আজকের খতমে তারাবিতে কোরআনে কারিমের ১২তম পারা অর্থাৎ সুরা হুদের ৬ নম্বর আয়াত থেকে সুরা ইউসুফের ৫২ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পাঠ করা হবে। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউই অদৃশ্যের জ্ঞান রাখে না আজকের তারাবিতে পঠিত বিষয়গুলোর অন্যতম বিষয় এটি।
আল্লাহর নবী হজরত নুহ (আ.) নিজ সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘আর আমি তোমাদের বলি না, আমার কাছে আল্লাহর ধন-ভাণ্ডার রয়েছে এবং এ কথাও বলি না, আমি গায়েবি (অদৃশ্যের) খবর জানি; এ কথাও বলি না।’সুরা হুদ : ৩১
আল্লাহতায়ালা নবী হজরত নুহ (আ.) -এর বৃত্তান্ত বর্ণনার পর শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছেন, ‘এটি গায়েবের খবর, আমি আপনার প্রতি অহি প্রেরণ করছি। ইতিপূর্বে এটা আপনার এবং আপনার জাতির জানা ছিল না। আপনি ধৈর্যধারণ করুন। যারা ভয় করে চলে, সুপরিণাম তাদেরই জন্য।’ সুরা হুদ : ৪৯
আজকের নবম তারাবিতে পঠিত উপরোক্ত দুই আয়াত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, নবীরা গায়েব জানতেন না। দ্বিতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ আরও সুস্পষ্ট করে বলেন, ‘আমি জানানোর পূর্বে তুমি জানতে না।’ গায়েব তো ওই জ্ঞান, যা কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি জানা থাকে। মাধ্যম ছাড়া কোনো কিছু সরাসরি জানা একমাত্র আল্লাহর পক্ষেই সম্ভব। সৃষ্টির পক্ষে তা সম্ভব নয়। সৃষ্টি জ্ঞান লাভ করে বিভিন্ন মাধ্যমে। সাধারণ মানুষ জ্ঞান লাভ করেন পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে। আর নবীরা ষষ্ঠ আরেকটি মাধ্যম দ্বারা জ্ঞান লাভ করেন যার নাম অহি। গায়েবের সংবাদ যখন অহির মাধ্যমে নবীর কাছে পৌঁছে তখন তা নবীর জন্য আর গায়েব থাকে না। কেননা, নবী তা সরাসরি জানেননি, জেনেছেন মাধ্যমে।
গায়েবের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর গায়েবের জ্ঞানীও একমাত্র তিনি। এটা ইসলামের বিশ্বাসসমূহের একটি। এ বিষয়টি কোরআনে কারিমের আরও বহু আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। যেমন ‘(হে নবী) আপনি বলুন, আমি তোমাদের বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ধনভাণ্ডার রয়েছে। তাছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয়ও অবগত নই।’ সুরা আনআম : ৫০
‘ (হে নবী!) আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধন এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই, কিন্তু যা আল্লাহ চান। আর আমি যদি গায়েবের কথা জেনে নিতে পারতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম। ফলে কখনো আমার কোনো অমঙ্গল হতো না।’ সুরা আরাফ : ১৮৮
নবী যে গায়েব জানেন না, তা এই আয়াতে আল্লাহতায়ালা সহজ একটি যুক্তি দিয়ে উম্মতকে বুঝিয়েছেন। নবী যদি গায়েব জানতেন, তাহলে তো পার্থিব জীবনে তিনি কখনো কষ্ট ভোগ করতেন না, ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপদগ্রস্ত হতেন না। আমরা নবী জীবনী অধ্যয়নে জানতে পারি, নবী করিম (সা.) জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছেন, দুশমনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি যদি গায়েবে জানতেন তাহলে ইহুদি নারী তাকে বিষ পান করাতে সক্ষম হতো না, ইহুদিদের জাদুর শিকার হয়ে অনেক দিন পর্যন্ত অসুস্থ থাকতেন না। তিনি যদি গায়েব জানতেন তাহলে খেজুর পরাগায়ন করতে নিষেধ করতেন না।
কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘ (হে নবী) বলে দাও, গায়েবের কথা আল্লাহই জানেন; আমিও তোমাদের সঙ্গে অপেক্ষায় রইলাম।’ সুরা ইউনুস : ২০
অদৃশ্যের জ্ঞান বিষয়ে কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হচ্ছে, ‘তখন জিনেরা বুঝতে পারল যে, অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান থাকলে তারা এই লাঞ্ছনাপূর্ণ শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না।’ সুরা সাবা : ১৪
সমাজের অনেক মানুষ মনে করেন, জিনেরা গায়েব জানে। তাই দেখা যায়, অনেক কবিরাজ-তান্ত্রিক মানুষকে ভুল বুঝিয়ে, ফাঁকি দিয়ে জিন হাজিরের নামে নানা অনৈতিক কাজ করছে। জিন হাজির করে জিন দিয়ে নানা কাজ হাসিলের গল্প ফাঁদছে। এর সবই মিথ্যা ও প্রতারণা। বর্ণিত আয়াতে জিনরা নিজেদের অক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞতা পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছে। তাদের ভাষায়, ‘আমরা যদি গায়েবই জানতাম তাহলে তো নবী সোলায়মান (আ.) -এর মৃত্যুর পরেও এতদিন পর্যন্ত না জেনে কষ্ট করতে থাকতাম না।
বস্তুত কোনো কালেই কোনো নবীই অদৃশ্যের কোনো বিষয়ে জানতেন না। হ্যাঁ, মহান আল্লাহ নবী-রাসুলদের অহি মারফত যা জানিয়েছেন তারা ততটুকুই জ্ঞাত হয়েছেন। নির্দেশ অনুযায়ী উম্মতকে সতর্ক ও হেদায়েত করেছেন।