সংসদে বিরোধী দল থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে দেশে প্রকৃত দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব রয়েছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি এমন বক্তব্য দেওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মতে, শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সবল হওয়ার উর্বর ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়ার পাশাপাশি সরকারি দলেরও একটি অংশের স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযোগ থেকে যায়। তবে আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দীন বাবলু দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দেশে কার্যকর, শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল না থাকার জন্য একমাত্র আওয়ামী লীগই দায়ী।
এদিকে বিরোধী দল ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দল পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিলেও দেশের রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল খুবই প্রয়োজন। তাহলে গণতন্ত্র মর্যাদাসম্পন্ন হবে। তবে চটজলদি করে শক্তিশালী বিরোধী দল ‘পয়দা’ করার পক্ষে নয় রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, চটজলদির পথে হাঁটলে কোনো না কোনোভাবে তা বিফলে যাবেই।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত সোমবার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে। শক্তিশালী একটি বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে একদিকে যেমন উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সবল হওয়ার উর্বর ক্ষেত্র খুঁজে পায়, তেমনি সরকারি দলেরও একটি অংশের স্বেচ্ছাচারী হওয়ার অবকাশ থেকে যায়। তাই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বিরোধী দল গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তার বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দীন বাবলু। সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের জবাবে বিরোধী দলের এই নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে শক্তিশালী, কার্যকর ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল প্রয়োজন আমরাও তা মনে করি। কিন্তু এ দেশে এক যুগ ধরে একটি দলই সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে দেশ পরিচালনা করে আসছে। ওই দলটি হলো আওয়ামী লীগ। কার্যকর, শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল সৃষ্টি না হওয়ার জন্য দায়ী একমাত্র আওয়ামী লীগ। এর জন্য আওয়ামী লীগকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি যেটা বলেছে, সেটা সবার বক্তব্য। তবে এটা এমন নয় যে পালা-পোষা করার মধ্য দিয়ে তৈরি করা যাবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে একটি বিরোধী দল গড়ে ওঠে। আর আমরা মনে করি, সে পরিস্থিতি দেশে বিরাজমান।’
কেন কার্যকর বিরোধী দল প্রয়োজন সেই ব্যাখা দিতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যারা বিরোধী দলে আছেন, তারা দলগতভাবে তাদের অতীতকে জাস্টিফাই করতে পারবেন না। গণতন্ত্র হলো গণরায় নেওয়া, গণরায়ে যখন আসবেন বিরোধী দল থেকে সরকারি দলেও আসতে পারবে। দেশে তো বিরোধী দল রয়েছে, তবে দলগতভাবে জাস্টিফাই করতে পারবেন না বলে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির সঙ্গেও তাদের রাজনৈতিক অমিল আছে। তাই এক ধরনের শূন্যতা চলছে বলেই দেশে বিরোধী দলের প্রয়েজনীয়তার কথা আলোচনায় এসেছে।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক শূন্যতা রয়েছে। বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দল। বিএনপির নেতৃত্বের প্রতি মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত। এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী রাজনৈতিক দল মানুষের প্রত্যাশা।’
আর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেছেন, ‘আমরা চাই সেই বিরোধী দল যারা মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতিতে বিশ^াস করে, শুধু বিশ^াসই নয়, অন্তরে ধারণ করে।’
এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. শান্তনু মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিকে সমর্থন করার সুযোগ নেই। কিন্তু কিছু বড় বড় বাধা আমাদের আছে, এগুলো অতিক্রম করতে সময় লাগবে, সে জন্য আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, এসব কথা আপাতদৃষ্টিতে ঝাপসা মনে হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটা জায়গায় নীতিগত একমত হতে হবে। আমাদের রাষ্ট্রের যে চার মূলনীতি, সেই চার মূলনীতির ব্যাপারে ছলচাতুরীহীনভাবে সরকার ও বিরোধী দলকে একমত হতে হবে। অধিকাংশ লোক ভোট দিয়েছে বলে গণতন্ত্র আছে মনে করলে চলবে না। এ জায়গায় থেমে থাকলে আমরা আসল গণতন্ত্র পাবও না। আমার এই বক্তব্য শোনামাত্র কিছু লোক তেড়ে আসবে এই বলে যে, উনি ভোট চায় না। তবে আমার বক্তব্যটা এ রকম না। নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত, কিন্তু কোনোভাবেই একমাত্র শর্ত নয়। সুতরাং গণতন্ত্রের জন্য আমাদের ভালো একটা নির্বাচন লাগবে। একই সঙ্গে আমি বলব, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন চার মূলনীতিতে বিশ^াসী সরকারি ও বিরোধী দল লাগবে, এর চেয়ে কম হলে দেশে মিনিংফুল গণতন্ত্রের সম্ভাবনা আমি দেখছি না। এখন ঘাড় ধরে বিরোধী দল পয়দা করা যাবে না।’
দেশে উদার গণতান্ত্রিক, বাম ও প্রগতিশীল দলগুলোকে শক্তিশালী অবস্থানে আনার তাগিদ দিয়ে শান্তনু বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হচ্ছে দেশের প্রধান তিন বা চারটি দল যদি ধরি এর মধ্যে একটি দল হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী দল, আমি সরাসরি বলছি জামায়াতের কথা। অন্য দুটি দলের জন্ম হচ্ছে ক্ষমতা দখলের পরে। সেই দুটি হলো বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। আরেকটি দল আওয়ামী লীগ একাধিক কারণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসছে বলে মনে হচ্ছে। এ রকম একটা গভীর অবস্থার মধ্যে আমরা আছি। আমি মনে করি দেশে উদার গণতান্ত্রিক দল যেগুলো আছে, এগুলোর যদি উত্থান ঘটানো যায়, সেগুলো যদি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে এবং বাম প্রগতিশীল যে দলগুলো আছে তারা যদি একটি শক্তিশালী অবস্থানে আসতে পারে, তাহলে উভয় দিক রক্ষা হয়। উভয় দিক রক্ষা করা বলতে বোঝাতে চাইছি, ওই দলগুলো একদিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন, আরেক দিকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যে চার নীতি ওগুলোতে বিশ^াসী। জনগণ যাকে চায় তাকেই ভোট দেবে, এর মানেই যদি হয় গণতন্ত্র, আমি বলব, এ কথাটা বাজে কথা, জনগণ ইতিহাসে হাজার হাজার বার ভুল করে, জনগণকে উৎকৃষ্ট ও ভালো জিনিসটা ধরিয়ে দিতে হয়।’
এ প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে আদর্শবাদী একটি বিরোধী দল প্রয়োজন। বিরোধী দল থাকতে হবে, দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেই বিরোধী দলকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের থাকতে হবে। চটজলদি করে বিরোধী দল পয়দাও হবে না। দেশে উদারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে এ শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব। উদারপন্থী বলতে মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতিতে বিশ^াসী দেশের ছোট দলগুলোর শক্ত অবস্থান তৈরিতে সহায়ক হতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপিও সুন্দরভাবে একটি বিরোধী দল হিসেবে গড়ে উঠতে পারত। বিএনপির সমস্যা হচ্ছে, তারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি জামায়াতের সঙ্গে জোট করে রাজনীতিটা করে। সেদিক থেকে বিএনপি আদর্শের দিক থেকে বিরোধী দল হিসেবে টিকে থাকার শক্তি হারিয়েছে।’