁশ আছে যার, সেই মানুষ। পশুর সঙ্গে মানুষের তফাত মানবিকতার এই জায়গায়। তবে বর্তমানে মানুষের মধ্যে এই মানবিকতারই তীব্র অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। সোনু সুদ এ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। একটি নিঃস্বার্থ ও সাহসী হৃদয় দিয়ে তিনি হাজার মানুষকে বাঁচিয়েছেন, তাদের জীবনকে বদলে দিয়েছেন। একজন মানুষ চাইলে কী করতে পারেন, তা সোনুর মতো কেউ ভারতে দেখাতে পারেননি। অথচ ভারতে সোনু সুদের চেয়ে শতগুণ টাকার মালিক হাজার হাজার কোটিপতি আছেন। কিন্তু করোনা মহামারীকালে তারা তাদের সম্পদের একাংশ নিয়েও সোনু সুদের মতো মানুষের পাশে দাঁড়াননি।
বাংলাদেশেও শত শত বা হাজার কোটি টাকার মালিক এমন অনেক মানুষ রয়েছেন। কিন্তু তাদের কেউ এমন সোনু সুদের মতো মানবকল্যাণে সর্বাত্মক ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসেননি। এই মহামারীকালে নিজেদের জমানো অর্থ থেকে গরিবদের সহায়তায় ব্যয় করা তো দূরের কথা আমাদের দেশের শিল্পপতি ও ধনীরা উল্টো দফায় দফায় সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা সহায়তা নিয়েছেন। নানা ফিকিরে তারা ঠিকই টাকা বানিয়েছেন। করোনাকালে দেশের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ চরম দরিদ্রে পরিণত হলেও গত এক বছরে দেশে কোটিপতির সংখ্যাও অনেক বেড়েছে! আমাদের দেশের ধনীরা এমনই নির্দয় ও নির্মম!
সম্প্রতি আমাদের দেশে মৃত্যুবরণ করেন একজন সংসদ সদস্য ও রাজনীতিক। জমি কেনাবেচার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নব্বইয়ের দশকে ব্যবসায় নাম লেখান তিনি। পরবর্তী সময়ে ছোটখাটো ঠিকাদারি, ট্রেডিং ও রিয়েল এস্টেটের ব্যবসায় যুক্ত হন। ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বিপুল গতিতে বাড়তে থাকে তার ব্যবসার পরিধি। নেমে পড়েন ভাড়ায় চালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবসায়। অনুমোদন পেয়ে যান তিনটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নামে ঋণ নিতে থাকেন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে। যদিও শেষ পর্যন্ত ১০৮ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া কোনোটিই আর উৎপাদনে যেতে পারেনি। গত এক দশকে নানা অভিযোগে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সদ্যপ্রয়াত এ এমপি শুধু বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ পাড়েই জায়গা দখল করেছিলেন ৫৪ একরের বেশি। বিদ্যুৎকেন্দ্র, রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার নামে এসব জায়গা দখল করা হয়েছে। দখল করা এসব জমিই পরবর্তী সময়ে জামানত হিসেবে বন্ধক দিয়েছেন ব্যাংকের কাছে। বিপরীতে ব্যাংক থেকে বের করে নিয়েছেন শত শত কোটি টাকা। তার বিভিন্ন কোম্পানির নামে নেওয়া ঋণের পরিমাণ বর্তমানে তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
একজন সোনু সুদের সঙ্গে আমাদের দেশের নব্য কোটিপতিদের পার্থক্যটা এখানেই!
লেখক লেখক ও কলামনিস্ট
chiros234@gmail.com